স্পষ্টই দেখা যাইতেছে, পদুবন্ধা যদি পাবনাও হয়, তাহা হইলে পদুবন্ধ এবং কৌশাম্বী ছাড়া আর সমস্ত সামান্তরাই দক্ষিণ-বিহার ও দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের। বুঝিতে পারা যায়, অঙ্গ বা উত্তর-বিহার এবং উত্তর-পশ্চিম বঙ্গ ছাড়া রামপালের রাজত্বের বিস্তার আর কোথাও ছিল না। কৌশাম্বীর দ্বোরপবর্ধনকে এই তালিকায় দেখিয়া মনে হইতেছে, খাস বরেন্দ্রীতেও রামপাল ২।। ১ জন সহায়ক সংগ্ৰহ করিয়াছিলেন।
ক্ষৌণী-নায়ক ভীম
এই সম্মিলিত শক্তিপুঞ্জের সঙ্গে ক্ষৌণী-নায়ক ভীমের পক্ষে আঁটিয়া ওঠা সম্ভব ছিল না। রামচরিতে রামপাল কর্তৃক বরেন্দ্রীর উদ্ধার-যুদ্ধের বিস্তৃত বিবরণ আছে। এইখানে এইটুকু বুলিলেই যথেষ্ট যে, গঙ্গার উত্তর-তীরে দুই সৈন্যদলে তুমুল যুদ্ধ হয় এবং ভীম জীবিতাবস্থায় বন্দী হন। ভীমের অগণিত ধনরত্নপূর্ণ রাজকোষ রামপালের সেনাদল কর্তৃক লুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ভীম বন্দী হওয়ার অব্যবহিত পরেই ভীমের অন্যতম সুহৃদ ও সহায়ক হরি পরাজিত ও পযুদস্ত কৈবর্তী সৈন্যদের একত্র করিয়া আবার যুদ্ধে রামপালের পুত্রের সম্মুখীন হন, কিন্তু অজস্র অর্থদানে কৈবর্তসেনা ও হরিকে বশীভূত করা হয়। ভীম সপরিবারের রামপালহস্তে নিহত হন। ঘরেন্দ্রী এবং কৈবর্ত-রাজকোষ রামপালের করায়ত্ত হইল, কারভার-পীড়িত বরেন্দ্রীতে সুখ ও শান্তি ফিরিয়া আসিল। রামাবতী নগরে বরেন্দ্রী রাষ্ট্রকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হইল।
বরেন্দ্রী উদ্ধারের পর রামপাল হৃতরাজ্যের অন্যান্য অংশ উদ্ধারে যত্নবান হইলেন। (পূর্ব)-বঙ্গের এক বৰ্মণরাজ, বোধ হয়। হরিবর্মা, নিজ স্বার্থে রামপালের আনুগত্য স্বীকার করিলেন। রামপালের এক সামন্ত কামরূপ জয় করিয়া রামপালের প্ৰিয়পাত্ৰ – হইলেন। রাঢ়দেশের সামন্তদের সহায়তায় উড়িষ্যারও অস্তুত কিয়দংশ জয় তাহার পক্ষে সম্ভব হইল; অবশ্য তাহা করিতে গিয়া কলিঙ্গের চোড়গঙ্গা-রাজদের সঙ্গে, অন্তত পরোক্ষে, কিছু সংঘর্ষে তাহাকে আসিতে হইয়াছিল। বোধ হয় উৎকলে-কিলিঙ্গে রাজ্যবিস্তারের চেষ্টা করিতে গিয়াই রামপালকে চোলরাজ কুলোত্তঙ্গের (আঃ ১০৭০-১১১৮) আক্রমণের সম্মুখীন হইতে হয়; বঙ্গ-বঙ্গাল এবং মগধ, কুলোত্তঙ্গকে কর প্রদান করিত এবং কুলোত্তঙ্গ গঙ্গা হইতে কাবেরী পর্যন্ত সমস্ত ভূভাগের অধিকারী হইয়াছিলেন বলিয়া অস্তুত একটা দাবি কুলোত্তঙ্গের পক্ষ হইতে করা হইয়াছে। এই দাবি কতটুকু ঐতিহাসিক, বলা কঠিন।
কর্ণাটাভু্যদয়
এই সময় কর্ণাটের লুব্ধদৃষ্টি বরেন্দ্রীর উপর পতিত হয়। বাঙলাদেশে কর্ণাটাক্রমণের কথা তো আগেই বলা হইয়াছে। কিন্তু রামচরিতে বরেন্দ্রীর বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে “অধরিত-কর্ণাটক্ষণ-লীলা”। এই কর্ণাটীরা কি সেই সুদূর দক্ষিণের কর্ণাটবাসী? বোধ হয় তাহা নয়। ইহারা সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ ও মিথিলার দুই কর্ণািট রাজবংশ। কর্ণাটাগত এক সেনা-বংশ ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে এবং আর এক সেনা-বংশ মিথিলায় নিজেদের বংশের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। আপাতত, মিথিলার সেনা-বংশীয় রাজা নান্যদেবের (আঃ ১০৯৭) সঙ্গে রামপালের সংঘর্ষ উপস্থিত হইল। নান্যদেব বঙ্গ এবং গৌড়ের পরাক্রম খর্ব করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করিয়াছেন; সমসাময়িক গৌড়রাজ রামপাল বলিয়াই মনে হয় এবং বঙ্গরাজ হইতেছেন বিজয়সেন। বিজয়সেনও অবশ্য ন্যান্যদেবকে পরাজয়ের দাবি করিয়াছেন। যাহা হউক, মিথিলা (উত্তর-বিহার) যে রামপালের কারচু্যত হইয়াছিল এ-সম্বন্ধে সন্দেহের কারণ मांश्।
কাশী-কানাকুন্তুজাধিপতি পরাক্রান্ত গাহড়বাল রাজাদের সঙ্গেও রামপালকে যুঝিতে হইয়াছিল। বলিয়া মনে হয় ৷ গাহড়বাল বংশীয় গোবিন্দচন্দ্রের পুত্র মদনপালের সঙ্গে গৌড়-সৈন্যের সংগ্রামের ইঙ্গিত গহড়বাল-লিপিতে পাওয়া যায়; কিন্তু মদনপাল নিশ্চিত জয়লাভ করিয়াছিলেন, এমন বলা যায় না। বরং রামচরিতে এমন ইঙ্গিত আছে যে, বরেন্দ্রী মাধ্যদেশের বিক্রম সংযত করিয়া রাখিয়াছিলেন।
রামপাল বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত রাজত্ব করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। তিনি কৃতী পুরুষ ছিলেন, সন্দেহ নাই। নির্বাসনে জীবন আরম্ভ করিয়া বিদ্রোহীদের হাত হইতে পিতৃভূমি বরেন্দ্রী উদ্ধার, অধিকাংশ বাঙলার, পুনরুদ্ধার, উড়িষ্যা ও কামরূপে আধিপত্য বিস্তার এবং একাধিক ঘহিঃশত্রু কর্তৃক আক্রান্ত হইয়াও পালরাজ্য ও রাষ্ট্রের সীমা এবং আধিপত্য মৃত্যু পর্যন্ত অক্ষুঃ রাখা, এক জীবনের পক্ষে এত কর্মকীর্তি তাহার রাষ্ট্রবুদ্ধি, দৃঢ়চিরিত্র এবং অদম্য শৌর্যবীর্যের পরিচায়ক, স্বীকার করিতেই হয়।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় আদর্শ বা সামাজিক ব্যবস্থার সময়োপযোগী পরিবর্তন না হইলে শুধু কোনও রাজা বা সম্রাটের ব্যক্তিগত চরিত্রের গুণ রাজ্য বা রাষ্ট্রকে পরিণাম-বিনষ্টির হাত হইতে বাঁচাইতে পারে না। মহীপালের মতন সম্রাট পারেন নাই, রামপালও পাব্রিলেন না। বিনষ্টিকে তাহারা তঁহাদের শৌর্যে বীর্যে পরাক্রমে কুটবুদ্ধিতে দূরে ঠেলিয়া সরাইয়া দিয়াছেন সন্দেহ নাই; কিন্তু যে বিচ্ছিন্ন স্থানীয় সংকীর্ণ আত্মসচেতনতা ভারতীয় রাষ্ট্রবৃদ্ধিকে এই যুগে আচ্ছন্ন করিয়া দিয়াছিল, মহীপাল বা রামপাল কেহই তাহা দূর করিতে পারেন নাই। এই অনুরাষ্ট্ৰীয় আদর্শের এতটুকু পরিবর্তন এই সময়ে ভারতবর্ষের কোথাও হয় নাই। বস্তুত, ভারতবর্ষের কোনও রাজা বা রাজবংশই এই যুগে সেদিকে সচেষ্ট হন নাই! বরং একে অন্যের দুর্বলতার সুযোগ লইয়া নিজেদের রাজ্যসীমা বাড়াইবার চেষ্টাই কেবল করিয়াছেন; অথচ, অন্যদিকে তখন বৈদেশিক আধিপত্যের ঘন কৃষ্ণমেঘ ভারতের রাষ্ট্ৰীয় আকাশ ক্রমশ ঢাকিয়া ফেলিতেছিল; মুসলমান অধিকারের সীমা ক্রমশ পূর্বদিকে বিস্তৃত হইতেছিল। রামপাল যখন মাতুল মথনের মৃত্যুশোক সহ্য করিতে না পারিয়া পরিণত বার্ধক্যে গঙ্গায় আত্মবিসর্জন করেন তখন হয়তো তিনি সার্থক জীবনের পরম পরিতৃপ্তি লইয়াই ইকুলোক ত্যাগ করিয়াছিলেন। কিন্তু যে স্থানীয় সংকীর্ণ আত্মসচেতনতা মহীপালের চেষ্টাকে সার্থক হইতে দেয় নাই, তাহাঁই রামপালের চেষ্টাকেও পরিণামে ব্যর্থ করিয়া দিল। ইহার সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ তো ছিলই।
