নমঃশূদ্রদের সম্বন্ধে নরতাত্ত্বিক পরিমিতি-গণনার ফলাফল একটু চাঞ্চল্যকর। এ তথ্য অন্যত্রও উল্লেখ করিয়াছি যে, দেহবৈশিষ্ট্যের দিক হইতে ইহারা উত্তর-ভারতের বর্ণব্রাহ্মণদের সমগোত্রীয়; বস্তুত, উত্তর-ভারতের বর্ণ-ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বাঙালী ব্রাহ্মণ-বৈদ্য-কায়স্থদের চেয়েও বাঙালী নমঃশূদ্রদের আত্মীয়তা বেশি। অথচ এই নমঃশূদ্রেরা আজ সমাজের একেবারে নিম্নতম স্তরে! আমরা তাঁহাদের চণ্ডাল বা চাঁড়াল বলিয়া জানি, এবং বৃহদ্ধর্মপুরাণ রচনার কালেই ইহারা অন্ত্যজশ্রেণীভুক্ত। এই সামাজিক তথ্যের সঙ্গে নরতত্ত্বপ্রমাণগত তথ্যের যুক্তির ও ইতিহাস-সম্মত ব্যাখ্যার কোনও সম্বন্ধ এখনও কিছু খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই।
যাহাই ইউক উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত বিবৃতি বাঙলার বিভিন্ন জেলার বিচিত্র বর্ণসমূহের ভিতর আপেক্ষিক সূক্ষ্ম ও স্থল পার্থক্য, একই বর্ণের মধ্যে দেহপরিমিতির ভেদবৈচিত্র্য ইত্যাদি খুঁটিনাটি বিচার করিলে বলিতেই হয়, এ সমস্তই বিচিত্র জন-সাংকর্যের দ্যোতক। জন-সাংকর্যের নরতত্ত্বগত বৈশিষ্ট্যের জৈব মিশ্রণের এমন চমৎকার দৃষ্টান্ত আর কী হইতে পারে। বস্তুত, স্মরণাতীত কাল হইতে এই ধরনের জন-সাংকর্যের দৃষ্টান্ত ভারতবর্ষের অন্যত্র খুব সুলভ নয়। এই মিশ্রণ এত গভীর ও ব্যাপক যে, নরতত্ত্বের দিক হইতে কোনও বিশিষ্ট বর্ণ, যত উচ্চ বা নিম্নই হউক না কেন, বা কোনও বিশিষ্ট স্থানে অধিবাসীদের একান্তভাবে স্বতন্ত্র করিয়া দেখিবার উপায় নাই।
৪. ঐতিহাসিক কালে বাঙলার জনপ্রবাহ
দ্বিতীয় অধ্যায় । ইতিহাসের গোড়ার কথা
চতুর্থ পরিচ্ছেদ – ঐতিহাসিক কালে বাঙলার জনপ্রবাহ
ঐতিহাসিক কালে বাঙলার জনপ্রবাহ
জনপ্রবাহ তো একটি নিরবচ্ছিন্ন ধারা; সে ধারা কখনও একটা নির্দিষ্ট সময়ে আসিয়া ঠেকিয়া যাইতে পারে না এবং তাহার ইতিহাস কোথাও শেষ হইয়া যায় না। সেই ধারা আজও বহমান। কাজেই প্রাচীন বাঙলাদেশে ঐতিহাসিক কালে সেই চিরবহমান ধারায় আরও কোনও কোনও জনের রক্তস্পর্শ লাগিয়াছে কি না, লাগিলে কতটুকু লাগিয়াছে এবং সেই প্রবহমান ধারাকে কিভাবে কতটুকু রূপান্তরিত করিতে পারিয়াছে বা পারে নাই, তাহার পরিচয়ও এই সঙ্গেই লওয়া প্রয়োজন |
খ্ৰীষ্টীয় প্রথম শতকে গ্ৰীক ভৌগোলিক ও জ্যোতির্বিদ টলেমি (Ptolemy) তাঁহার ‘ইণ্ডিকা’-গ্রন্থে গঙ্গার পূর্বশায়ী দেশগুলির পরিচয় দিতে গিয়া মুরুণ্ড (Murandool) নামে এক জনপদের উল্লেখ করিয়াছেন। পঞ্জাব অঞ্চলে এক মুরুণ্ড উপকোমের উল্লেখ গ্রীক ঐতিহাসিকেরা একাধিকবার করিয়াছেন; ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই মুরুণ্ডেরা সুপরিচিত। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তিতে এই মুরুণ্ডদের উল্লেখ আছে কুষাণবংশীয় দেবপুত্রশাহী-শাহনুশাহী এবং শকদের সঙ্গে। ইহা হইতে অনুমান হয় যে এই মুরুণ্ডরা জন হিসাবে শক-কুষাণদেরই সমগোত্রীয়। শক-কুষাণেরা এক মিশ্র জন। পূর্ব-ভারতে গঙ্গার পূর্বাঞ্চলে যে মুরুণ্ডদের কথা টলেমি বলিতেছেন তাহারা পঞ্জাবের মুরুণ্ডদেরই একটি শাখা হওয়া বিচিত্র নয়। তবে, এই মুরুণ্ডরা বাঙলাদেশে নূতন কোনও রক্তপ্রবাহ বহন করিয়া আনে নাই, তাহা কতকটা নিশ্চয় করিয়া বলা যায়।
বাঙলার বাহিরের অনেক রাজবংশের পরাক্রান্ত রাজারা সৈন্যসামন্ত লইয়া বহুবার বাঙলাদেশ আক্রমণ করিয়াছেন, কমবেশি অংশ-জয় করিয়াছেন, এবং তাহার পর বিজয়গর্ব লইয়া, বহুবিধ ঐশ্বর্য লইয়া স্বদেশ ফিরিয়া গিয়াছেন। সৈন্যসামন্ত ইত্যাদি সঙ্গে যাহারা আসিয়াছিল, তাহাদের অধিকাংশ বিজেতা প্রভুর সঙ্গেই ফিরিয়া গিয়াছে। কিছু যাহারা হয়তো স্থায়ী বাসিন্দারূপে থাকিয়া গিয়াছে তাহারা জনসমুদ্রে জলবিন্দুবৎ কোথায় যে বিলীন হইয়া গিয়াছে, তাহার কোনও হিসাব নাই। ইহারা ছাড়া, পাল ও সেন রাজাদের পট্টোলীগুলিতে এবং সমসাময়িক বাঙলার অন্যান্য লিপিতে দেখা যায়, অনেক অবাঙালী ভারতীয় কোম-উপকোমের উল্লেখ। ভূমি দান-বিক্রয়ের পট্টোলীগুলিতে দান-বিক্রয় যাহাদের নিকট বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে, সেখানে বিভিন্ন রাজকর্মচারী, স্থানীয় মহত্তর, গৃহস্থ, কুটুম্ব ইত্যাদির পরই নাম করা হইতেছে নানা কোম ও উপকোমের। দৃষ্টান্তস্বরূপ মদনপালের মন্হলি পট্টোলীর তালিকাটি উদ্ধার করা যাইতে পারে; রাজকর্মচারীদের পরেই তালিকাগত করা হইয়াছে “গৌড়-মালব-চোড়-খস-তৃণ-কুলিক-কর্ণাট— লাট-ভট্ট” প্রভৃতি রাজসেবকদের। ইহাদের মধ্যে মালব, চোড়, খস, তৃণ, কুলিক, কর্ণাট, লাট সকলেই অবাঙালী; হুণেরা তো মূলত অ-ভারতীয়, কিন্তু ইতিপূর্বেই তাহারা অন্তত চার-পাঁচ শত বৎসর ধরিয়া এ দেশে বাস করিয়া ভারতীয় বনিয়া গিয়াছে। আমার ধারণা—অন্যত্র এ ধারণার কারণ বলিতে চেষ্টা করিয়াছি—এইসব অবাঙালী কোমের লোকেরা বাঙলাদেশে আসিয়াছিল বেতনভুক সৈনিকরপে, না-হয় রাজ-সরকারে একান্ত নিম্নস্তরের কর্মচারী রূপে। বৃহদ্ধর্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে এই রকম কয়েকটি ভিন-প্রদেশী কোমের খবর পাইতেছি, যথা, খস, যবন, কম্বোজ, খর, দেবল বা শাকদ্বীপী, ব্রাহ্মণ। যে ভাবেই হউক এইসব লোকেরা ক্রমশ বাঙলাদেশেরই বাসিন্দা হইয়া গিয়াছিল এবং এ দেশেরই বিশাল জনসমুদ্রে নিজেদের বিলীন করিয়া দিয়াছিল। বাঙলাদেশের জনপ্রবাহের বেগবান ধারায় কবেই ইহারা নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে। কর্ণাট হইতে কল্যাণের চালুক্য রাজবংশ, তামিলভূমি হইতে চোল রাজবংশ একাদশ শতকে বাঙলাদেশে সার্থক বিজয়াভিযান প্রেরণ করিয়াছিল; যে সব সৈন্যসামন্ত এইসব অভিযানের সঙ্গে আসিয়াছিল, তাহাদের কিছু কিছু এই দেশে থাকিয়া যাওয়া অসম্ভবও নয়। ইহাদের আগে মালবরাজ যশোধৰ্মাও এক অভিযানে পূর্ব-ভারতে আসিয়াছিলেন। প্রতিহারবংশীয় রাজারাও বাঙলাদেশে একাধিক বিজয়াভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন। শৈলবংশীয় রাজারাও এক সময়ে এ দেশে এক সমরাভিযান পাঠাইয়াছিলেন। এইসব বিচিত্র সেনাবাহিনীর কিছু কিছু অংশ হয়তো পশ্চাতে থাকিয়া গিয়াছিল এবং তাহারাই যে পরবর্তীকালে মালব, চোড় (চোল), কর্ণাট, লাট, প্রভৃতি নামে রাজসেবক হইয়া পাল ও সেন-লিপিগুলিতে দেখা দেয় নাই, তাহা কে বলিবে? হুণ, খস ইত্যাদিরাও হয়তো এইভাবেই আসিয়া থাকিবে। খসেরা তো হিমালয়ের সানুদেশের পার্বত্য জন; ভোট-চৈনিক রক্তের প্রভাব ইহাদের মধ্যে থাকা স্বাভাবিক। ধর্মপালের খালিমপুর লিপিতে বাঙলাদেশের মন্দিরে লাটদেশীয় ব্রাহ্মণ পুরোহিতের উল্লেখ আছে। আদি-মধ্যযুগের দু-একটি লিপিতে বাঙলার বাহিরের ভিন্ন-প্রদেশাগত ব্রাহ্মণকে ভূমিদানের উল্লেখ আছে। অন্যান্য বর্ণের লোকেরাও নিশ্চয়ই নানা কাজে এ দেশে আসিয়াছিল এবং অনেকেই কালক্রমে এ দেশেরই বাসিন্দা হইয়া গিয়াছিল। ইহাদের মধ্যে অন্ধ্ররাও পাল আমলে, বোধ হয় তাহারও আগে, বাঙলাদেশে আসিয়াছিল। একটু অন্য প্রসঙ্গে লিপিগুলিতে ইহাদেরও নাম পাওয়া যায় একেবারে চণ্ডালদের সঙ্গে। কেন যে সমাজের একেবারে নিম্নতম স্তরে চণ্ডালদের সঙ্গে ইহাদের স্থান নির্ণীত হইয়াছিল, তাহা বোঝা যায় না। যাহাই হউক, যে ভাবেই আসিয়া থাকুক, এবং সমাজের যে স্তরেই থাকুক, অগণিত জনপ্রবাহের মধ্যে ইহারা সংখ্যায় এত স্বল্প এবং ইহাদের প্রত্যেকের ধারা এত ক্ষীণ যে, জনতত্ত্বের দিক হইতে আজ আর তাদের পৃথক করিয়া চিনিয়া লইবার উপায় নাই, বিরাট বেগবান প্রবাহের মধ্যে তাহারা একবারে নিশ্চিহ্ন হইয়া অঙ্গীভূত হইয়া গিয়াছে। তাহা ছাড়া ইহারা সকলেই তো পূর্ববর্ণিত কোনও না কোনও বৃহত্তর জনের অঙ্গীভূত ছিল এবং সে সব জাতি ঐতিহাসিক যুগের পূর্বেই বাঙলাদেশে তাহাদের রক্তপ্রবাহ সঞ্চার করিয়া গিয়াছিল; যাহারা পারে নাই, তাহাদের ঐতিহাসিক বংশধরেরা পরবর্তী কালে যে স্বল্প সংখ্যায় বাঙলাদেশে আসিয়াছিল, যে ক্ষীণ ধারা সঙ্গে আনিয়াছিল, তাহাতে সুস্পষ্ট নিদর্শন আঁকিয়া দেওয়া সম্ভব ছিল না।
