আমলাতন্ত্র
সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেমন প্রসারিত হইয়াছিল, তেমনই প্রসারিত হইয়াছিল আমলা বা কর্মচারীতন্ত্র। বস্তুত, পাল-যুগের লিপিমালায় রাজকর্মচারীদের যে সুদীর্ঘ তালিকা দৃষ্টিগোচর হয়। তাহা হইতে এই তথ্য সুস্পষ্ট যে, এই যুগে রাষ্ট্রের বৃহদ্বাহু সমাজের সর্বাঙ্ক ব্যাপিয়া বিস্তুত। বিভিন্ন রাষ্ট্রকর্মের বিচিত্র বিভাগে বিচিত্র কর্মচারী রাষ্ট্রর প্রধান কেন্দ্ৰ হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে গ্রামের হাট খেয়াঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত ৷ লৌকিক প্রায় সমস্ত ব্যাপারই ব্লাষ্ট্রশাসনের গাওঁীর অন্তর্ভুক্ত, এমন কি পারলৌকিক ধর্মাচরণ পর্যন্ত। লিপিগুলিতে এই সব বিক্রিত” বিভাগের বিচিত্র কর্মচারীর সুদীর্ঘ তালিকা দেওয়ার পরও যখন তাহা শেষ হয় নাই তখন “অন্যাংশ্চকীর্তিতান” বলিয়া বাকি সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। একটা বৃহৎ আমলাতন্ত্র যে পাল-যুগে গড়িয়া উঠিয়াছিল। এই সব সাক্ষ্যই তাহার প্রমাণ। প্রধান প্রধান কঁর্মচারী, যেমন মন্ত্রী, সেনাপতি ইত্যাদির হাতে ক্ষমতাও প্রচুর কেন্দ্রীকৃত হইত। অত্যন্ত স্বাভাবিক উপায়েই। এই সব কর্মচারীরাও কখনো কখনো সুযোগ পাইলে রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রতিকূল আচরণ করিতেন না, এমন নয়। দিব্য তো একজন উচ্চ রাজকর্মচারী ছিলেন বলিয়া মনে হয়; আর, বৈদ্যদেব তো কুমারপালের সেনাপতিই ছিলেন।
সমাজের কৃষি-নির্ভরতা
এই সামন্ততন্ত্র ও আমলাতন্ত্র অকারণে গড়িয়া উঠে নাই। এই আমলে বাঙলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের খবর একেবারেই পাওয়া যাইতেছে না। তাম্রলিপ্তি মৃত; নূতন কোনো বন্দর গড়িয়া উঠিয়াছে বলিয়া খবর নাই। বিহার-বাঙলার সঙ্গে সুমাত্রা-যবদ্বীপ-ব্ৰহ্মদেশ ইত্যাদি পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও দ্বীপগুলির যোগাযোগ অব্যাহত; নালন্দায় প্রাপ্ত শৈলেন্দ্ৰবংশীয় বালপুত্রদেবের লিপিই তাহার অন্যতম প্রমাণ! এই সব দ্বীপ ও দেশগুলির ইতিহাসেও এই যোগাযোগের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়; কিন্তু একটি প্রমাণও ব্যাবসা-বাণিজ্যিক যোগাযোগের দিকে ইঙ্গিত করে বলিয়া মনে হয় না, সবই যেন ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্বন্ধীয়। তবে আন্তঃদেশীয় ব্যাবসা-বাণিজ্য অব্যাহত; লিপিগুলিতে বণিক-ব্যবসায়ী ইত্যাদির সংবাদ অপ্রতুল নয়। নানাপ্রকার কারু এবং চারুশিল্পের সংবাদও পাওয়া যাইতেছে এবং শিল্পীদের গোষ্ঠী যে ছিল তাহার অন্তত একটি প্রমাণ আছে। জনৈক শিল্পীগোষ্ঠী-চুড়ামণি তো একজন সামন্ত বা উচ্চ রাজপদও (রাণক) লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু তৎসত্ত্বেও মনে হয় রাষ্ট্রে বা সমাজে শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ীর প্রাধান্য খুব ছিল না। তাহা ছাড়া, বর্ণ ব্ৰাহ্মণা-সমাজে তাহারা উচ্চস্থান অধিকার করিতেন বলিয়া মনে হয়। না। রৌপ্যমুদ্রা প্রচলনের খবর যদি বা পাওয়া যাইতেছে। সুবর্ণমুদ্রা একেবারে নাই। এই সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিপত্তি রাষ্ট্রে ও সমাজে খুব ছিল না। অথচ অন্যদিকে সমাজে ভূমি ও কৃষিনির্ভরতা ক্রমশ বাড়িয়া যাইতেছে তাহার প্রমাণ প্রচুর। ব্ৰাহ্মণ সম্প্রদায়, রাজপাদোপজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী (মহত্তর, কুটুম্ব প্রভৃতি) ইত্যাদি সকলেই তো ভূমিনির্ভর। তাহা ছাড়া, ক্ষেত্রকর, কৃষক, কর্ষকেরা বারবার লিপিগুলিতে উল্লিখিত হইতেছেন দেখিয়া এ-অনুমান করা চলে যে, সমাজে তাহাদের স্বীকৃতি বাড়িয়াছে। প্রধানত ভূমি-নির্ভর সমাজে সামস্ততান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা কতকটা স্বাভাবিক। ভূমিই যে-সমাজে জীবিকার প্রধান উপায় এবং ভূমির উপর ব্যক্তিগত ভোগাধিকার যেখানে স্বীকৃত, সেখানে সামন্ততান্ত্রিক ভূম্যধিকারগত সমাজ-ব্যবস্থা গড়িয়া উঠিবে, ইহা কিছু আশ্চর্য নয়।
এই একান্ত ভূমি-নির্ভরতার ছবি পাল-যুগের রাজকর্মচারীদের তালিকাটি দেখিলেও চোখে পড়ে। আশ্চর্য এই সুদীর্ঘ তালিকাটির মধ্যে নাকাধ্যক্ষ (নৌকাধ্যক্ষ-নাবাধ্যক্ষ), শোন্ধিক (যিনি শুল্ক আদায় করেন) এবং তরিক (পারাপার-কর্তা) ছাড়া আর একটি পদও ব্যাবসা-বাণিজ্য ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এবং এই তিনটি পদও যে একান্তই ব্যাবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত তাহাও বলা চলে না। অন্যদিকে সামরিক ও শাসনসংক্রান্ত কর্মচারী ছাড়া অধিকাংশ রাজপদ ভূমি ও কৃষিসম্পর্কিত।
০৮. সেনায়ন
বাঙলার সেন-রাজবংশ “দাক্ষিণাত্য-ক্ষৌণীন্দ্র” এবং ব্ৰহ্মক্ষত্ৰিয়; “কর্ণাট-ক্ষত্ৰিয়” বলিয়াও তাহারা আত্মপরিচয় দিয়াছেন। ইহাদের পূর্বপুরুষ বীরসেনকে চন্দ্ৰবংশীয় এবং পুরাণ-কীর্তিত বলিয়া দাবি করা হইয়াছে। বিজয়সেনের পিতামহ সামন্তসেন দাক্ষিণাত্যে কর্ণাট-লক্ষ্মীর লুণ্ঠনকারীদের হত্যা করিয়াছিলেন বলিয়া একটি উক্তিও সেন-লিপিতে দেখা যায়। ইহার প্লর সেন-রাজাদের পূর্বপুরুষ যে দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটদেশ হইতে আসিয়াছিলেন, এ-সম্বন্ধে আর কোনও সন্দেহ করা চলে না। কর্ণাটাগত চন্দ্ৰবংশীয় কোনও সেনা-পরিবার রাঢ়া ভূমিতে আসিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন। সেই পরিবারে সামন্তসেনের জন্ম হয়। সামন্তসেনের বাল্য এবং যৌবন বোধ হয় কাটিয়াছিল কর্ণাটে; দক্ষিণাতো যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হইয়া কিছু সুখ্যাতিও তিনি অর্জন করিয়া থাকিবেন; পরে বৃদ্ধ বয়সে রাঢ়দেশে আসিয়া বানপ্ৰস্থ অবলম্বন করিয়া গঙ্গাতীরে আশ্রমবাসে দিন কাটাইয়াছিলেন।
