বঙ্গে বর্মণাধিপত্য ৷ আঃ-১০৫০
সুদীর্ঘ চারিশত বৎসর পরে এই বিষাদান্ত পরিণতির কথা বলিবার আগে বঙ্গের বর্মণ-বংশের কথা একটু বলিয়া লইতে হয়। ইহাদের কথা আগেও একাধিক প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে। যাদববংশীয় এই বর্মণ রাজারা কলিঙ্গ দেশের সিংহপুর নামক স্থান হইতে একাদশ শতকের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় পদে কোনও সময় পূর্ববঙ্গে আসিয়া আধিপত্য স্থাপন করেন। বজবর্মপুত্র জাতবর্মী এই বংশের প্রথম রাজা। জাতবর্ম কলচুরীরাজ কর্ণের কন্যা বীরত্রীকে বিবাহ করেন, এবং অঙ্গ, কামরূপ এবং বরেন্দ্রী-নায়ক দিব্যকে পরাজিত করেন বলিয়া দাবি করিয়াছেন। অঙ্গ এই সময় বোধ হয়। রামপালের অধীন ছিল এবং দিব্য নিশ্চয়ই বরেন্দ্রীর কৈবর্ত-নায়ক। দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যুর পর পাল-রাজ্যে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়াছিল, জাতবর্ম তাহার পূর্ণ সুযোগ লাইতে বোধ হয় দ্বিধা বোধ করেন নাই। জাতবর্মর পশ্চাতে কলচুরীরাজ গাঙ্গেয়দেব এবং কর্ণের সহায়তা ছিল, এ-সন্দেহ অমূলক নয়। জাতবর্মর পর পুত্র মহারাজাধিরাজ হরিবর্মী রাজা হন; বিক্রমপুরে ছিল তাহার রাজধানী এবং তাহার সান্ধিবিগ্রহিক মন্ত্রী ছিলেন ভট্ট ভূবদেব। এই হরিবর্ম রামচরিত্যেক্ত ভীমবন্ধু হরি এবং রামপাল শরণাগত বৰ্মণরাজ এক এবং অভিন্ন বলিয়া কেহ কেহ মনে করেন। এই অনুমান যুক্তিসঙ্গত বলিয়া মনে না করিবার আপাতত কোনও কারণ নাই। হরিবর্মর পর ভ্রাতা শ্যামলবৰ্মা বঙ্গের রাজা হন; তাহার রাষ্ট্রীয় কোনও কীর্তিই জানা নাই, তবে তিনি বাঙলার বৈদিক ব্ৰাহ্মণদের লোকস্মৃতিতে আজও বঁচিয়া আছেন। কুলজী-গ্রন্থের মতে শ্যামলবৰ্মার আমলেই বাঙলায় বৈদিক ব্রাহ্মণদের আগমন। তঁহার পুত্র ভোজ্যবর্ম এই বংশের শেষ রাজা; ইহারও রাষ্ট্ৰকেন্দ্র ছিল বিক্রমপুর, কিন্তু তিনি পুণ্ড্রবর্ধনভূক্তির অন্তৰ্গত কৌশাম্বী-অষ্টগচ্ছ-খণ্ডলে কিছু ভূমি দান করিয়াছিলেন দেখিয়া মনে হয়, পুণ্ড্রবর্ধনের রাজশাহী-বগুড়া অঞ্চলেও ভোজবর্মার আধিপত্য এক সময় বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল। তাহার রাজত্বকালে অথবা তাহার অব্যবহিত পরেই পূর্ববঙ্গের বর্মণরাজ্য সেন-রাজবংশের করতলগত হয়।
পালায়নের পরিনির্বাণ ॥ আঃ ১১২০-১১৬২
রামপালের চারিপুত্রের মধ্যে দুই পুত্র, বিওপাল ও রাজ্যপালের সিংহাসন আরোহণের সৌভাগ্যলাভ ঘটে নাই। অন্য দুই পুত্র, কুমারপাল ও মদনপালের মধ্যে কুমারপাল (আঃ ১১২৬-২৮) রাজা হন; তাহার পর কুমারপাল-পুত্র তৃতীয় গোপাল (আঃ ১১২৮-৪৩) এবং গোপালের পর রামপালের অন্যতম পুত্র মদনপাল (আঃ ১১৪৩-৬১) রাজা হইয়াছিলেন। রামচরিত-কাব্যপাঠে মনে হয়, সিংহাসনারোহণের এই ক্ৰম সম্বন্ধে একটা রহস্য কোথাও ছিল। রামচরিত রামপালকে লইয়াই রচনা, কিন্তু বস্তুত মদনপালের রাজত্ব পর্যন্ত কাব্যটি বিস্তারিত, অথচ রামপালের পর কুমারপাল এবং গোপাল সম্বন্ধে এই কাব্যে প্রায় কিছু বলা হয় নাই বলিলেই চলে। মদনপালে পৌঁছিয়া সন্ধ্যাকরা যেন স্বপ্তির নিঃশ্বাস ছাড়িয়া বাচিয়াছেন। কোনও বংশগত বা পারিবারিক গোলমালের কল্পনা একেবারে অলীক না-ও হইতে পারে!
যাহা হউক, এই তিন জনের রাজত্বকালেই চারিশত বৎসরের সযত্নলালিত, বাঙালীর গৌরব পাল-রাজ্য ও রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়া গেল। ধর্মপাল-দেবপাল যে-সাম্রাজ্য গড়িয়া তুলিয়াছিলেন, মহীপাল যাহাকে ধ্বংসের মুখ হইতে বাঁচাইয়া ছিলেন, রামপাল যাহাকে শেষবারের জন্য আত্মপ্রতায় এবং প্রতিষ্ঠা ফিরাইয়া দিয়াছিলেন, কেহ আর তাহাকে রক্ষা করিতে পারিলেন না। ঘরে এবং বাহিরে স্থানীয় আত্মসচেতন, একান্ত ব্যক্তিক রাষ্ট্রবুদ্ধি উৎকট হইয়া দেখা দিল; ইহাকে ব্যাহত করিবার মতন শক্তি ও বুদ্ধি লইয়া কোনও মহীপাল বা রামপাল আর সিংহাসন আরোহণ করিলেন না!
কুমারপালের নিজের প্রিয় সেনাপতি বৈদ্যদেব কামরূপে এক বিদ্রোহ দমন করিয়া নিজেই এক স্বতন্ত্র স্বাধীন নরপতিরূপে আত্মপ্রতিষ্ঠা করিয়া লইলেন। পূর্ববঙ্গে ভোজ্যবর্মার নেতৃত্বে বর্মণরা স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হইল। দক্ষিণ হইতে কলিঙ্গের গঙ্গবংশীয় রাজারা আরম্য (= বর্তমান আরামবাগ) দুর্গ জয় করিয়া মেদিনীপুরের (মিধুনীপুর) ভিতর দিয়া গঙ্গাতীর পর্যন্ত ঠেলিয়া চলিয়া আসিলেন। কুমারপালের রাজত্বকালে সেনাপতি বৈদ্যদেব বোধ হয় সাফল্যের সঙ্গে এই আক্রমাণ কতকটা ব্যাহত করিয়াছিলেন এবং মদনপালও বোধ হয় একবার কলিঙ্গ পর্যন্ত বিজয়াভিযান করিয়া থাকিবেন। কিন্তু, কিছু দিনের মধ্যেই পাল ও গঙ্গদের সংগ্রামের এবং দক্ষিণের কল্যাণ-চালুক্যদের আক্রমণের সুযোগ লইয়া দক্ষিণ-পশ্চিমবঙ্গে কর্ণাটাগত সেন-রাজবংশ মস্তক উত্তোলন করিল। এই সেন-রাজবংশ ইতিপূর্বেই পূর্ববঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিল! এইবার তাহারা একেবারে গৌড়ের হৃদয়দেশ আক্রমণ করিল। কালিন্দী-নদীর তীরে, বোধ হয় মদনপালের রাজধানীর নিকটেই, এক তুমুল যুদ্ধ হইল। এই যুদ্ধের ফলাফল অনিশ্চিত, কারণ রামচরিতে যেমন মদনপালের জয় দাবি করা হইয়াছে, তেমনই দেওপাড়া-লিপিতে সেন-রাজ বিজয়সেনের পক্ষ হইতেও জয়ের দাবি জানানো হইয়াছে। অন্যদিকে দুর্বলতার সুযোগ লইয়া গাহড়িকাল-রাজারাও এই সময় বাঙলাদেশে আবার নূতন করিয়া সমারাভিযানে উদ্যত হইলেন। ১১২৪ খ্ৰীষ্টাব্দের আগেই পাটনা অঞ্চল তাহদের অধিকারে চলিয়া গেল; ১১৪৬ খ্ৰীষ্টাব্দের আগে গেল মুদগগিরি বা মুঙ্গের অঞ্চল। মদনপালের রাজত্বের অষ্টম বৎসর পর্যন্ত বরেন্দ্রীর অন্তত কিয়দংশ তাহার অধিকারে ছিল বলিয়া লিপি-প্রমাণ বিদ্যমান। এইটুকু ছাড়া বাঙলাদেশের আর কোনও অংশই তাহার অধিকারে ছিল বলিয়া মনে হয় না; তবে বিহারের মধ্যে ও পূর্বাঞ্চল তখনও পাল-রাজ্যভুক্ত ছিল। মদনপালের মৃত্যুর পর দশ বৎসরের মধ্যে তাহাও আর রহিল না এবং পাল-রাজ্যের শেষচিহ্নও বিলুপ্ত হইয়া গেল। মদনপালই পালবংশের শেষ রাজা। তবে, তাহার পরও গোবিন্দচন্দ্র (আঃ ১১৫৫—১১৬২) নামে একজন পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ গৌড়েশ্বরের নামে পাওয়া যায় { লিপি-প্ৰমাণ হইতে মনে হয়, গয়া জেলাই ছিল তাহার রাজ্যকেন্দ্ৰ; গৌড়রাজ্যের কিয়দংশও হয়তো এক সময় তাহার রাজ্যের অন্তর্গত ছিল।
