শ্ৰীডোন্মানপাল ॥। রণবঙ্কমল্ল হরিকালদেব
সুন্দরবন অঞ্চলে (পূর্ব-খাটিকা) এক পরমমহেশ্বর মহামাণ্ডলিকের পুত্ৰ মহারাজাধিরাজ শ্ৰীডোমনপাল প্রধান হইয়া উঠিয়া স্বাধীন রাজ্যখণ্ড প্রতিষ্ঠা করিলেন (১১৯৬)।
এই সময়ই বোধ হয় অথবা অব্যবহিত পরই ত্রিপুরা অঞ্চলে পট্টিকের-রাজ্য আবার কতকটা প্রাধান্য লাভ করে, এবং রণবঙ্কমল্ল হরিকালদেব নামে এক নরপতি সেখানে স্বাতন্ত্র ঘোষণা করেন (১২০৪-১২২০)। বর্তমান কুমিল্লা শহরের পাঁচ মাইল পশ্চিমে ময়নামতী পাহাড় অঞ্চলেই ছিল বোধ হয় তাহার রাজধানী। প্রাচীন পট্টিকেরা, ব্ৰহ্মদেশীয় ইতিকথার পটিক্কর-পটেইঙ্কর, আদি ব্রিটিশযুগের পাটিকেরা-পাইটকেরা পরগণা এবং বর্তমান পাইটিকারা-পাটিকেরা এক এবং অভিন্ন।
দেববংশ
মেঘনার পূর্বতীরে আর একটি নূতন স্বাধীন স্বতন্ত্র রাজবংশও এই সময়ই গড়িয়া উঠিল। এই বংশ দেববংশ নামে (দেবাম্বয়গ্রামণী) ইতিহাসে খ্যাতি লাভ করিয়াছে। দ্বাদশ শতকের শেষে বা ত্রয়োদশ শতকের গোড়াতেই পুরুষোত্তমদেবের পুত্ৰ মধুমথন বা মধুসূদনদেব প্রথম স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করিয়া রাজা আখ্যা গ্ৰহণ করেন। তাঁহার পুত্র বাসুদেব; বাসুদেবের পুত্র দামেদারদেবই এই বংশের পরাক্রান্ত নরপতি (১২৩১-১২৪৩)। “অরিরাজ-চানুর-মাধব-সকল-ভূপতি চক্রবর্তী”-দামোদর বর্তমান ত্রিপুরা-নোয়াখালি চট্টগ্রামে স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন, এ সম্বন্ধে লিপি-প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে এই বংশের আর এক রাজা দশরথদেব তাহার রাজা আরও বিস্তুত করিয়াছিলেন, এবং বিক্রমপুরে রাষ্ট্ৰকেন্দ্র গড়িয়া ঢাকা অঞ্চলও তাহার রাজ্যভুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু সে কথা পরে বলিতেছি।
গুপ্তবংশ
বাঙলার বাহিরে, গুপ্ত-উপান্তনামা এক গুপ্ত-বংশ মুঙ্গের অঞ্চলে সেনবংশের মহামাণ্ডলিক সামন্ত ছিলেন বলিয়া মনে হয়। ইহাদের রাষ্ট্রকেন্দ্র ছিল মুঙ্গের জেলার লখীসরাইর নিকট জয়নগর (প্রাচীন জয়পুর) নামক স্থানে। এই বংশের রাজা “পরমমাহেশ্বর বৃষভধ্বজ…. পরমেশ্বর” কৃষ্ণগুপ্ত ও তাহার পুত্ৰ সংগ্রামগুপ্ত স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিয়াছিলেন লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালেই। অনৈক্য ও বৈষম্যমূলক স্থানীয় আত্মকর্তৃত্ব ব্যাধির এই সব দুর্লক্ষণ যখন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রকে ভিতর হইতে দুর্বল করিতেছিল, তখন অন্যদিকে পশ্চিম হইতে ক্ৰমাগ্রসরমান মুসলমান রাজশক্তি পূর্বদিকে লুব্ধ বাহু বাড়াইয়া দিতেছিল। কুতব-উদ-দীন তখন দিল্লীর তত্তে আসীন। উত্তর-ভারতের হিন্দুরাষ্ট্ৰশক্তি তখন একে একে সকলই ভাঙিয়া পড়িয়াছে; রাষ্ট্ৰীয় শান্তি ও শৃঙ্খলা বলিতে বিশেষ কিছু নাই। স্থানীয় রাষ্ট্রকর্তৃত্ব ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হিন্দু ও তুরুস্ক সামন্তদের করুকবলে, কিন্তু দুধর্ষ পরাক্রান্ত শত্রুকে ঠেকাইয়া রাখিবার শক্তি কাহারও নাই। এই ধরনের বিশৃঙ্খল রাষ্ট্ৰীয় অবস্থায় মুসলমান অভিযাত্রীর রাষ্ট্ৰীয় ও সামরিক প্রতাপকে আশ্রয় করিয়া সেনাপতিদের সামরিক উচ্চাকাঙক্ষা পরিতৃপ্তি খুঁজিয়া বেড়াইবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়।
বখ্ত্-ইয়ারের বঙ্গ-বিহার জয়৷ ১২০১ খ্ৰীষ্টাব্দ
এই উচ্চাকাঙক্ষী ভাগ্যান্বেষীদের মধ্যে তুর্ক জাতীয় যুদ্ধব্যবসায়ী মুহম্মদ বখত্-ইয়ার খিলজী অন্যতম। দিল্লীর তক্ত তাহাকে বিহার ও বাঙলাদেশ জয় করিবার জন্যই আদেশ করে নাই; বখতি-ইয়ার স্বেচ্ছায় তাহার সৈন্যদল লইয়া বিহারে-বাঙলায় ভাগ্যান্বেষণে অগ্রসর হইয়াছিলেন। বখতি-ইয়ার কর্তৃক বিহার-বাঙলা জয়ের কাহিনী লক্ষ্মণসেনের পক্ষ হইতে কেহ লিখিয়া রাখে। নাই। সভাকবি শরণ অবশ্য লক্ষ্মণসেন কর্তৃক একবার এক ম্লেচ্ছরাজের পরাজয়ের কথা ইঙ্গিত করিয়াছেন; হইতে পারে এই ম্লেচ্ছ।রাজ বখত ইয়ার। অথবা এমনও হইতে পারে, বখতি-ইয়ারের বঙ্গবিজয়ের পর লক্ষ্মণসেন যখন বিক্রমপুর অঞ্চলে রাজত্ব করিতেছিলেন তখন লখনৌতি বা লক্ষ্মণাবতীর কোনও সুলতানের সঙ্গে সেন-রাজের সংঘর্ষ হইয়া থাকিতে পারে; কবি শরণ সেনরাজ কর্তৃক সেই যুদ্ধজয়ের ইঙ্গিত করিয়া থাকিবেন। শরণ-রচিত শ্লোকটি উদ্ধার করিতেছি, এই শ্লোকে ম্লেচ্ছবিনাশ ছাড়া লক্ষ্মণসেনের অন্যান্য দেশ জয়ের ইঙ্গিতও আছে।
ভ্ৰক্ষেপাদ গৌড়লক্ষ্মীং জয়তি বিজয়তে কেলিমাত্ৰাৎ কলিঙ্গন
চেতশ্চেদিক্ষিতীন্দোস্তপতি বিতপতে সূর্যবদ দুর্জনেষু।
স্বেচ্ছাম্লেচ্ছন বিনাশং নয়তি বিনয়তে কামরূপাভিমানং
কাশীভর্তুঃ প্রকাশং হরতি বিহরতে মুপ্নি যে মাগধস্য৷।
লক্ষ্মণসেন কর্তৃক গৌড়, কলিঙ্গ, চেদি, কামরূপ, কাশী ও মগধে যুদ্ধজয়ের কথা লক্ষ্মণসেনের লিপি-সাক্ষ্যে এবং অন্যতম সভাকবি উমাপতিধরের বিচ্ছিন্ন দুইটি শ্লোকেও পাওয়া যায়; কাজেই তঁহার ম্লেচ্ছ-বিনাশের কথা অস্বীকার করার কোনও কারণ নাই। ইহারা-শরণ বা –উমাপতিধর-লক্ষ্মণসেনের নাম করিতেছেন না। সত্য, তবে যেহেতু তাহারা লক্ষ্মণসেনের সভাকবি ছিলেন এবং যে-সব বিজয়কীতির উল্লেখ তাহারা করিতেছেন সেগুলি লক্ষ্মণসেনের সঙ্গেই যুক্ত সেই হেতু এ-সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশের কোনও অবসর নাই। কিন্তু, উমাপতিধর যে শ্লোকে লক্ষ্মণসেনের সঙ্গে ম্লেচ্ছ সংঘর্যের ইঙ্গিত করিয়াছেন, সেই শ্লোকেই তিনি ম্লেচ্ছ রাজার সাধুবাদও করিয়াছেন এবং তাহা প্রায় হাস্যকর স্তুতিবাক্যে!
