তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্র : দ্বিতীয় মহীপাল (আঃ ১০৭০-১০৭১), দ্বিতীয় শূরপাল (আঃ ১০৭১-৭২ ) এবং রামপাল (আঃ ১০৭২-১১২৬) ৷ মহীপাল যখন রাজা হইলেন তখন ঘরে-বাহিরে অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। নিজ পরিবারের মধ্যে নানা চক্রান্ত, সামন্তরা বিদ্রোহোন্মুখ।। ভ্রাতা রামপাল পারিবারিক চক্রান্তের মূল ভাবিয়া মহীপাল শুরপাল ও রামপাল দুই ভ্রাতাকেই কারারুদ্ধ করিলেন। কিন্তু এখানেই বিপদের শান্তি হইল না। বিদ্রোহী সামন্তদের দমনে তিনি কৃতসংকল্প হইলেন, অথচ তাহার সৈন্যদল এবং যুদ্ধোপকরণ যথেষ্ট ছিল বলিয়া মনে হয় না। মন্ত্রীবর্গের সুপরামর্শেও তিনি কৰ্ণপাত করলেন না। বরেন্দ্রীর কৈবর্ত-সামন্তদেরবিদ্রোহ দমন করিতে গিয়া তিনি যুদ্ধে পযুদস্ত এবং নিহত হইলেন; কৈবর্ত-নায়ক দিব্য (দিকেবোক, দিবোক) বরেন্দ্রীর অধিকার লাভ করিলেন।
কৈবর্ত-বিদ্রোহ; বরেন্দ্রীতে কৈবর্তাধিপত্য । আঃ ১০৭৫-১১০০
সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত-কাব্যে এ-বিদ্রোহ, মহীপাল হত্যার বিবরণ এবং রামপাল কর্তৃক বরেন্দ্রীর পুনরুদ্ধার ইত্যাদির সুবিস্তৃত ইতিহাস কাব্যকৃত করা হইয়াছে। সন্ধ্যাকর রামপালপুত্র মদনপালের অনুগ্রহভাজন; মহীপালের উপর তিনি যে খুব শ্রদ্ধিত ছিলেন, মনে হয় না। তিনি মহীপালকে নিষ্ঠুর এবং দুনীতিপরায়ণ বলিয়া কটুক্তিও করিয়াছেন। মহীপাল লোকশ্রুতিতে বিশ্বাস করিয়া জনপ্রিয় রামপালকে চক্ৰান্তকারী বলিয়া মনে করিয়াছিলেন, অথচ রামপাল যথার্থতি তাহা ছিলেন না। তাহা ছাড়া তিনি যুদ্ধকামী হইয়া মন্ত্রীবর্গের আদেশ অমান্য করিয়া, অনন্ত-সামন্তচক্রের বিরুদ্ধে অপরিমিত সেনাদল লইয়া বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হইয়াছিলেন, এসব সংবাদ সন্ধ্যাকরুই দিতেছেন; মহীপালের প্রকৃতি, চরিত্র এবং রাষ্ট্রবুদ্ধি সম্বন্ধে সন্ধ্যাকরের সাক্ষ্য কতখানি প্রামাণিক বলা কঠিন। অন্য কোনও সাক্ষ্য উপস্থিতও নাই। এই অবস্থায় মহীপালের ভালোমন্দ বা কর্তব্যাকর্তব্য বিচারের দোষগুণ কিছুই চলিতে পারে না। তবে, তিনি যে যে দুর্বল এবং রাষ্ট্রবুদ্ধিবিহীন ছিলেন, এ-সম্বন্ধে বোধ হয় সংশয় নাই। ঘটনাচক্রের পরিণতিই তাহার প্রমাণ।
দিব্য ৷ আঃ ১০৭১-৮০ ৷৷
দিব্য সম্বন্ধেও সন্ধ্যাকরের সাক্ষ্য কতটুকু গ্রাহ্য, বলা কঠিন। পালরাজাদের পারিবারিক শত্রুর প্রতি সন্ধ্যাকর সুবিচার করিতে পারিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না। রামচরিত পাঠে মনে হয়, দিব্য ছিলেন একজন নায়ক, পালরাষ্ট্রেরই একজন নায়ক-কর্মচারী। কী কারণে তিনি বিদ্রোহপরায়ণ হইয়াছিলেন, আর কোন কোন সমস্ত তাঁহার সঙ্গে যোগ দিয়াছিলেন, ইত্যাদি কিছুই সন্ধ্যাকর বলেন নাই। অনন্ত সামন্তচক্রের সম্মিলিত বিদ্রোহের তিনি নায়কত্ব করিয়াছিলেন, এমন কোনও প্রমাণও নাই। সন্ধ্যাকর তাহাকে বলিয়াছেন। ‘দস্য’ এবং ‘উপধি-ব্রতী’ (ছলাকলায় অজুহাতে অন্যায় কৌশলে কার্যোদ্ধারপরায়ণ)। মনে হয়, দিব্য পাল-রাজাদের অন্যতম রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন এবং পালরাষ্ট্রের দুর্বলতায় রাজপরিবারে ভ্রাতৃবিরোধের সুযোগ লইয়া তিনি “বিদ্রোহপরায়ণ হুইয়াছিলেন। অন্তত, তিনি যে কোনো প্রজাবিদ্রোহের নায়কত্ব করিয়াছিলেন, এমন কোনও প্রমাণ উপস্থিত নাই; সন্ধ্যাকর নদী অন্তত তাহা বলেন নাই, অন্যত্রও তেমন প্রমাণ নাই। সন্ধ্যােকর তো দিব্যকে ‘কুৎসিত কৈবর্ত নৃপ বলিয়াছেন, এই বিদ্রোহকে ‘অনীক ধর্ম-বিপ্লবী বলিয়াছেন (অনীক = অন্যায়, অপবিত্র) এবং এই উপপ্লবকে “ভাবস্য আপদম” বলিয়া বৰ্ণনা করিয়াছেন। সন্ধ্যাকরের সাক্ষ্য যে পক্ষপাতদুষ্ট নয়, এমন অবশ্যই বলা যায় না। যাহাই হউক, বরেন্দ্রীর এই কৈবর্ত-বিদ্রোহে মহীপাল নিহত হইলেন এবং দিব্য বরেন্দ্রীর অধিকার লাভ করিলেন।
রামপাল ৷ জন্মঃ ১০৭২-১১২৬ ৷৷
বরেন্দ্ৰাধিপ দিব্যকে যুদ্ধে বর্মণ-বংশীয় বঙ্গরাজ জাতবর্মার সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল; কিন্তু তাহাতে কৈবর্ত-রাজ্যের কিছু ক্ষতি হয় নাই বলিয়া মনে হয়। শূরপাল বেশি দিন রাজত্ব করিতে পারেন নাই; রামপাল রাজা হইয়া দিব্যর রাজত্বকালেই বরেন্দ্রী পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু সফলকাম হইতে পারেন নাই। বরং কৈবর্তপক্ষ একাধিকবার রামপালের রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিল। দিব্যর পর রুদোকের আমলেও রামপাল বোধ হয় কিছু করিয়া উঠিতে পারেন। নাই। রুদোকের ভ্রাতা বরেন্দ্রীর অধিপতি হওয়ার পর সুপ্রতিষ্ঠিত কৈবর্ত শক্তি এক নূতন ও পরাক্রান্ততর আকারে দেখা দিল। ভীম জনপ্রিয় নরপতি ছিলেন; তাহার স্মৃতি আজও জীবিত। রামপাল শঙ্কিত হইয়া প্রতিবেশী রাজাদের ও পালরাষ্ট্রের অতীত ও বর্তমান, স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সামন্তদের দুয়ারে দুয়ারে তঁহাদের সাহায্য ভিক্ষা করিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া ফিরিলেন। অপরিমিত ভূমি ও অজস্র অর্থ দান করিয়া এই সাহায্য ক্রয় করিতে হইল। রামচরিতে এই সব রাজা ও সামন্তদের যে তালিকা দেওয়া আছে তাহা বিশ্লেষণ করিলেই দেখা যাইবে, তদানীন্তন বাঙলা ও বিহারের রাষ্ট্ৰতন্ত্র অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন অংশে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছিল। রামপালের প্রথম ও প্রধান সহায়ক হইলেন ১৭ তাহার মাতুল রাষ্ট্রকূটবংশীয় সামন্ত মথন (মহন) ও তাহার মহামাণ্ডলিক দুই পুত্র ও এক মহাপ্ৰতীহার ভ্রাতুষ্পপুত্র; ২) পীঠি ও মগধাধিপতি ভীমযশ; ৩০ কোটাটবার রাজা বীরগুণ; কোটাটৰী বিষ্ণুপুরের পূর্বে বর্তমান কোটেশ্বর; ৪. দণ্ডভুক্তির রাজা জয়সিংহ; ৫. বাল-বলভীর অধিপতি বিক্রম রাজ; বাল-বলভী মেদিনীপুরের পশ্চিম-দক্ষিণ সীমান্তে বলিয়া মনে হয়; ৬ অপর-মন্দারের অধিপতি লক্ষ্মীশূর; অপর-মন্দার পরবর্তীকালের মাদারুণ বা মন্দারণ-সরকারের পশ্চিমাংশ, বর্তমান হুগলী জেলায়; লক্ষ্মীশূর ছিলেন এই অঞ্চলের সমস্ত আটবিক খণ্ডের সামন্তচক্ৰ-চুড়ামণি। ৭. কুজবটীর রাজা শূরপাল; কুজবটী সাঁওতাল পরগণায়, নয়া-দুমকার ১৪ মাইল উত্তরে; ৮. তৈলকম্প বা বর্তমান তেলকুপির (মানভূম জেলা) অধিপতি রুদ্রশিখর; ৯° উচ্ছালাধিপতি ভাস্কর বা ময়গল সিংহ; উচ্ছল বর্তমান বীরভূমের উঝিয়াল পরগণা; ১০. কাজঙ্গল-মণ্ডলাধিপতি নরসিংহাৰ্জন; ১১. সঙ্কটগ্রামের চণ্ডাৰ্জ্জুন; সঙ্কটগ্রাম বল্লালচরিত-গ্রন্থের সংককোট, আইন-ই-আকবরী গ্রন্থের সকোট, বোধ হয়। হুগলী জেলায়; ১২ ঢেঙ্করীয় (কাটোয়া মহকুমার ঢেকুরী)-রাজ প্রতাপসিংহ; ১৩. নিদ্রাবলীর বিজন্মেরাজ; ১৪, কৌশাম্বী-অধিপতি দ্বোরপবর্ধন; কৌশাম্বী রাজশাহীর কুসুম্বা পরগণা, অথবা বগুড়া জেলার তাপে কুসুম্বি পরগণা; ১৫, পদুবন্ধার সোম; পদ্মবন্ধ পাবনা হইতে পারে, কিন্তু হুগলী জেলার পোনান পরগণা হওয়াই অধিকতর সম্ভব।
