সামন্ততন্ত্র
কিন্তু জাতীয় স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং সমন্বয় ও সমীকরণ পালযুগের রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান করিতে পারে নাই! স্থানীয় প্রাদেশিক আত্মকর্তৃত্বের রাষ্ট্রীয় আদর্শের কথা বলিয়াছি। এই আদর্শ শুধু যে বৃহত্তর রাষ্ট্ৰীয় ক্ষেত্রেই সক্রয় ছিল তাহা নয়, সাম্রাজ্যিক গুপ্ত-আমলের পর হইতে আন্তরাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রেও এই আদর্শ ক্রমশ কার্যকরী হইল। ইহা হইতেই সামন্ততন্ত্রের উদ্ভব, এবং আগেই দেখিয়াছি মোটামুটি যষ্ঠ শতক হইতে বাঙলা দেশেও মহারাজাধিরাজের বৃহত্তর রাজ্যের মধ্যে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ত-নায়ক ও সামগু-রাজার রাজ্য ও রাষ্ট্রের বিস্তার। নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে ইহারা প্রায় স্বাধীন নরপতির মতনই ব্যবহার করিতেন; শুধু মৌখিকত মহারাজাধিরাজকে মানিয়া চলিতেন মাত্র। পাল-আমলে এই সামন্ত প্ৰথা ভারতের অন্যান্য প্রদেশের ন্যায় বাঙলাদেশেও পূর্ণ পরিণতি লাভ করিয়াছিল। বস্তুত, পালরাষ্ট্রের রাষ্ট্রভিত্তিই এই সামন্ততন্ত্র এবং এই সমস্তুতন্ত্রই পাল-রাষ্ট্রের শক্তি এবং সঙ্গে সঙ্গে দুর্বলতাও। বিজিত রাষ্ট্রসমূহকে মৌর্য বা গুপ্ত রাষ্ট্রের মতো এই আমলে আর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হইত। না; বস্তুত, তাহারা স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্রই থাকিস্ত, পাল-রাষ্ট্রের সর্বাধিপত্য স্বীকার করিত মাত্র। কিন্তু এই কেন্দ্রীয় অন্তরাষ্ট্রেও যে অসংখ্য সামন্ত নরপতি ও নায়ক ছিলেন, পাল-লিপিমালা ও রামচরিতই তাহার প্রমাণ। উভয় ক্ষেত্রেই স্থানীয় আত্মকর্তৃত্বের আদৰ্শই জয়ী হইয়াছে, এ-কথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ও রাজবংশ যখন দুর্বল হইত। তখন উভয়ই মস্তকোত্তালন করিত। দেবপালের মৃত্যুর পর বিজিত রাষ্ট্রসমূহ স্থানীয় আত্মকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াই পালসাম্রাজা ভাঙিয়া দিয়াছিল; মহীপাল সেই সাম্রাজ্যের কতকাংশ জোড়া লাগাইয়াছিলেন, কিন্তু বেশিদিন তাহা স্থায়ী হয় নাই। বিজিত ও অবিজিত রাষ্ট্র এবং অন্তরাষ্ট্রের স শাস্তবর্গ মহীপালের চেষ্টাকে ব্যর্থ করিয়া দিয়াছিল। আর, দ্বিতীয় মহীপালের বিরুদ্ধে যাহারা বিদ্রোহ করিয়াছিলেন তাহারা তো অন্তরাষ্ট্রেরই অনন্ত-সামন্তচক্র। আবার, রামপাল যখন বরেন্দ্রী পুনরুদ্ধার করিয়া পাল-রাজ্যের লুপ্ত গৌরব ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন তখনও তাহার প্রধান সহায়ক ছিলেন এই সামন্তবর্গ। আবার ইহারাই রামপালের মৃত্যুর পর পালরাজ্য ও রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করিয়া তাঁহাদের বিলুপ্তির পথে আগাইয়া দিয়াছিলেন। সামন্ত-মহাসামন্ত, মণ্ডলিক-মহামাগুলিক, মণ্ডলেশ্বর-মহামণ্ডলেশ্বর ইহারা সকলেই ক্ষুদ্র বৃহৎ সামন্ত, এবং অনেক রাজা-মহারাজা ও সামন্ত; ইহাদের সাক্ষাৎ পাল-লিপিগুলিতে বরাবরই পাওয়া যায়। রাজন, রািণক, রাজনক, রাজনাক ইহারা সকলেই সামন্ত। আর সামন্ততন্ত্র যখন ছিল তখন সামন্ততান্ত্রিক বীরধর্ম এবং সেই ধর্মোণ্ডুত বীরগাথাও প্রচলিত নিশ্চয়ই ছিল। এই বীরধর্মের কতকটা পরিচয় পাওয়া যায় দেবপালের সমস্ত বলবৰ্মার (নালন্দা-লিপি) চরিত্রে, রামচরিতে রামপালের সমস্তদের আচরণ, ভীম-সহায়ক হারির আচরণে। আর বীরগাথার পরিচয় পাওয়া যায় ধৰ্মপাল-সম্বন্ধীয় গাথায় (খালিমপুর-লিপি), উত্তরবঙ্গের মহীপালের গানে, যোগীপাল ভোগী।পালের গীতে। সুতরাং (পরবর্তী কালের ভাট-ব্রাহ্মণেরা) যে বীরগাথা গাহিয়া বেড়াইতেন তাহার অন্তত একটি প্রমাণ পাওয়া যায় মহামাণ্ডলিক ঈশ্বর ঘোষের লিপিটিতে। ঈশ্বর ঘোষের বংশের প্রতিষ্ঠাতা ধূর্তঘোয্যের পুত্র বালিঘোেষ যুদ্ধব্যবসায়ী ছিলেন; আঁহার পুত্ৰ ধবলঘোষের বীরত্ব ও গৌরব গাথায় গীত হইত। কিন্তু এই বীর্যধর্ম বা স্বামী ধর্ম সম্বন্ধে সবচেয়ে সন্দবু সংবাদ পাওয়া যায় বোধ হয় তৃতীয় গোপালের নিমদীঘি বা মাণ্ড শাসনে। এই লিপিটির পাঠ নিঃসন্দিগ্ধ নয়। নলিনীকাপ্ত ভট্টশালী মহাশয়ের পাঠ গ্রহণযোগ্য। কিনা, এ-বিষয়ে সন্দেহ পোষণের যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। এই পাঠ অনুযায়ী মিজং নামে গোপালের এক সামন্ত কলিখেছিলেন,
‘শ্ৰীমদ গোপালদেব স্বেচ্ছায় শরীর ত্যাগ করিয়া স্বৰ্গত হইয়াছেন এবং তাহার পদধূলি মিজং নামে প্রথিত আমি (হায়!) এখনও বাচিয়া আছি। পিতৃ আজ্ঞায় (রাজার প্রতি) প্রতিজ্ঞাবদ্ধ অসীম কৃতজ্ঞাসম্পন্ন ঐড়দেব সেনশত্রুকে একশত তীক্ষ্ণশরদ্বারা পূরিত করিয়া আটজন সহচরসহ রাজার সহিত স্বর্গে গিয়াছেন। যুদ্ধদ্বারা নিজের (জীবিতাবস্থা) অতিক্রম করিয়া চন্দ্ৰকিরণের মতো আমল যশ অর্জন পূর্বক শুভদেবানন্দন (ঐড়দেব) দেবতাগণের মতো ত্ৰিদশ সুন্দরীগণের দৃষ্টি লইয়া খেলা করিতেছেন। তঁহার (ঐড়দেবের) গীতবাদ্যপ্রিয়, ধর্মধর অমৎসর, গলবস্ত্ৰ, দানশূর সুসংযত বেশ বৈমাত্ৰেয় ভ্ৰাতা শ্ৰীমান ভাবিক যজ্ঞাদি ধর্মকার্য (শ্রাদ্ধ?) সম্পাদন করেন। শরশিল্য দ্বারা পূরিত বহু প্ৰাণীকে (সৈন্যকে) যে স্থানে দগ্ধ করা হইয়াছিল, সেই স্থানে ভাবকাদাসকৃত এই কীর্তি (মন্দির?) বিরাজ করিতেছে।…’
সামন্ততান্ত্রিক স্বামীধৰ্ম, বীরধর্ম পালনের ইহার চেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আর কী হইতে পারে? ঐড়দেব ও মিজং দুইটি নামই অ-সংস্কৃত, অনা-আর্য; দুইজনই প্রাচীন বাঙলার স্বামীধর্ম ও বীরধর্মের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তাহা ছাড়া, সামন্ততান্ত্রিক যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য সতীদাহ প্রথাও পাল-ভীমামলের শেষ দিকে এবং সেন আমলে প্রসার লাভ করিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। বৃহদ্ধৰ্মপুরাণ গ্রন্থে (২।৮।৩-১০) মৃত স্বামীর সঙ্গে পুড়িয়া মরিবার জন্য সমাজ-নায়কেরা দ্বিজ নারীদের পুণ্যলোভে প্রলুব্ধ করিয়াছেন। ইহার চেয়ে বীরত্ব নাকি তঁহাদের আর কিছু নাই; সহমরণে গেলে নাকি এক পূর্ণ মন্বন্তর স্বামীসঙ্গসুখ ভোগ করা যায়; বাঙলাদেশ একাদশ-দ্বাদশ শতকেই সামন্ততন্ত্রের সব ক’টি লক্ষণ ফুটাইয়া তুলিয়াছিল, সন্দেহ নাই।
