বঙ্গে-বঙ্গালে চন্দ্ৰাধিপত্য
গোবিন্দচন্দ্ৰ নামে আর একজন চন্দ্রাস্ত্যনামা রাজার নাম জানা যায় চোলরাজ রাজেন্দ্ৰ চোলের তিরুমালয়-লিপি হইতে (১০২১)। ইনি বঙ্গলদেশের অধিপতি ছিলেন। লহয়চন্দ্র এবং গোবিন্দচন্দ্রের সঙ্গে পূর্ণচন্দ্রের বংশের কোনও সম্বন্ধ ছিল। কিনা বলা যায় না; তবে, দশম শতকের প্রথমার্ধ হইতে আরম্ভ করিয়া একাদশ শতকের দ্বিতীয় পাদ পর্যন্ত পূর্ব ও দক্ষিণ-বঙ্গের অন্তত কিয়দংশ পালবংশের রাজসীমার বাহিরে ছিল, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার কোনও কারণ নাই। বোধ হয়, চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের এবং গোবিন্দচন্দ্ৰকে যথাক্রমে কলচুরীরাজ এবং অন্তত একজন চোলরাজের পরাক্রান্ত সৈন্যবাহিনীর সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল। কলচুরীরাজ কোক্কল্প একবার বঙ্গরাজের রাজকোষ লুণ্ঠন করিয়াছিলেন; লক্ষ্মণরাজ একবার বঙ্গালরাজকে পরাজিত করিয়াছিলেন; কর্ণােদব একবার বঙ্গরাজ্য আক্রমণ করিয়া প্রাচ্যদেশের রাজাকে যুদ্ধে নিহত করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করিয়াছেন। চোলরাজ রাজেন্দ্ৰচোল কর্তৃক রাজা গোবিন্দচন্দ্রের বঙ্গাল দেশ জয় সুবিদিত।
সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা
দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র প্রথম মহীপালের (আঃ ৯৭৭-১০২৭) প্রথম ও প্রধান কীর্তি “অনধিকৃতবিলুপ্ত পিতৃরাজ্য” পুনরুদ্ধার। সমস্ত বঙ্গদেশেই তো পালরাষ্ট্রের কারচু্যত হইয়া গিয়াছিল এবং পাল-রাজ্য মগধাঞ্চলেই কেন্দ্রীভূত হইয়া গিয়াছিল। মহীপাল হৃত উত্তর ও পূর্ববঙ্গ পুনরুদ্ধার করিলেন। ত্রিপুরা জেলায় তাহার তৃতীয় ও চতুর্থ রােজ্যাঙ্কের লিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে; লিপি দুইটি বীলকীন্দক গ্রামবাসী (দবিদা থানার বাইলকান্দি গ্রাম?) দুই বণিক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি বিষ্ণু ও একটি গণেশমূর্তির পাদপীঠে উৎকীর্ণ। দিনাজপুর জেলায় বাণগড়ে প্রাপ্ত নবম রাজ্যাঙ্কের আর একটি লিপি তাহার উত্তর-বঙ্গাধিকারের প্রমাণ। উত্তর-বিহার বা অঙ্গদেশে মহীপালের লিপি পাওয়া গিয়াছে; মনে হয় মহীপাল এই দেশও পুনরুদ্ধার করিয়াছিলেন। মগধ তো পিতৃ-অধিকারে ছিলই; সারনাথে একটি এবং নালন্দায় দুইটি মহীপালের রােজ্যাঙ্কের লিপিও পাওয়া গিয়াছে। পশ্চিম ও দক্ষিণ-বঙ্গ তিনি পুনরাধিকার করিয়াছিলেন বলিয়া প্রত্যক্ষ প্রমাণ কিছু নাই, তবে, রাজেন্দ্রচোলের তিরুমালয়-লিপির সাক্ষ্যে মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গের অন্তত কিয়দংশে তাহার আধিপত্য স্বীকৃত হইত। রাজেন্দ্ৰচোল গঙ্গা হইতে পুণ্য তীর্থবারি। আনিয়া নিজের রাজ্যভূমি পবিত্রকরণোদেশে উত্তর-পূর্বভারতে সেনাবাহিনী প্রেরণ করিয়াছিলেন (১০২১—১০২৩)। ওডডবিষয় (উড়িষ্যা) এবং কোসলৈ নাড়ু (দক্ষিণ-কৌশল) জয়ের পর তাহার সেনাবাহিনী ধর্মপালকে পরাজিত করিয়া তণ্ডাবুক্তি (দণ্ডভুক্তি) অধিকার করেন; রণশ্বরকে পরাজিত করিয়া তককণলাড়ম (দক্ষিণ-রাঢ়)। অধিকার করেন; রাজা গোবিন্দচন্দ্রকে পলায়মান করিয়া বিরামহীন বৃষ্টিস্নাত বঙ্গলদেশ অধিকার করেন; তুমুল যুদ্ধে মহীপালকে ভীতিসন্ত্রস্ত করিয়া নারী, ধনরত্ন এবং পরাক্রান্ত হস্তী অধিকার করেন এবং মুক্তাপ্রসূ বিস্তৃত সমুদ্রতীরশায়ী উত্তিরল্যাড়ম (উত্তর রাঢ়) অধিকার করেন। স্পষ্টই দেখা যাইতেছে। এই সময় দণ্ডভুক্তি, দক্ষিণ-রাঢ় এবং বঙ্গালদেশ স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন নরপতির অধীন। কেবল উত্তর-রাঢ় মহীপালের অধীন বলিয়া মনে হইতেছে, তাহা না। হইলে মহীপাল এবং উত্তর-রাঢ় বিজয় লিপিটিতে এইভাবে উল্লিখিত হইত না। যাহাই হউক। রাজেন্দ্ৰ চোলের দিগ্বিজয় সাম্রাজ্যবিস্তার বলিয়া মনে হয় না, উদ্দেশ্য তাহা ছিল না; যে-ভাবেই হউক তঁহার এই দিগ্বিজয় স্থায়ী হয় নাই বলিয়াই মনে হয়। রাজত্বের শেষদিকে পুনর্বিজিত সাম্রাজ্যের কিয়দংশ আবার বোধ হয় মহীপালের কারচ্যুত হইয়াছিল। ১০২৬ খ্ৰীষ্টাব্দের পরে কোনও সময়ে কলচুরীরাজ গাঙ্গেয়দেব অঙ্গদেশ জয় করিয়াছিলেন বলিয়া গোহারবা-লিপিতে দাবি করা হইয়াছে। ১০৩৪ খ্ৰীষ্টাব্দে আহমদ জিয়লতিগিন যখন বারাণসী আক্রমণ করেন, তখন বারাণসী কলচুরীরাজ গাঙ্গেয়দেবের অধীন ছিল।
মহীপাল ও সমসাময়িক ভারতবর্ষ ৷ মহীপাল, আঃ ৯৭২-১০২৭ ৷৷
বহু আয়াসে অনেক বৎসরের অবিরত সংগ্রামের পর মহীপাল শুধু যে পিতৃরাজা পনরুদ্ধার করিয়াছিলেন তাঁহাই নয়, বিলুপ্ত সাম্রাজ্যেরও অস্তুত বৃহদংশের উদ্ধার সাধন করিয়া পাল-বংশের লুপ্ত গৌরবও খানিকটা ফিরাইয়া আনিয়াছিলেন। সারনাথের অনেক জীর্ণ বিহার ও মন্দিরের সংস্কার, নূতন বিহার-মন্দিরের প্রতিষ্ঠা, বুদ্ধগয়াবিহারের সংস্কার ইত্যাদি সাধনের ফলে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধজগতেও বাঙলাদেশ। কতকটু, তাহার স্থান ফিরিয়া পাইয়াছিল। পনরুত্থানের চেষ্টা ও অভ্যাসে বাঙালীর দেশ ও রাষ্ট্র আত্মগৌরব এবং প্রতিষ্ঠা খুঁজিয়া পাইয়াছিল; সেই জন্যই বাঙালীর লোকসম্মুতি মহীপালের গানে মহীপালকে ধারণ করিয়া রাখিয়াছে; লোকে আজও “ধান ভানতে মহীপালের গীত ভুলে নাই; মহীপালী-যোগীপাল-ভোগী।পালের গান তঁহাদের কণ্ঠে। রংপুর জেলার মাহীগঞ্জ (মহীগঞ্জ), বগুড়া জেলার মহীপুর, দিনাজপুর জেলার মহীসন্তোষ, মুর্শিদাবাদ জেলার মহীপাল, দিনাজপুর জেলার মহীপালদীঘি, মুর্শিদাবাদ জেলার (মহীপালের) সাগরদীঘি প্রভৃতি নগর ও দীঘিকা এখনও এই নৃপতির স্মৃতি বহন করিতেছে। মহীপালের সমগ্র রাজ্যকাল কাটিয়াছিল। পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধারে, সাম্রাজ্যের হৃত অংশ ও গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টায় এবং রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শাপ্তি ও শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনে। বোধ হয়, এই জন্যই তিনি এই সময়ে পঞ্জাবের শাহী রাজারা গজনীর সুলতান মামুদের বিরুদ্ধে যে সমবেত হিন্দুশক্তিসংঘ গড়িয়া তুলিতেছিলেন, মহীপাল তাঁহাতে যোগদান করিতে পারেন নাই। সমসাময়িক হিন্দু-শক্তিপুঞ্জ পশ্চিমদিকে সুলতান মামুদের পৌনঃপুনিক আক্রমণে বিব্রত ও বিপর্যস্ত ছিলেন বলিয়াই বোধ হয় মহীপালের পক্ষে হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার অস্তুত আংশিকত সম্ভব হইয়াছিল। মহীপালের স্বপক্ষে যুক্তি আরও দেওয়া যাইতে পারে; তিনি হয়তো ভাবিয়াছিলেন, স্বাধীন পরাক্রাপ্ত এবং সুশৃঙ্খল একটি রাষ্ট্রের পক্ষেই দুর্ধর্ষ নূতন বৈদেশিক অভিযাত্রীদের বাধা দেওয়া সম্ভব, বিচিত্র ও দুর্বল খণ্ড খণ্ড রাষ্ট্রের সম্মিলিত শক্তিপুঞ্জের পক্ষে নয়। হয়তো এই ভাবিয়াই তিনি তাহার রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের দিকে, এক কথায় বৈদেশিক অভিযাত্রীদের বিরুদ্ধে কঠিনতর প্রতিরোধ-প্রাচীর গড়িয়া তুলিবার দিকে মনঃসংযোগ করিয়াছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে অযৌক্তিক কিছু বলিতেছি না, কিন্তু ইহা যথার্থ বস্তুনিষ্ঠ ঐতিহাসিক দৃষ্টি কিনা, এ-সম্বন্ধে বোধ হয় সন্দেহ করা চলে। মহীপাল বোধ হয় বুঝিতে পারেন। নাই যে, একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণেই উত্তর-ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভাঙিয়া পড়িতেছিল এবং বিভিন্ন রাষ্ট্ৰপুঞ্জ একে একে পশ্চিমাগত মুসলিম অভিযাত্রী কর্তৃক পরাজিত ও পযুদস্ত হইতেছিল। ভারতের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় ঐক্যের আদর্শের স্থলে স্থানীয় প্রাদেশিক সচেতনতার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি দেখা দিতেছিল; অষ্টম শতকের সূচনা হইতেই ভারতের সমৃদ্ধ বৈদেশিক বাণিজ্যে আরব ও পারসিক বণিকেরা বৃহৎ অংশীদার হইতে আরম্ভ করিয়াছিলেন; ভারতের রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ক্রমশ উত্তর-ভারত হইতে দক্ষিণ-ভারতে হস্তান্তরিত হইতেছিল; আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির আদর্শবাদ ক্রমশ রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের প্রধান সহায়ক উচ্চতর বর্ণ ও শ্রেণীগুলির স্বচ্ছ বাস্তব সামাজিক দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করিয়া দিতেছিল। এই সব কারণে বিস্তুত তথ্যগত বিশ্লেষণ করিয়া দেখাইবার স্থান এখানে নয়, তবে মোটামুটি বলা যায়, অষ্টম শতকের সূচনা হইতেই এই সব সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ সক্রয় হইতে আরম্ভ করে এবং ভারতের সমাজে ও রাষ্ট্রে ইহাদের অনিবার্য। ফলের সূচনা দেখা দেয়। মহীপাল কিংবা উত্তর ও দক্ষিণ-ভারতের কোনও রাষ্ট্রই এ-সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন বলিয়া মনে হয় না; রাষ্ট্ৰক্ষেত্রে যে রাষ্ট্রীয় আদর্শের প্রেরণা মৌর্য বা গুপ্তসাম্রাজ্য গড়িয়াছিল, সেই আদর্শ সক্রয় থাকিলে বৈদেশিক অভিযাত্রী প্রতিরোধ অনেকটা সহজ হইত, কিন্তু এই যুগে আর তাহা ছিল না। তবু, পঞ্জাবের শাহী রাজারা সেই আদর্শে উদ্ধৃদ্ধ হইয়া দেশের সমগ্র রাষ্ট্রশক্তিতে ঐক্যবদ্ধ করিয়া একটি প্রতিরোধ রচনার চেষ্টা করিয়াছিলেন; ভারতবর্যের সমসাময়িক ইতিহাসে ভারতীয় রাষ্ট্রপুঞ্জের ইহাই ছিল ঐতিহাসিক কৰ্তব্য। মহীপাল এই সামগ্রিক ঐক্যাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হন নাই এবং সমসাময়িক ঐতিহাসুিক কৰ্তব্য পালন করেন নাই। স্থানীয় প্রান্তিক আত্মকর্তৃত্বের আদর্শই তাহার কাছে বড় হইয়া দেখা দিয়াছিল, এই ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করা যায় না। সেই ক্রমবর্ধমান আপদের সম্মুখে ভারতীয় ইতিহাসের সামগ্রিক আদৰ্শই স্মর্তব্য, স্থানীয় আত্মকর্তৃত্বের বা পাল-সাম্রাজ্যের আদর্শ নয়। সেই সুবৃহৎ বিপদের সম্মুখে পাল-সাম্রাজ্যের আদর্শ সমগ্ৰ ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক কৰ্তব্যের কাছে ক্ষুদ্র। তবে, এ-সম্বন্ধে শুধু মহীপালকেই দায়ী করা চলে না, দক্ষিণ-ভারতের রাষ্ট্রকূট ও চোলেরা এবং উত্তর-ভারতের দু’একটি রাষ্ট্র সমান দায়ী। রাষ্ট্রকুটেরা তো এই সব বৈদেশিক অভিযাত্রীদের সহায়তাই করিয়াছিলেন। বস্তুত, অষ্টম শতক হইতেই রাষ্ট্ৰক্ষেত্রে স্থানীয় প্রান্তিক আত্মকর্তৃত্বের যে আদর্শ বলবত্তর হইতেছিল। সেই আদর্শই ইহার জন্য দায়ি। অন্যান্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ তো ছিলই। মহীপাল যোগদান করিলেই যে হিন্দু শক্তিপুঞ্জের চেষ্টা সার্থক হইত, তাহা বলা যায় না; সে-সম্ভাবনা বরং কমই ছিল। কী হইলে কী হইত, এই আলোচনা করিয়া ইতিহাসে লাভ কিছু নাই; কী কারণে কী হুইয়াছে এবং কী হয় নাই, তাহাঁই ইতিহাসে আলোচ্য। তথ্য এই যে, মহীপাল সমবেত শক্তিসংঘে যোগ দেন নাই।
