মিনহাজ-বিবরণের সামাজিক পটভূমি
ইহাই বখত্-ইয়ারের অষ্টাদশ অশ্বারোহী সৈন্য কর্তৃক বিহার, গৌড় ও বরেন্দ্রী বিজয়ের প্রায় ঔপন্যাসিক কাহিনী। প্রথমত, মিনহাজ পঞ্চাশ বৎসর পর যাঁহাদের মুখ হইতে শুনিয়া এই কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়া গিয়াছেন। তঁহাদের স্মৃতিশক্তি এবং বিশ্বস্ততা কতটুকু নির্ভরযোগ্য, বলা কঠিন। দ্বিতীয়ত, বিহার-নগর ধ্বংস করিবার পর এবং দিল্লী হইতে বখত্যু-ইয়ারের ঘুরিয়া আসিয়া সেই দেশ অধিকারের ভিতর লক্ষ্মণসেন সময় যথেষ্ট পাইয়াছিলেন। এই সময়ের মধ্যে কি লক্ষ্মণসেন নিজ রাজ্য রক্ষার কোনও ব্যবস্থাই করেন নাই? মগধ-জয়ের পরও এক বৎসর না। হউক, অন্তত কিছু সময় তো সেন-রাষ্ট্র নিশ্চয়ই পাইয়াছিল; সেই সময়ের মধ্যে কি লক্ষ্মণসেন শত্ৰু প্রতিরোধের কোনও ব্যবস্থাই করেন নাই? যে অস্ত্র ও সৈন্যবল, যে শৌর্য-বীৰ্য কাশী-কলিঙ্গ-কামরূপ জয় করিয়াছিল তাহারা কোথায় আত্মগোপন করিয়াছিল? মগধরাজ্যের পশ্চিম সীমা হইতে আরম্ভ করিয়া নদীয়া পর্যন্ত কোথাও কি লক্ষ্মণসেন নিজের রাজ্য ও রাষ্ট্ররক্ষার জন্য কোনও প্রতিরোধ দান করেন নাই? নদীয়ার রাজপ্রাসাদ রক্ষারও কি কোনও ব্যবস্থাই ছিল না? এ-সব সহজ ও স্বাভাবিক প্রশ্নের কোনও উত্তরই মিনহাজের বিবরণীতে নাই। তৃতীয়ত, মিনহাজ অলৌকিক গালগল্পেও আস্থা স্থাপন করিয়া গিয়াছেন; লক্ষ্মণসেনের জন্মকাহিনীই তাহার প্রমাণ। বিহার-বঙ্গবিজয় কাহিনীতেও এই ধরনের প্রচলিত গালগল্প-কিছু ঢুকিয়া পড়ে নাই, এ কথাই-বা কী করিয়া বলা যাইবে?
মিনহাজ-বিবরণ রচনার এক শতকের মধ্যে ইসমী নামে এক ঐতিহাসিক ফুতুহ-উস-সালাতিন নামক গ্রন্থে নদীয়া অধিকারের আর একটি বিবরণ রাখিয়া গিয়াছেন। মিনহাজ ও ইসমীর বিবরণ দুইটির বঙ্গানুবাদ পাশাপাশি উদ্ধার করা যাইতে পারে।
‘মিনহাজ বলিতেছেন, “ইহার পর (মগধ অধিকারের) দ্বিতীয় বৎসরে বখত্-ইয়ার তাহার সৈন্যগঠন করিয়া বিহার (বিহার-সিরিফ) হইতে যাত্ৰা করিলেন; এবং সহসা নদীয়ায় প্রবেশ করিলেন, এত সহসা এবং দ্রুত যে, তাহার অশ্বারোহীদের ভিতর ১৮ জন ছাড়া আর কেহ তাহার সঙ্গে তাল রাখিতে পারিল না; বাকী সকলে পিছন পিছন অগ্রসর হইতে লাগিল। নগরের দ্বারে পৌছিয়া তিনি কাহারও উপর কোনও অত্যাচার করিলেন না, বরং নীরবে এবং বিনীতভাবে অগ্রসর হইতে লাগিলেন; কেহই সন্দেহও করিতে পারিল না যে, ইনিই বখতি-ইয়ার; বরং সকলেই ভাবিল, এই আগস্তুকেরা বোধহয় ব্যবসায়ী এবং মহার্ঘ অশ্ববিক্রয় উদ্দেশ্যেই ইহাদের আগমন। বখতি-ইয়ার রাজপ্রাসাদের দ্বারে আসিয়াই কোষ হইতে তরবারী উন্মুক্ত করিলেন, এবং বিধর্মীদের হত্যা শুরু করিয়া দিলেন। তখন দ্বিপ্রহর; রায় লখমনিয়া ভোজনে বসিয়াছেন, এমন সময় সহসা রাজপ্রাসাদের দ্বার হইতে এবং নগরের কেন্দ্ৰস্থল হইতে তুমুল আর্তনাদ উথিত হইল। (লক্ষ্মণসেন) ব্যাপার কি বুঝিবার আগেই বখত্-ইয়ার প্রাসাদের ভিতর এবং অন্তঃপুরে ঢুকিয়া পড়িলেন, এবং নরহত্যা আরম্ভ করিয়া দিলেন। রায় তখন নগ্নপদে প্রাসাদের পশ্চাৎ দ্বারা দিয়া পলাইয়া গেলেন। ….’
ইসমীও বলিতেছেন, বখত্-ইয়ার অশ্ববিক্রেতার ছদ্মবেশেই নদীয়ায় প্রবেশ করিয়াছিলেন। নগরে প্রবেশ করিয়া তিনি লক্ষ্মণসেনকে সংবাদ পাঠাইলেন, প্রাসাদের বাহিরে আসিয়া তাহাদের আনীত তাতার-অশ্ব, চীনা বস্ত্ৰসম্ভার এবং অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্যাদি পরীক্ষা করিবার জন্য। রায় যখন কারবানে (অশ্বদের বিশ্রামস্থল) আসিয়া দাঁড়াইলেন, তখন বখত্-ইয়ার তাহাকে বহুমূল্য এক উপটৌকন দান করিলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তঁহার অনুচরদের ইঙ্গিত করিলেন হিন্দুদের উপর ঝাপাইয়া পড়িতে। তুকী সৈন্যরা তৎক্ষণাৎ তাহাই করিল। হিন্দু রক্ষী সৈন্যরা অতর্কিত আক্রমণ ঠেকাইতে না পারিয়া পরাভূত হইল, কিন্তু তাঁহারদের একদল রায় লখমনিয়াকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়া স্থির বিক্রমে আক্রমণ প্রতিহিত করিতে লাগিল এবং তুর্কী সৈন্যদের মনে ত্ৰাস সঞ্চার করিল…। অবশেষে যখন দুর্ধর্ষ খিলজি অশ্বারোহীরা ঝড়ের মতন ছুটিয়া আসিয়া কয়েকজন হিন্দু-সওয়ারকে হত্যা করিল, তখন রায় লখমনিয়া বখত্ব-ইয়ারের হাতে বন্দী হইলেন। উপরোক্ত দুই বিবরণেই এবং সমসাময়িক ইতিহাসে কয়েকটি তথ্য পরিষ্কার। প্রথমত, আক্রমণটা ঘটিয়াছিল। বেলা দ্বিপ্রহরে যখন প্রাতঃসভা শেষ করিয়া সভাসদ, কর্মচারী ও রক্ষী সৈন্যরা সকলেই যে র্যাহার ঘরে ফিরিয়া গিয়া স্নানাহার ও বিশ্রামে রত। দ্বিতীয়ত, ১৯ জন অশ্বারোহী তুকী সেনাকে কেহই আক্রমণকারী বলিয়া মনে করে নাই। অশ্ববিক্রেতা মনে করিয়াই রক্ষীরা তঁহাদের কেহ বাধা দেয় নাই। তৃতীয়ত, সহসা অতর্কিত অবিশ্বস্ত আক্রমণ ঠেকাইবার জন্য কেহ প্ৰস্তুতও ছিল না। চতুর্থত, প্রথম ১৯ জনের (বখত্-ইয়ার ও ১৮ জন তুকী অশ্বারোহী) পক্ষেই প্রাসাদ ও নগরাধিকার সম্ভব হইত না, যদি না পশ্চাতের বৃহত্তর তুকী ও খিলজি অশ্বারোহী সেনাদল ততক্ষণে নগরের ভিতর ঢুকিয়া পড়িয়া চারিধারে আক্রমণ ও লুণ্ঠন শুরু করিয়া দিত। পঞ্চমত, নবদ্বীপ সেন-রাজাদের রাজধানী ছিল না, ছিল গঙ্গাতীরবর্তী একটি তীৰ্থস্থান এবং সেখানে একেবারে গঙ্গর কুল ঘেষিয়া ছিল রাজার প্রাসাদ। এই প্রাসাদ সুদৃঢ় অট্টালিকা নয়, তদানীন্তন বাঙলার রুচি ও অভ্যাসানুযায়ী কাঠ ও বাশের তৈরী সমৃদ্ধ বাংলা-বাড়ি। নবদ্বীপ দুৰ্গাঁও নয়, একটি তীর্থ-নগর মাত্র এবং নগর-প্রাচীর বা দ্বারবলিতে বাঁশ ও কাঠের তৈরী বেড়া ও দরজা ছাড়া আর কিছু নয়। মুঘল-প্রাসাদ বা দুর্গ-নগর বলিতে যাহা বুঝায় নবদ্বীপে তাহার কিছুই ছিল না, এ-তথ্য অনুমানে কিছুমাত্র বাধা নাই। ষষ্ঠত, বিদেশি অশ্ববিক্রেতার আসা-যাওয়া নগরে নিশ্চয়ই ছিল; সুতরাং অশ্ববিক্রেতার ছদ্মবেশে ১৯ জন অশ্বারোহীর আগমন কাহারও মনে কোনও সন্দেহের উদ্রেক করে নাই। সপ্তমত, প্রাচ্য ইতিহাসে স্বল্পসংখ্যক অশ্বারোহী সেনা কর্তৃক অতর্কিত আক্রমণে কোনও নগরাধিকার একেবারে অজ্ঞাত নয় এবং নিছক কল্পনার সৃষ্টিও নয়।
