মহীপাল গৌড়তন্ত্রের, তথা পাল-সাম্রাজ্যের পুনরুদ্ধারে অনেকটা সার্থকতা লাভ করিয়াছিলেন, সন্দেহ নাই; কিন্তু এই পুনরুদ্ধার স্থায়ী হওয়া সম্ভব ছিল না। নারায়ণপালের সময় হইতেই পাল-সাম্রাজ্যের যে ভগ্নদশা আরম্ভ হইয়াছিল এবং দ্বিতীয় বিগ্রহপালের সময় যে চরম অবনতি দেখা দিয়াছিল, মহীপাল তাহা রোধ করিয়া পূর্ব গৌরব অনেকটা ফিরাইয়া আনিলেন সত্য, কিন্তু মহীপালের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই আবার সেই রাজ্য ও রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ভাঙিয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। ভাঙন—রোধের চেষ্টা যে কিছু হয় নাই তাহা নয়, কিন্তু কোনও চেষ্টাই সফল হয় নাই! হওয়া সম্ভব ছিল না। যে রাষ্ট্ৰীয় ও সামাজিক কারণের ইঙ্গিত আগে করিয়াছি তাহা বঙ্গ-বিহারের পক্ষেও সত্য ছিল; স্থানীয় আত্মকর্তৃত্বের রাষ্ট্রীয় আদর্শ বাহির ও ভিতর হইতে ক্রমাগতই পাল-রাজ্য ও রাষ্ট্রকে আঘাত করিতে আরম্ভ করিল এবং সেই আঘাতে রাজ্য ও রাষ্ট্র ক্রমশ দুর্বল হইয়া পড়িল। তাহা ছাড়া, আভ্যন্তরীণ অন্যান্য সামাজিক কারণও ছিল; যথাস্থানে তাহা বলিতে চেষ্টা করিব। এই সব কারণ সম্বন্ধে রাষ্ট্রের সচেতনতা যে খুব বেশি ছিল, মনে হয় না। সেই জন্য রাজা ও রাষ্ট্র গঠন এবং রক্ষার চেষ্টার ত্রুটি না হইলেও সমাজ-ইতিহাসের অমোঘ নিয়মের ব্যতিক্রম হইল না; ভাঙনের গতি মন্থর হইল বটে, কিন্তু তাহা রোধ করা সম্ভব হইল না।
ভগ্নদশা
মহীপালের পুত্র নয়পালের (আঃ ১০২৭-১০৪৩) রাজত্বকালে কলচুরীরাজ কর্ণ বা লক্ষ্মীকর্ণের যুদ্ধ হয়, কিন্তু তিব্বতী সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, এই যুদ্ধ জয়-পরাজয়ে মীমাংসিত হয়। নাই। দীপঙ্কর-শ্ৰীজ্ঞানের (অতীশ) মধ্যস্থতায় দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একটা সন্ধি-শাস্তির প্রতিষ্ঠায় এই যুদ্ধ পরিণতি লাভ করিয়াছিল। কিন্তু, নয়পালের পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে (আঃ ১০৪৩-৭০) কর্ণ বোধ হয়। দ্বিতীয়বার বাঙলাদেশ আক্রমণ করেন এবং অন্তত বীরভূম পর্যন্ত অগ্রসর হন। বীরভূমের পাইকোর গ্রামে একটা প্রস্তরস্তম্ভের উপর কর্ণের একটি লিপি খোদিত আছে। এই দ্বিতীয় আক্রমণের পরিণতিই বোধ হয় তৃতীয় বিগ্রহপাল এবং কর্ণ-কন্যা যৌবনশ্ৰীীর বিবাহ। বঙ্গে এই সময় চন্দ্ৰ বা বর্মারা রাজত্ব করিতেছিলেন এবং কর্ণ প্রথমবারের আক্রমণে ইহাদেরই একজন রাজাকে পরাজিত করিয়া থাকিবেন।
লক্ষ্মীকর্ণের হাত হইতে উদ্ধার সম্ভব হইলেও পশ্চিমবঙ্গ বোধ হয় বেশি দিন। আর পাল-সাম্রাজ্যভুক্ত থাকে নাই। মহামাণ্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ নামে এক সামন্তরাজা এই সময়ে বর্ধমান অঞ্চলে স্বাধীন স্বতন্ত্র মহারাজাধিরাজরূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ইহার কেন্দ্র ছিল বর্ধমান জেলার ঢেঙ্করী নামক স্থানে। পূর্ববঙ্গে ত্রিপুরা অঞ্চলে এই সময়ে পট্টিকের রাজ্য গড়িয়া উঠে; এই রাজ্যের সঙ্গে সমসাময়িক পগানের (ব্রহ্মদেশ) আনাহউরহ থা বা অনিরুদ্ধের রাজবংশের কয়েক পুরুষের রাষ্ট্রীয় ও বৈবাহিক সম্বন্ধের বিবরণ জানা যায়। দ্বাদশ শতকে রণবঞ্চমল্ল নামে অন্তত একজন নরপতির নামও আমরা জানি। পূর্ববঙ্গের অন্যান্য স্থানে একাদশ শতকের শেষার্ধে এবং দ্বাদশ শতকে চন্দ্ৰবংশ এবং পরে বর্মণ বংশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল। কাজেই পূর্ববঙ্গ পুনরুদ্ধার পালরাজারা আর করিতেই পারেন নাই;
কর্ণাটাক্রমণ
তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে (আঃ ১০৪৩-৭০) বাঙলাদেশে আর এক নূতন বহিঃশত্রুর আক্রমণ দেখা দিল। বিক্রমাঙ্কদেবচরিত-রচয়িতা বিলহন বলিতেছেন, কর্ণাটের চালুক্যরাজ প্রথম সোমেশ্বরের জীবিতকালেই পুত্র (ষষ্ঠ) বিক্ৰমাদিত্য এক বিপুল সৈন্যবাহিনী লইয়া দিগ্বিজয়ে বাহির হইয়াছিলেন (আঃ ১০৬৮)। চালুক্য-লিপিতেও এই দিগ্বিজয়ের কিছু আভাস আছে এবং বাঙলায় একাধিক চালুকারাজ কর্তৃক একাধিক সমারাভিযানের উল্লেখ আছে। এই সব কর্ণাটদেশীয় সমারাভিযানকে আশ্রয় করিয়াই কিছু কিছু কর্ণাট ক্ষত্ৰিয়সামন্ত-পরিবার এবং অন্যান্য কিছু কিছু লোক বাঙলাদেশে আসিয়াছিলেন এবং সৈন্যাভিযান স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পরও তাহারা এখানেই থাকিয়া গিয়াছিলেন। বিহার ও বাঙলাদেশের সেন-রাজবংশ এবং (পূর্ব) বঙ্গের বর্মণ রাজবংশ এই সব দক্ষিণী কর্ণাটী-পরিবার হইতে উদ্ভূত বলিয়া ইতিহাসে বহুদিন স্বীকৃত হইয়াছে। একাদশ শতকের মধ্যভাগে বাঙলার উপর আর একটি ভিনাপ্রদেশী আক্রমণের সংবাদ জানা যায়। উড়িষ্যার রাজা মহাশিবগুপ্ত যযাতি গৌড়, রাঢ়া এবং বঙ্গে বিজয়ী সমারাভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করিয়াছেন। আর এক উড়িষ্যারাজ উদ্যোত কেশরী, তিনিও একবার গৌড়সৈন্যবিজয়ের দাবি জানাইতেছেন : তাহাও সম্ভবত এই সময়ই। এই সব ভিনাপ্রদেশী আক্রমণের ফলে অনুমান করা কঠিন নয়; (পূর্ব)-বঙ্গ তো আগেই করাচ্যুত হইয়া গিয়াছিল; জয়পাল-বিগ্রহপালের আমলে পশ্চিমবঙ্গও তাহার হারাইয়াছিলেন। ক্ষীণায়মান পাল-রাজা এখন এই সব ভিনাপ্রদেশী আক্রমণে প্রায় ভাঙিয়া পরিবার উপক্রম হইল। মগধেও পাল-রাজাদের শাসনমুণ্ঠি শিথিল হইয়া আসিতেছিল। জয়পালের সময় হইতেই পরিতোয্য এবং তৎপুত্র শূদ্ৰক নামে দুই সামন্ত গয়া অঞ্চলে প্রধান হইয়া উঠিতেছিলেন; বস্তুত, বাহুবলে তাহারা গয়া পরিচালনা করিতেছিলেন বলিয়া আঁহাদের লিপিতে দাবি করা হইয়াছে। শূদ্রক, শূদ্রকের পুত্র বিশ্বরূপ বা বিশ্বাদিত্য এবং তৎপুত্র যক্ষপালের সময় এই বংশ ক্রমশ আরও পরাঞিান্ত হইয়া উঠে। গৌড়রাজ তো শূদ্ৰককে নিজে রাজপদে অভিষিক্ত করিয়া সম্মানিত করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করা হইয়াছে। তাহার পুত্র বিশ্বরূপ নৃপ বা রাজা বলিয়াই কথিত হইয়াছেন। বিহার ও বাঙলার পাল-রাজ্যের অবস্থা কল্পনা করা কঠিন নয়। বৰ্মণ রাজবংশ পূর্ববাঙলায় স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাজ্য গড়িয়া তুলিল; কামরূপরাজ রত্নপাল গৌড়রাজকে উদ্ধত অস্বীকারে অপমানিত করিতে এতটুকু ভীতিবোধ করিলেন না!
