সামাজিক ইঙ্গিত
বাঙলার ইতিহাসে পালবংশের আধিপত্যের চারিশত বৎসর নানাদিক হইতে গভীর ও ব্যাপক অর্থ বহন করে। বর্তমান বাঙলাদেশ ও বাঙালী জাতির গোড়াপত্তন হইয়াছে এই যুগে; এই যুগই প্রথম বৃহত্তর সামাজিক সমীকরণ ও সমন্বয়ের যুগ। এই চারিশত বৎসরের সামাজিক ইঙ্গিীতগুলি কতকটা বিস্তৃতভাবেই নানা অধ্যায়ে বিভিন্ন দিক হইতে ধরিতে চেষ্টা করিয়াছি। এখানে রাষ্ট্রের ও রাজবৃত্তের দিক হইতে ইঙ্গিীতগুলি ব্যাখ্যার সংক্ষিপ্ত একটু চেষ্টা করা যাইতে পারে।
রাষ্ট্রীয় আদর্শ
খ্ৰীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক হইতে আরম্ভ করিয়া প্রায় খ্ৰীষ্টপরবর্তী ষষ্ঠ-সপ্তম শতক পর্যন্ত ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় আদর্শ সর্বভারতীয় একরাটত্ব, সমস্ত ভারতের একচ্ছত্ৰাধিপত্য; মাঝে মাঝে এই আদর্শ হইতে বিচূতি ঘটিয়াছে, সন্দেহ নাই, কিন্তু যখন তাহা হইয়াছে, তখনই ভারতবর্ষকে রাষ্ট্ৰক্ষেত্রে বিদেশীর নিকট অনেক লাঞ্ছনা ও অপমান সহ্য করিতে হইয়াছে এবং প্রচুর মূল্য দিয়া আবার সেই পুরাতন আদর্শকেই মানিয়া লইতে হইয়াছে। মৌর্য ও গুপ্তরাজবংশ এই আদর্শের প্রতীক। সপ্তম শতকেও এই আদর্শ সক্রয়, কিন্তু তখন সীমা সংকীর্ণতর হইয়া গিয়াছে সর্বভারত হইতে সকল-উত্তরাপথে সেই আদর্শ নামিয়া আসিয়াছে; ‘সকলোত্তরপথনাথ হওয়াই এই যুগের সর্বোচ্চ রাষ্ট্ৰীয় স্বীকৃতি। অষ্টম শতকেও এই আদর্শকে কেন্দ্ৰ করিয়াই প্ৰতীহার ও পালবংশের সংগ্রাম অক্ষুন্ন এবং তাঁহাকে ব্যর্থ করিবার চেষ্টায় দক্ষিণের রাষ্ট্রকূটবংশ সদা জাগ্রত। অন্যদিকে ধীরে ধীরে অন্য একটি রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ গড়িয়া উঠিতেছিল; এই আদর্শের অস্তিত্ব যে ছিল না তাহা নয়, তবে সৰ্ব্বভারতীয় আদর্শের মতন এতটা সক্রয় কখনো ছিল না। এই আদর্শ স্থানীয় ও প্রাদেশিক আত্মকর্তৃত্বের আদর্শ। গুপ্ত-সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ক্রমশ এই আদর্শ মাথা তুলিতে আরম্ভ করে; কিন্তু ধর্মপাল-দেবপাল, বৎসরাজ-নাগভটের সময়েও উত্তরাপথস্বামীত্বের আদর্শ একেবারে বিলুপ্ত হয় নাই। কিন্তু তাহার পর হইতেই স্থানীয় ও প্রাদেশিক আত্মকর্তৃত্বের আদর্শের জয়জয়কার। এই সময় হইতেই যেন ভারতবর্যের বিভিন্ন দেশখণ্ডের অর্থ-সংস্থান, ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্ৰ করিয়া এক একটি রাষ্ট্র গড়িয়া উঠে এবং এই রাষ্ট্রগুলি নিজেদের প্রাদেশিক আত্মিকর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারে সচেষ্ট হইয়া উঠে। সংস্কৃত্তির ক্ষেত্রেও দেখা যায়, মোটামুটি অষ্টম শতক বা তাহার কিছু পর হইতে এক একটি বৃহত্তর জনপদ রাষ্ট্রকে কেন্দ্ৰ করিয়া মূলগত এক কিন্তু এক একটি বিশিষ্ট লিপি বা অক্ষর রীতি, ভাষা এবং শিল্পদর্শ গড়িয়া উঠিতে আরম্ভ করিয়াছে এবং দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে তাহদের এক একটি প্রাদেশিক বৈশিষ্ট্য দাঁড়াইয়া গিয়াছে। বস্তুত, ভারতবর্ষের, বিশেষত উত্তর-ভারতের, মহারাষ্ট্র ও উড়িষ্যার প্রত্যেকটি প্রাদেশিক লিপি ও ভাষার ভ্রণ ও জন্মাবস্থা মোটামুটি এই চারিশত বৎসরের মধ্যে। বাঙলা লিপি ও ভাষার গোড়া খুঁজিতে হইলে এই চারিশত বৎসরের মধ্যেই খুজিতে হইবে। বাঙলার ভৌগোলিক সত্ত্বও এই যুগেই গড়িয়া উঠিয়াছে। ভারতের অন্যান্য লিপি, ভাষা ও প্রাদেশিক ভৌগোলিক সত্ত্বা সম্বন্ধেও একই উক্তি প্রযোজ্য।
জাতীয় স্বাতন্ত্র্য
এই লিপি, ভাষা, ভৌগোলিক সত্ত্বা ও রাষ্ট্রীয় আদর্শকে আশ্রয় করিয়া এক একটি স্থানীয় সত্ত্বও গড়িয়া উঠে এই যুগেই। বঙ্গ-বিহারে এই রাষ্ট্ৰীয় সত্ত্বার সূচনা সপ্তম শতকেই দেখা দিয়াছিল এবং তাহার প্রতীক ছিলেন শশাঙ্ক। কিন্তু পরবর্তী একশত বৎসরের মৎস্যন্যায়ে এই রাষ্ট্রীয় সত্ত্বাই আহত হইয়াছিল। সকলের চেয়ে বেশি। পাল-রাজারা আবার তাহা জাগাইয়া তুলিলেন; বাঙালী নিজস্ব স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র লাভ করিল এবং চারিশত বৎসর ধরিয়া তাহা ভোগ করিল। শুধু তাহাই নয়, ধর্মপাল-দেবপাল-মহীপালের সাম্রাজ্য বিস্তারের কৃপায় এই রাষ্ট্র একটা আন্তর্ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সত্তার স্বাদও কিছুদিনের জন্য পাইয়াছিল। অধিকন্তু, এই পালরাজাদের এবং পালরাষ্ট্রের পোষকতা ও আনুকূলো, নালন্দা-বিক্রমশীলা-ওদন্তপুরী-সারনাথের বৌদ্ধ সংঘ ও মহাবিহারগুলিকে আশ্রয় করিয়া আন্তর্জাতিক বৌদ্ধজগতেও বাঙলাদেশ ও বাঙালীর রাষ্ট্র একটি গৌরবময় স্থান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। এই সকলের সম্মিলিত ফলে বাঙলায় এই যুগেই, অর্থাৎ এই প্রায় চারিশত বৎসর ধরিয়া একটা সামগ্রিক ঐক্যবোধ গড়িয়া ওঠে। ইহাই বাঙালীর স্বদেশ ও স্বজাতবোধের মূলে এবং ইহাই বাঙালীর একজাতীয়ত্বের ভিত্তি। পাল-যুগের ইহাই সর্বশ্রেষ্ঠ দান।
সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সমন্বয়
এই দানের মূলে পালরাজাদের কৃতিত্ব স্বীকার করিতেই হয়। পালরাজারা ছিলেন বাঙালী, বরেন্দ্রী তাঁহাদের পিতৃভূমি। বংশ-প্রতিষ্ঠায়ও ইহারা পুরাপুরি বাঙালী; পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্য-সমাজের বংশাভিজাত্যের দাবি ইহাদের নাই। রামচরিতে ক্ষত্ৰিয়ত্বের দাবি করা হইয়াছে কিংবা ক্ষত্রিয় রাজবংশের সঙ্গে তাঁহাদের বিবাহাদি হইত, এজন্য তঁহাদের ক্ষত্ৰিয় মনে করা কঠিন। রাজা মাত্ৰেই তো ক্ষত্রিয়, বিশেষত পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্য সংস্কৃতি প্রবর্তনের পর। আর, রাজরাজড়ার বৈবাহিক সম্বন্ধ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তো রাষ্ট্রীয় কারণেই হইয়া থাকে; তাহদের তো কোনও বর্ণ নাই! আবুল ফজল যে ইহাদের কায়স্থ বলিতেছেন তাহার মূলেও কোনও বস্তুভিত্তি আছে কিনা সন্দেহ; তবে তাহারা উচ্চতর তিন বর্ণের কেহ নহেন। এই সংস্কার লোকস্মৃতিতে ষোড়শ শতকেও বিদ্যমান ছিল বলিয়া মনে হয়। তারনাথ এবং মঞ্জশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকারই বোধ হয় যথার্থ ঐতিহাসিক ইঙ্গিতটি রাখিয়াছেন। তারনাথ বলিতেছেন, জনৈক বৃক্ষদেবতার ঔরসে ক্ষত্ৰিয়াণীর গর্ভে গোপালের জন্ম। কাহিনীটি টটেম-স্মৃতি জড়িত বলিয়া সন্দেহ করিলে অনায় বা অনৈতিহাসিক কিছু করা হয় না। পৌরাণিক-ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতি-বহির্ভূত, আর্যসমাজ-বহির্ভূত সমাজের সংস্কার এই গল্পের মধ্যে বিদ্যমান। গোপাল এই সমাজ, সংস্কার ও সংস্কৃতির লোক। বোধ হয় এই জন্যই মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকার পালরাজাদের বলিয়াছেন “দাসজীবিনঃ”। অথচ এই পালরাজারা ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম, স্মৃতি, সংস্কার ও সংস্কৃতির ধারক ও পোষক, চার্তৃবর্ণের রক্ষক ও সংস্থাপক; লিপিগুলিতে তাহার প্রমাণ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। ধর্মে ইহারা বৌদ্ধ, পরম সুগত; ইহারা মহাযানী বৌদ্ধসংঘ ও সম্প্রদায়ের পরম অনুরাগী পোষক; অথচ বৈদিক ও পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যধৰ্মও ইহাদের আনুকূল্য ও পোষকতা লাভ করিয়াছে। শুধু তাঁহাই নয়, একাধিক পালরাজা ব্ৰাহ্মণ্যধর্মের পূজা এবং যাগযজ্ঞে নিজেরা অংশ গ্রহণ করিয়াছেন, পুরোহিত্য-সিঞ্চিত শান্তিবারি নিজেদের মস্তকে ধারণ করিয়াছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মে ব্ৰাহ্মণের নিয়োজিত হইতেন, মন্ত্রী এবং সেনাপতিও হইতেন, আবার কৈবর্তরাও স্থান পাইতেন না, এমন নয়। এই ভাবে পালবংশকেও কেন্দ্র ও আশ্রয় করিয়া বাঙলাদেশে প্রথম সামাজিক সমন্বয় সম্ভব। হইয়াছিল; একদিনে নয়, চারিশত বৎসর ধরিয়াই তাহা চলিয়াছিল। ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণেতার স্মৃতি ও আচার, আর্য ও আর্যেতর সংস্কার ও সংস্কৃতি, বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য পুরাণ, পূজা, শিক্ষা ও আদর্শ, দেবদেবী সমস্তই পালবংশকে কেন্দ্র ও আশ্ৰয় করিয়া পরস্পরে আদান-প্ৰদান করিয়াছে এবং এক মিলন সমন্বয় সূত্রে গ্রথিত হইয়া একটি বৃহৎ সামাজিক সমন্বয় গড়িয়া তুলিয়াছে। গুপ্ত—আমল হইতে আরম্ভ করিয়া আর্য জৈন ও বৌদ্ধধর্মের উপর যে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির স্রোত বাঙলার বুকের উপর দ্রুত প্রবাহিত হইতেছিল, এবং মোটামুটি সপ্তম শতকে যে সাংস্কৃতিক সংঘর্যের সৃষ্টি করিয়াছিল—শশাঙ্ক তো ইহারই প্রতীক—সেই স্রোত ও সংঘর্ষ সমন্বিত হইল। এই চারিশত বৎসর ধরিয়া পাল-রাজাদের বৃহৎ ছত্ৰছায়ায়। এই আর্য সংস্কার ও সংস্কৃতির বাহিরে যে বৃহৎ আর্যোিতর সংস্কার ও সংস্কৃতি দেশের অধিকাংশ জুড়িয়া বিরাজ করিতেছিল তাহাও অন্তত কিছুটা যে পাল-রাজচ্ছত্রের আশ্রয় লাভ করিয়াছিল, তাহার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় পাহাড়পুরের অসংখ্যা পোড়ামাটির ফলকগুলিতে এবং সমসাময়িক ধর্মমত ও সম্প্রদায়গুলিতে। বৌদ্ধ এবং ব্রাহ্মণ্য উভয় ধর্মেই এই সময়ই আযেতির দেবদেবী, আচার ও সংস্কার ধীরে ধীরে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করিতে থাকে এবং কিছু কিছু স্বীকৃতিও লাভ করে। এই যুগের দেবদেবীর মূর্তিতত্ত্ব তাহার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণ এবং এ-প্রমাণ অনস্বীকার্য। এই সুবৃহৎ সমন্বয় অবশ্যই সংগঠিত হইয়াছিল আর্য ব্রাহ্মণ্য স্মৃতি ও সংস্কৃতির আদর্শনুযায়ী; পলি-রাজারাও তাঁহা স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। ভূমি-ব্যবস্থা, উত্তরাধিকার, চাতুৰ্ব্বণের স্বীকৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা, সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের স্বীকৃতি এবং প্রচলন শুধু নয়, সেই ভাষায় কাব্যময় সাহিত্য রচনা এই সমস্তই সেই আদর্শের নিঃসন্দিগ্ধ পরিচয় বহন করে। এই আর্য বৌদ্ধ এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আশ্রয় করিয়াই বাঙলাদেশ উত্তরোত্তর উত্তর ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান ধারার সঙ্গে আত্মীয়তায় যুক্ত হয়। এই সচেতন যোগ সাধন আরম্ভ হইয়াছিল গুপ্ত—আমলেই, কিন্তু পর্ণরূপ গ্ৰহণ করিল পাল-আমলে; এবং বাঙলাদেশে তাহা এক বৃহত্তর সমন্বয়ের আশ্রয় হইল, আর্যেতর এবং মহাযান-বজ্রযান-তন্ত্রযান-বৌদ্ধধর্মের সংস্কার ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তায় যুক্ত হইয়া এই সমন্বিত এবং সমীকৃত সংস্কৃতিই বাঙালীর সংস্কৃতির ভিত্তি, এবং ইহাও পাল-আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠদান। সমন্বয় এবং সমীকরণের এই রূপ ও প্রকৃতি ভারতের অনাত্র আর কোথাও দেখা যায় না।
