সাধু ম্লেচ্ছ নরেন্দ্ৰ সাধু ভাবতো মাতৈব বীরপ্রসূর
নীচেনাপি ভবদ্বিধন বসুধা সূক্ষত্ৰিয় বর্ততে।
দেবে কুট্যাতি যস্য বৈরিপরিষন্মারাঙ্কমপ্লে পুরঃ
শস্ত্ৰং শস্ত্ৰমিতি স্মৃফুরন্তি রসনাপত্ৰান্তরালে গিরঃ৷
ম্লেচ্ছরাজা, সাধু, সাধু! আপনার মাতাই (যথার্থ) বীরপ্রসবিনী; নীচ (বংশোদ্ভব) হইলেও আপনার মতো লোকের জন্যই বসুধা এখনও সূক্ষত্ৰিয় আছে; (যেহেতু) মারাঙ্কমল্লদেব (লক্ষ্মণসেন) যখন সন্মুখ (যুদ্ধে) শত্রুসৈন্য ধ্বংস করিতেছিলেন তখন আপনার রসনারূপ পত্রাপ্তরাল হইতে শস্ত্ৰ, শস্ত্ৰ, এই বাক্য নিৰ্গত হইতেছিল।
পর পর তিনটি রাজার রাজসভাকবির, বৃদ্ধ না হউন অন্তত প্রৌঢ় উমাপতিধর কি বখতুি-ইয়ার কর্তৃক নবদ্বীপজয়ের পর সেন-রাজসভা পরিত্যাগ করিয়া নিজের ভক্তি ও স্তুতি অর্পণ করিবার পাত্র পরিবর্তন করিয়াছিলেন, এবং ম্লেচ্ছ রাজকেই সেই পাত্ৰ বলিয়া নির্বাচন করিয়াছিলেন!। সভাকবি সভাকবিই থাকিয়া গিয়াছিলেন সন্দেহ নাই, কিন্তু সেন-রাষ্ট্র, সেনা-রাজসভা, সেই সভার অলংকার কবি ও পণ্ডিত, এবং সমসাময়িক কাল ও সমাজের উপর ইহা যে কত বড় কটাক্ষ, উমাপতিধর কি তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন?
যাহাই হউক, লক্ষ্মণসেনের সঙ্গে ম্লেচ্ছদের (তুরুস্কদের) একটা সংঘর্ষ হইয়াছিল, এবং সে-সংঘর্ষে সেনা-রাজ জয়ী হইয়াছিলেন, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই; তবে তাহা নবদ্বীপ জয়ের আগে না। পরে, ঐতিহাসিক গবেষণার বর্তমান অবস্থায় তাহা বলা কঠিন। আমার মনে হয়, নবদ্বীপ জয়ের অব্যবহিত পরে।
নবদ্বীপ-জয় সম্বন্ধে মুসলমান অভিযাত্রীদের পক্ষে এ-বিষয়ে বিস্তৃত সাক্ষ্য উপস্থিত, এবং এই সাক্ষ্য দিতেছেন ঘটনার প্রায় ৫০ বৎসর পর দিল্লীর ভূতপূর্ব প্রধান কাজী মৌলানা মিনহাজ-উদ-দীন তিনি লখনৌতিতে দুই বৎসর কাটাইয়াছিলেন এবং সেখানে দুইটি বৃদ্ধ সুপ্রাচীন সৈন্যর মুখে বখত্-ইয়ারের বিহার-বিজয় কাহিনী এবং অন্যান্য “বিশ্বস্ত” লোকের মুখে বঙ্গ-বিজয় কাহিনী শুনিয়াছিলেন। তিনি এই দুই দেশ বিজয় সম্বন্ধে যাহা লিখিয়া রাখিয়া গিয়াছেন তাহার সংক্ষিপ্ত সারমর্ম জানা প্রয়োজন। বখত্-ইয়ারের আক্রমণের সময় সেনরাজ। লক্ষ্মণসেন (রায় লখমনিয়া) নৃদীয়া (নদীয়া= নবদ্বীপ) রাজধানীতে বাস করিতেছিলেন।
বর্তমান চুনারের ১১ মাইল পূর্বে ভুইলি গ্রাম; এই গ্রামই ছিল বখত্-ইয়ারের জায়গীরের কেন্দ্রভূমি। গাহড়বাল-সামন্তরাজদের পরাভূত করিয়া বখতৃ-ইয়ার মুনের ও বিহার অঞ্চলের নানা জায়গায় লুঠতরাজ আরম্ভ করিয়া দিলেন এবং তাঁহারই লোভে প্রচুর খিলজি ও তুর্কী দস্যুব্রতী তাহার সামন্তুদণ্ডের চারিদিকে ঘিরিয়া দাঁড়াইল। উত্তর-বিহারে মিথিলাকে আশ্রয় করিয়া তখন হিন্দু কর্ণাটক রাজবংশের আধিপত্য; কনৌজের সিংহাসনে তখনও জয়চন্দ্ৰপুত্র হরিশচন্দ্র আসীন; রোহতাস অঞ্চলের হিন্দু মহানায়কেরা তখনও নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখিয়াছেন; বিহারের শোননদীর তীরবর্তী অঞ্চলে নিবনেরাপত্তনের সামন্তদের আধিপত্য বিদ্যমান। এই সব হিন্দুরাজশক্তিকে উৎখাত করা বা দেশব্যাপী বিরাট চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা বখত্-ইয়ারের উদ্দেশ্য ছিল না। কাজেই রাজশক্তি যেখানে শিথিল বা প্রায় অনুপস্থিত,সেই সব স্থান লুণ্ঠন ও অধিকার করাই হইল তাহার উদ্দেশ্য। বৎসর দুই এই ভাবে কাটাইবার পর বখতি-ইয়ার হঠাৎ একদিন হিসার-ই-বিহার বা বিহার-দুর্গ আক্রমণ এবং অধিকার করিয়া বসিলেন এবং তাহার অধিবাসীদের প্রায় সকলকেই হত্যা করিলেন, প্রচুর ধনরত্ন লুটিয়া লইলেন এবং প্রচুর গ্রন্থ পোড়াইলেন (১১৯৯)। বস্তুত, যে দুর্গ-নগরটি তিনি অধিকার করিলেন তাহা দুৰ্গই নয়, এক বিরাট বৌদ্ধ-বিহার, এবং এই বিহারই প্রখ্যাত ঔদণ্ড বা ওদণ্ডপুর বিহার; যে-অধিবাসীদের তিনি হত্যা করিলেন তাঁহারা সকলেই মুণ্ডিতশির বৌদ্ধ ভিক্ষু। এই বিহার হইতেই বর্তমান বিহার জনপদের নামকরণ। এই জনপদে এক সময় বৌদ্ধবিহারও ছিল অনেকগুলি।
ওদণ্ডপুর-বিহার ধ্বংসের প্রায় এক বৎসর পর দ্বিতীয়বার বখত-ইয়ার বিহারে সমারাভিযানে আসেন এবং নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করিতে চেষ্টা করেন (১২০০ খ্ৰীঃ)। প্ৰসিদ্ধ কাশ্মীরী বৌদ্ধ ভিক্ষু ও আচার্য শাক্যশ্ৰীভদ্র এই সময় মগধে বেড়াইতে আসিয়াছিলেন; তিনি দেখিয়ছিলেন ওদণ্ডপুর ও বিক্রমশীলা বিহার তখন ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। তিনি নিজেও তুর্কীদের নিষ্ঠুর অত্যাচারে ভীত সন্ত্রস্ত হইয়া পলাইয়া গিয়াছিলেন জগদ্দলবিহারে।
যাহাই হউক, ইতিমধ্যে বিহার—ধ্বংস ও মগধাধিকারের সংবাদ নদীয়ায় রায় লখমনিয়ার এবং তাহার কর্মচারীদের কর্ণগোচর হয়। রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান ব্যক্তি, মন্ত্রীবর্গ এবং জ্যোতিষীরা তখন লক্ষ্মণসেনকে পরামর্শ দিলেন, তুকী অভিযাত্রীকে বাধা দিয়ে কাজ নাই, দেশ পরিত্যাগ করাই যুক্তিযুক্ত, কারণ শাস্ত্ৰে লেখা আছে, এই দেশ তুর্কীদের দ্বারা বিজিত হইবে! খোজ লইয়া জানা গেল, তুকী অভিযাত্রীটির চেহারা একেবারে শাস্ত্রের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়া যাইতেছে! রায় লখমনিয়া মন্ত্রী ও জ্যোতিষীবর্গের পরামর্শ গ্ৰহণ করিলেন না। অধিকাংশ ব্রাহ্মণ ও বণিকেরা পূর্ববঙ্গে, আসামে ও অন্যান্য স্থানে পলাইয়া গেলেন; রায় লখমনিয়া পলাইলেন না। ইহার (মগধজয়ের) পর বৎসরই (১২০১) বখতি-ইয়ার একদল সৈন্য গঠন করিয়া বিহার-সরিফ হইতে গয়া ও ঝাড়খণ্ড জনপদের ভিতর দিয়া নদীয়ার দিকে অগ্রসর হইলেন। তঁহার অধিকাংশ সৈন্য রহিল পশ্চাতে। একদিন বেলা দ্বিপ্রহরে তিনি আঠারোজন অশ্বারোহী সৈন্যমাত্ৰ লইয়া ধীরে ধীরে পথ অতিক্রম করিয়া একেবারে রাজপ্রাসাদের দ্বারে আসিয়া পৌছিলেন; অশ্ববিক্রেতা মনে করিয়া কোথাও কেহ তঁহাকে বাধা দিল না। প্রাসাদের ভিতরে ঢুকিয়াই বখত্-ইয়ার ও তাঁহার সঙ্গীরা তরবারী উন্মুক্ত করিয়া লোকেদের মুণ্ডচ্ছেদ করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন দ্বিপ্রহর, রায় লখমনিয়া ভোজনে বসিয়াছেন; এমন সময় প্রাসাদের দরজা এবং নগরের মধ্যস্থল হইতে তুমুল আর্তনাদ ও কোলাহল উত্থিত হইল। ততক্ষণ বখাৰ্ত্ত-ইয়ারের বাকী সৈন্যদলের একটি বৃহৎ অংশ নগরের ভিতরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে এবং বোধ হয় নগর অবরুদ্ধও হইয়া গিয়াছে। ব্যাপার যে কি তাহা রায় লখমনিয়া বুঝিবার আগেই বখত্যু-ইয়ার রাজপ্রাসাদে ঢুকিয়া পড়িয়াছেন; অনেক লোক তাঁহার তরবারীর আঘাতে প্রাণও দিয়েছে। উপায়ান্তর না দেখিয়া রায় লখমনিয়া প্রাসাদের পশ্চাৎ দ্বারা দিয়া নগ্নপদে সংকলাট এবং বংগ অভিমুখে পলাইয়া গেলেন। সমস্ত সৈন্যদল আসিয়া যখন নদীয়া এবং তাহার পার্শ্ববর্তী সমস্ত স্থান অধিকার করিল, বখত- ইয়ার তখন সেইখানে (প্রাসাদে?)। শিবির স্থাপন করিলেন। রায় লখমনিয়া (পূর্ব) বঙ্গে আরও কিছুকাল রাজত্ব করিবার পর লোকান্তর গমন করেন। মিনহাজের তত্ত্বকাত্-ই-নাসিরী রচনার কালেও (১২৬০’র পরও) রায় লখমনিয়ার বংশধরেরা (পূর্ব)-বঙ্গে রাজত্ব করিতেছিলেন। রায় লখমনিয়ার প্রাসাদ ও নগর অধিকারের পর বখত ইয়ার কয়েকদিন ধরিয়া নদীয়া বিধ্বস্তু করিয়া গৌড়-লখনৌতিতে ফিরিয়া গিয়া নিজ শাসনকেন্দ্ৰ স্থাপন করিলেন। ইহার পর তিনি মহোবায় গিয়া কুত্ব-উদদীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কয়েক বৎসর পর (১২০৬) তিনি তিব্বত-জয়ের জন্য দশহাজার অশ্বারোহী সৈন্য লইয়া এক সমারাভিযানে গিয়াছিলেন; মিনহাজ এই অভিযানের বিবরণও রাখিয়া গিয়াছেন। বখতুি ইয়ার তিব্বত পর্যন্ত অগ্রসরই হইতে পারেন নাই; মধ্যপথেই নানাভাবে লাঞ্ছিত ও পর্যুদস্ত হইয়া তাহাকে ফিরিয়া আসিতে হইয়াছিল। মিনহাজ কথিত তিব্বতাভিযানের একটু পরোক্ষ সমর্থন বোধ হয় পাওয়া যায় কামরূপের একটি লিপিতে। লিপিটি গৌহাটির নিকটে ব্ৰহ্মপুত্রের উত্তর তীরে কানাইবারশীবোয়া নামক স্থানে একটি পাষাণাগাত্রে খোদিত; ইহার পাঠ এইরূপ: “শাকে ১১২৭ (২৭ মার্চ, ১২০৬ আনুমানিক) শাকে তুরগযুগেশে মধুমাস ত্রয়োদশে! কামরূপং সমাগত্য তুরুস্কাঃ ক্ষয়মাযযুঃ৷” আবার, এমনও হইতে পারে তুরুস্কগণ কর্তৃক তিব্বত ও কামরূপাভিযান দুই পৃথক অভিযান।
