সেনরাজবংশ-কথার সামাজিক অর্থ
যাহাই হউক, সুদীর্ঘকাল রাজত্ব এবং রামপাল-পরবর্তী বাঙলাদেশের রাষ্ট্ৰীয় ভগ্নদশার সুযোগ ‘লইয়া পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ বিজয়সেনই বাঙলায় সেন বংশের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। পরস্পর ঈৰ্ষাপরায়ণ ও বিবদমান সামন্ত নরপতিদের অন্ধ রাষ্ট্রবুদ্ধিতে আচ্ছন্ন ও ক্লিষ্ট বাঙলাদেশ পরাক্রান্ত রাজবংশ ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় শান্তি ও স্বস্তি লাভ করিল বটে; কিন্তু একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, এই রাষ্ট্র ও রাজবংশ বাঙলার ও বাঙালীর নয়। কবি উমাপতিধর কিংবা শ্ৰীহৰ্ষ বিজয়সেনের, কিংবা পরবর্তী সভাকবিরা সেন রাজাদের স্তুতি ও চাটুবাদে যতই উচ্ছসিত হইয়া থাকুন না কেন—রাষ্ট্র বা রাজপ্ৰসাদপুষ্ট কবিরা তো তাহা হইয়াই থাকেন—সমসাময়িক বাঙালী জনসাধারণ এই রাজবংশকে আপনার জন বলিয়া মনে করিয়াছিল, এমন কোনও প্রমাণ বা ইঙ্গিত কোথাও পাওয়া যায় না। গোপাল বাঙালী ছিলেন, পালবংশের পিতৃভূমি বাঙলাদেশ; সেই হিসাবে পাল-রাজারা যতটা বাঙালী জনসাধারণের হৃদয়ের নিকটবর্তী ছিলেন, সেন-রাজারা তাহা হইতে পারেন নাই। তারনাথের আমলে যে-ভাবে গোপাল-নির্বাচনের কাহিনী লোকস্মৃতিতে বিধৃত ছিল, ধর্মপালের যশ যেভাবে দোকানে-চত্বরে জনসাধারণের কণ্ঠে গীত হইত, মহীপালী-যোগীপাল-ভোগী।পালের গানের স্মৃতি যে-ভাবে বাঙালী জনসাধারণ আজও ধারণ করে, বহুদিন পর্যন্ত লোকে যে-ভাবে “ধান ভানতে মহীপালের গীত’ গাহিত, বল্লালসেন ছাড়া সেন-রাজাদের কাহারও সে-সৌভাগ্য হয় নাই। এই তথ্যের ঐতিহাসিক ইঙ্গিত অবহেলার জিনিস নয়। সেনরাজাদের মহিমা যাহা যতটুকু গীত হইয়াছে তাহা সভাকবিদের কণ্ঠে, যেটুকু তীহাদের স্মৃতি আজও জাগরূক, তাহা ব্ৰাহ্মণ্যস্মৃতিশাসিত সমাজের উচ্চতর শ্রেণীগুলিতে মাত্র। এ-তথ্যও ঐতিহাসিকদের বিচারের বস্তু। গোপাল বা ধর্মপাল-দেবপাল-মহীপালের সঙ্গে বিজয়-বল্লাল-লক্ষ্মণের তুলনা নিরর্থক এবং অনৈতিহাসিক। পালবংশকে বাঙালী ভালবাসিয়াছিল, এবং তাহদের গৌরবকে নিজেদের জাতীয় গৌরব বলিয়া মানিয়া লইয়াছিল; বাঙলাদেশে তাহার প্রমাণ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। বল্লাল ব্যতীত সেনা-রাজাদের একজনের সম্বন্ধেও একথা বলা চলে কি না সন্দেহ। একটি লোকগীতিও সেনা-রাজাদের কাহারও নামে রচিত হয় নাই; বাঙলা সাহিত্যে লোকস্মৃতিতে সেন-রাজারা বাঁচিয়া নাই।
বল্লালসেন ।। আঃ ১১৫৯-৭৯
বিজয়সেনের পুত্ৰ বল্লালসেন (আ. ১১৫৯-৭৯) একবার গৌড় আক্রমণ ও জয় করিয়াছিলেন, বোধহয় গোবিন্দপালের আমলে। বল্লালের অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে এই গৌড়-বিজয়ের একটু ইঙ্গিত আছে। বল্লাল-চরিত গ্রন্থে তাহার মগধ ও মিথিলায় বিজয়ী সমারাভিযানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়; কিন্তু এই দুই শতক পরবর্তী গ্রন্থের সাক্ষ্য কতখানি প্রামাণিক বলা কঠিন। তবে, মিথিলা অধিকার একেবারে অমূলক না-ও হইতে পারে। যদি তাহা না হয়, তাহা হইলে বল্লালের সময় বঙ্গ, রাঢ়, বরেন্দ্রী এবং মিথিলা সেনরাজ্যভুক্ত ছিল; আর একটি ছিল বাগড়ী (সুন্দরবন-মেদিনীপুর অঞ্চল)। বল্লাল কর্ণাট-চালুক্যরাজ দ্বিতীয় জগদেকমল্লের কন্যা রামদেবীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। অদ্ভুতসাগর-গ্রন্থ সমাপনের (আরম্ভ শকাব্দ। ১০৯০) আগেই বল্লালসেন পুত্ৰ লক্ষ্মণসেনের স্কন্ধে রাজ্যভার এবং গ্রন্থ-সমাপনাভার অর্পণ করিয়া সপত্নীক গঙ্গা-যমুনা সঙ্গমে (ত্রিবেণীতে?) নিরঞ্জরপরে গমন করেন। ইহার অর্থ হয়তো তিনি সপত্নীক গঙ্গা-যমুনা সঙ্গমে নিরঞ্জরপুর নামক স্থানে বানপ্রস্থে গিয়াছিলেন, অথবা গঙ্গা-যমুনা সঙ্গমে দুইজনেই জলে ঝাঁপ দিয়া স্বৰ্গারোহণ করিয়াছিলেন।
লক্ষ্মণসেন ৷ আঃ ১১৭৯-১২০৬ ৷৷
লক্ষ্মণসেন যখন সেন-সিংহাসনে আরোহণ করিলেন তখন তিনি প্রায় ষাট বৎসরের পরিণত প্রৌঢ়। পিতামহ বিজয়সেনের আমলেই গৌড়-কলিঙ্গ-কামরূপের রণক্ষেত্রে তিনি শৌর্য-বীৰ্য প্রকাশ করিয়াছিলেন বলিয়া অনুমিত হয়; তাহার রাজত্বকালে এই তিনটি দেশুই যে সেন-রাজ্যভুক্ত হয়, এসম্বন্ধে নিঃসংশয় লিপিপ্রমাণ বিদ্যমান। তাহার পুত্রদের লিপিতে বলা হইয়াছে লক্ষ্মণসেন পুরী, বারাণসী ও প্রয়াগে বিজয়স্তম্ভ প্রোথিত করিয়াছিলেন। পুৱী-জয়ের ইঙ্গিত বোধ হয় কলিঙ্গ-জয়ের মধ্যেই পাইতেছি। কাশী-জ্বয়ের সুস্পষ্ট উল্লেখ লক্ষ্মণসেনের নিজের লিপিতেই আছে। পশ্চিমে তাঁহার রাজত্ব প্রয়াগ পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছিল বলে মনে হইতেছে। শেষ পালরাজ গোবিন্দপালের পর মগধাঞ্চল গাহড়বাল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়া গিয়াছিল; বিজয়সেন এই অঞ্চল সেন-রাজ্যভুক্ত করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু সে-চেষ্টা খুব সার্থক হয় নাই। ১১৯২ খ্ৰীষ্টাব্দেও বুদ্ধগয়া অঞ্চল গাহড়বালদের অধিকারে ছিল বলিয়া লিপি প্রমাণ বিদ্যমান। কাশীও গাহড়বালদের অধীনেই ছিল, এবং যে কাশীরাজকে লক্ষ্মণসেন। পরাজয়ের দাবি করিয়াছেন তিনি নিশ্চয়ই গাহড়বাল-রাজ জয়চন্দ্র। লক্ষ্মণসেন প্ৰয়াগ পর্যন্ত দেশ গাহািড়বালদের কারচু্যত করিয়াছিলেন। কিনা বলা কঠিন; তবে মুসলমান-বিজয় পর্যন্ত গয়া অঞ্চল যে লক্ষ্মণসেনের আধিপত্যের অন্তর্গত ছিল অশোকচল্লের দুইটি লিপিই তাহার প্রমাণ। বারাণসী-প্ৰয়াগেও হয়তো একবার তিনি বিজয়ী সমারাভিযান করিয়া থাকিবেন। লক্ষ্মণসেনের মগধাধিকার এবং প্রয়াগ পর্যন্ত সমরাভিযান গাহড়বালশক্তিকে দুর্বল করিয়াছিল, সন্দেহ নাই। এই রাজ্যই ছিল ক্ৰমাগ্রসরমান মুসলমানদের বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধ-প্রাচীর; সেই প্রাচীরকে দুর্বল করিয়া লক্ষ্মণসেন রাষ্ট্র ও সমরবুদ্ধির কতটুকু পরিচয় দিয়াছিলেন, এ-সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের প্রশ্ন অনিবার্য। এ-তথ্য সুবিদিত যে, মুহম্মদ ব্যক্তিয়ার খিলজি প্রায় বিনা বাধায় সমস্ত বিহার ও বাঙলা জয় করিয়াছিলেন; গাহড়বাল রাজশক্তির প্রতিরোধ-প্রাচীর ভাঙিয়া পড়ার পর আর কোনও বাধাই তাহার সন্মুখে উত্তোলিত হয় নাই। যে অস্ত্র ও সৈন্যবল কামরূপ-কাশী-কলিঙ্গ জয় করিয়াছিল। সেই অস্ত্র ও সৈন্যবল কোথায় আত্মগোপন করিয়াছিল? যাহা হউক, লক্ষ্মণসেন যে-রাজ্য ও রাষ্ট্র গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, সেই রাজ্য ও রাষ্ট্র ভিতর হইতে আপনি দুর্বল ও ক্ষীণ হইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। স্থানীয় আত্ম-কর্তৃত্বের যে-ব্যাধি পাল-রাষ্ট্রকে ভিতর হইতে দুর্বল করিয়া দিয়াছিল, সেন-রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। এই ব্যাধিরই এক রাষ্ট্ৰীয় রূপ সামন্ততন্ত্র।
