ব্ৰহ্ম-ক্ষত্রি বা ব্ৰহ্মক্ষত্রিয় সেন-পরিবারের পূর্বপুরুষেরা আগে ব্ৰাহ্মণ ছিলেন, পরে ব্রাহ্মণদের আচার-সংস্কার এবং জীবিকা পরিত্যাগ করিয়া ক্ষত্ৰিয়বৃত্তি গ্রহণ করেন। সামন্তসেন নিজে ব্ৰহ্মবাদী ছিলেন, তাহা ছাড়া সেন-রাজারা যে একসময় বৈদিক—যাগ-যজ্ঞকারী ব্ৰাহ্মণ ছিলেন তাহার কিছু আভাসও সেন-লিপিতে আছে। ভারতবর্ষের অন্যত্রও ৪/৫টি ব্ৰহ্মক্ষত্ৰিয় রাজবংশের খবর জানা যায়।
বংশপরিচয় ॥ অভূত্যুদয় ৷ পিতৃভূমি
এই ব্ৰহ্মক্ষত্রিয়, ক্ষত্ৰিয় বা কর্ণাট-ক্ষত্ৰিয় সেনা-পরিবার কী করিয়া কখন বাঙলা দেশে আসিয়াছিলেন, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা কঠিন। পালরাজাদের সৈন্যদলে (এবং বোধ হয়। আমলাতন্ত্রেও) অনেক ভিনাপ্রদেশি—খস-মালব-কুণ-কলিক-কর্ণাট-লাট-লোক নিযুক্ত হইতেন; কৰ্ণাটীরাও তাহা হইতে বাদ পড়েন নাই। কোনও সেনবংশীয় কর্ণাটী রাজকর্মচারী হয়তো ক্ৰমে ক্ষমতাশালী হইয়া উঠিয়া আপন সামন্তত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকিবেন, এবং পরে পালবংশের দুর্বলতার সুযোগ লইয়া নিজ আধিপত্য বিস্তার করিয়া থাকিবেন। অথবা, দক্ষিণাগত কোনও সমারাভিযানের সঙ্গেও এই কর্ণাটী সেনা-পরিবারের বাঙলা দেশে আসা বিচিত্র নয়। কর্ণাটী চালুক্যরাজ যষ্ঠ্য বিক্ৰমাদিত্য একবার উত্তর-ভারতে সমরাভিযানে আসিয়াছিলেন, এবং অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, গৌড়, মগধ, নেপাল প্রভৃতি দেশ জয় করিয়াছিলেন (১১২১, ১১২৪)। তঁহারই এক সামন্ত আর একবার কলিঙ্গ, বঙ্গ, গুর্জর, মালব প্রভৃতি দেশ জয় করিয়াছিলেন। (১১২২-২৩)। কর্ণাটী চালুক্যবংশের রাজা তৃতীয় সোমেশ্বর (১১২৭-৩৮) ও তাঁহার পুত্র সোম বঙ্গ, কলিঙ্গ, মগধ, নেপাল, অন্ধ, গৌড় ও দ্রাবিড় দেশে বিজয়ী সমারাভিযানের দাবি করিয়াছেন। বস্তুত, এই বংশের রাজা প্রথম সোমেশ্বর কর্তৃক পরমাররাজ প্রথম ভোজ এবং কলচুরীরাজ কর্ণের পরাজয়ের পর হইতেই উত্তর-ভারতে কর্ণাটী প্রতাপ-প্রবাহের দ্বার উন্মুক্ত হয়। এই সব বিচিত্র কর্ণাটী সমরপ্রবাহের সঙ্গেই কর্ণাটী সেনবিংশ বাঙলায় আসিয়া থাকিবেন। বস্তুত, বাঙলাদেশে যখন সামন্ত সেনপুত্ৰ হেমন্তসেন এবং তৎপুত্র বিজয়সেন ধীরে ধীরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করিতেছেন, তখন মিথিলা ও নেপালে আর একটি কর্ণাটী সেনা-বংশও ধীরে ধীরে মস্তকোত্তালন করিতেছিল; এই বংশই নান্যদেবের বংশ। এই সময়েই কন্যকুব্জ-বারাণসীতে গাহািড়বাল রাজবংশও নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করিতেছিলেন; ইহারাও কর্ণাটাগত বলিয়া কোনও কোনও ঐতিহাসিক মনে করেন। লক্ষ করা প্রয়োজন, এই প্রত্যেকটি রাজবংশই গোড়া পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম, সংস্কার এবং সংস্কৃতি আশ্রয়ী।
সামন্তসেনের পুত্ৰ হেমন্তসেন দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে সামন্ত-চক্রের বিদ্রোহের এবং ভ্ৰাতৃবিরোধের সুযোগ লইয়া রাঢ়দেশ অঞ্চলে কিছু স্থানীয় সামন্তাধিপত্যের প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকিবেন। তাহার সম্বন্ধে আর কিছুই জানা যায় না, তবে তাহার পুত্র-পৌত্রদের লিপিতে তিনি মহারাজাধিরাজ, আখ্যায় ভূষিত হইয়াছেন।
বিজয়সেন ॥ আঃ ১০৯৬-১১৫৯ ৷৷
হেমন্তসেনের পুত্র বিজয়সেন (আ. ১০৯৬-১১৫৯) শূর-পরিবারের কন্যা বিলাসদেবীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। রাজেন্দ্রচোলের পূর্বভারতে সমরাভিযানের সময় এক রণশ্বর দক্ষিণ রাঢ়ের রাজা ছিলেন; আর এক শুর-নিরপতি লক্ষ্মীশূরের খবর পাওয়া যায় রামচরিতে; তিনি অপর-মন্দারের (হুগলী জেলার পশ্চিমাঞ্চল) সামন্ত নৃপতি ছিলেন এবং ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রামপালকে সাহায্য করিয়াছিলেন। আর এক শূররাজ আদিশূর বাঙলার লোকস্মৃতিতে আজও বঁচিয়া আছেন; কুলজী-গ্রন্থের মতে আদিশূরের নাম বাংলার কৌলীন্যপ্রথার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। শুর-পরিবারে এই বিবাহ রাঢ়দেশে বিজয়সেনের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করিয়া থাকিবে। কিন্তু তিনি কী করিয়া রাঢ়দেশের অন্যান্য সামন্তদের জয় করিয়াছিলেন, কী করিয়া বর্মণদের পরাজিত করিয়া পূর্ববঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন এবং পাল-বংশের প্রভুত্ব হইতে উত্তরবঙ্গ কড়িয়া লইয়াছিলেন, তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা কঠিন। দেওপাড়া-লিপিতে তাহার হস্তে গৌড়, কামরূপ এবং কলিঙ্গরাজ এবং বীর, নান্য, রাঘব এবং বর্ধন নামে কয়েকজন সামন্ত-নিরপতির পরাজয়ের দাবি করা হইয়াছে। বর্ধন রামচরিতোক্ত কৌশাম্বীর (বগুড়া বা রাজশাহী জেলায়)। নরপতি দ্বোরপবর্ধন; বীর কোটাটবীর নরপতি বীরগুণ হওয়া অসম্ভব নয়। ইহারা দুইজনই ছিলেন বরেন্দ্রীযুদ্ধে রামপালের সহায়ক। রাঘব সম্ভবত কলিঙ্গ নরপতি অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গের (১১৫৬-১১৭০) দ্বিতীয় পুত্র। নান্য মিথিলার কর্ণাট-বংশীয় সেনা-রাজ নান্যদেব বলিয়াই মনে হয়। আর যে গৌড়পতিকে বিজয়সেন পরাজয়ের দাবি করিয়াছেন, তিনি মদনপাল হওয়াই সম্ভব। গৌড়-জয় অর্থ বরেন্দ্রী-জয়, কারণ গৌড়েশ্বর পাল-রাজাদের আধিপত্য মদনপালের সময়ে বাঙলাদেশে বরেন্দ্রীর বাহিরে আর কোথাও ছিল না। বিজয়সেন প্ৰদ্যুমেশ্বরের একটি মন্দির নির্মাণ করিয়াছিলেন, রাজশাহী শহরের ৭}৮ মাইল পশ্চিমে পদুমসহর দীঘির পাড়ে এই মন্দিরের বিস্তৃত ধ্বংসাবশেষ এখনও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। লক্ষ্মণসেনের আগে গৌড়বিজয় বিজয়সেন বা তৎপুত্র বল্লালের ভাগ্যে সম্ভব হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না; কারণ ইহাদের নিজেদের লিপিতে ইহারা গৌড়েশ্বর উপাধি দাবি করেন নাই। লক্ষ্মণসেনই সৰ্ব্বপ্রথম এই উপাধি-অলংকার ধারণা করিয়াছেন, এবং তাহাও তোহার রাজত্বের শেষ দিকে। বিজয়সেন বর্মণবংশীয় রাজাদের হাত হইতে (পূর্ব)-বঙ্গও কাড়িয়া লইয়াছিলেন; রাজকীয় লিপিই তাহার অকাট্য সাক্ষ্য। বস্তুত, সেনা-বংশের গোড়াকার দিকে সমস্ত লিপিরই উৎস “বঙ্গে বিক্রমপুরভাগে”; এই বিক্রমপুর জয়স্কন্ধাবারেই বিজয়সেন-মহিষী মহাযজ্ঞ তুলাপুরুষ মহাদান অনুষ্ঠান করেন। বিজয়সেনের কলিঙ্গ ও কামরূপ-জয়ের প্রকৃতি নির্ধারণ কঠিন। তাহার পৌত্র লক্ষ্মণসেনও এই দুই দেশে বিজয়ী সমারাভিযান প্রেরণের দাবি করিয়াছেন।
