নারায়ণপালের পুত্র রাজ্যপাল (আঃ ৯১৭-৫২) এবং পৌত্র দ্বিতীয় গোপালের (আঃ ৯৫২-৯৭২) রাজত্বকালে পাল-সাম্রাজ্য অন্তত মগধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় গোপালের পুত্র দ্বিতীয় বিগ্রহপালের আমলে মগধের অধিকার বোধ হয় পালবংশের কারচু্যত হইয়া থাকিবে। প্ৰতীহার ও রাষ্ট্রকূটভয় এই সময় আর ছিল না বটে, কিন্তু উত্তর-ভারতে চন্দেল্ল ও কলচুরী এই দুই রাজবংশ এই সময় প্রবল পরাক্রান্ত হইয়া উঠে। চন্দেল্লরাজ যশোবর্মা “লতারূপ গৌড়দের তরবারী স্বরূপ” ছিলেন, এবং তাঁহার পুত্র ধঙ্গা (আঃ ৯৫৪—১০০০) রাঢ়া এবং অঙ্গের রাজমহিষীদের কারারুদ্ধ করিয়াছিলেন। কাব্যিক ভাষার আশ্রয় ছাড়িয়া দিলে বুঝা যায়। এই দুই চন্দোল্ল নরপতি গৌড়, অঙ্গ এবং রাঢ়দেশকে সমরে পযুদস্ত করিয়াছিলেন। কলচুরীরাজ প্রথম যুবরাজ (আঃ দশম শতকের প্রথম পদ) গৌড়-কর্ণাট-লাট কাশ্মীর-কলিঙ্গকামিনীদের লইয়া নাকি কেলি করিয়াছিলেন অর্থাৎ এই সব দেশে সমরাভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন, এবং তাহার পুত্ৰ লক্ষ্মণরাজ (আঃ দশম শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাদ) বঙ্গালদেশ জয় করিয়াছিলেন। এই সব ক্ৰমান্বয় পরাজয় ও সামরিক বিপর্যয় পাল-সাম্রাজ্যের এবং রাষ্ট্রের সামরিক ও রাষ্ট্ৰীয় দৈন্য সূচিত করে, সন্দেহ নাই। চন্দোল্ল ও কলচুরী লিপিমালায় গৌড়-অঙ্গ-রাঢ়া-বঙ্গালের পৃথক পৃথক উল্লেখ হইতেও মনে হয় বাঙলাদেশেও পালরাজ্য বিভিন্ন জনপদ রাষ্ট্রে বিভক্ত হইয়া পড়িবার দিকে ঝোক স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। অন্তত রাঢ়া অঞ্চল ও বঙ্গালদেশে যে স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিয়াছে। এ-সম্বন্ধে সুস্পষ্ট লিপি-প্রমাণ বিদ্যমান। বস্তুত, বাণগড়-লিপিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, দ্বিতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে পাল-রাজ্য “অনধিকৃতবিলুপ্ত” হইয়া গিয়াছিল।
রাঢ়া-গৌড়ের কম্বোজাধিপত্য
বাণগড়-লিপির এই উক্তি মিথ্যা নয়। এই সময় উত্তর ও পূর্ববঙ্গে কম্বোজ নামক এক রাজবংশ প্রবল হইয়া উঠে। দিনাজপুর-স্তম্ভলিপিতে এক কম্বোজান্ধয় গৌড়পতির উল্লেখ আছে। ইর্দা-তাম্রপট্টে এই “কম্বোজান্ধয় গৌড়পতি”দের, তথা “কম্বোজকুলতিলক”-দের কয়েকজন রাজার খবর পাওয়া যায়। লিপিটি কম্বোজবংশীয় রাজ্যপাল-ভাগ্যদেবীর পুত্র এবং নারায়ণপালদেবের কনিষ্ঠভ্রাতা পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ শ্ৰীজয়পালের ত্রয়োদশ রােজ্যাঙ্কের এবং এই লিপি দ্বারা জয়পাল বর্ধমানভুক্তিতে কিছু ভূমিদান করিয়াছিলেন। স্পষ্টতই ‘বুঝা যায়, পশ্চিমবঙ্গের অস্তুত কিয়দংশ এবং বোধ হয় উত্তরবঙ্গেরও কিয়দংশ কম্বোজকুলতিলকদের করায়ত্ত হইয়াছিল। ইহাদের রাষ্ট্রকেন্দ্র ছিল প্রিয়ঙ্গু নামক স্থানে; স্থানটি কোথায় এখনও জানা যায় নাই। ইর্দাপট্টকথিত রাজ্যপাল ও পালরাজ রাজ্যপাল এক এবং অভিন্ন কিনা ইহা লইয়া পণ্ডিত মহলে প্রচুর তর্কবিতর্ক আছে। এক হইলে স্বীকার করিতে হয়, রাজ্যপালের পর বাঙলার পালরাজ্য দ্বিধা বিভক্ত হইয়া গিয়াছিল; এক এবং অভিন্ন না হইলে স্বীকার করিতে হয়, কম্বোজবংশীয় রাজ্যপাল পালরাষ্ট্রের দৈন্য এবং দীর্ধলোর সুযোগ লইয়া রাঢ়া-গৌড়ে নিজ বংশের প্রভুত্ব স্থাপন করিয়াছিলেন। এই কম্বোজাদের আদিভূমি কোথায় তাহা লইয়াও বিতর্কের অন্ত নাই। কেহ কেহ বলেন, ইহারা উত্তর-পশ্চিম-সীমান্তের কম্বোজদ্দেশাগত; কেহ কেহ বলেন, কম্বোজ দেশ তিব্বতে; আবার কাহারো মতে পূর্ব-দক্ষিণ ভারতের কম্বুজ (Combodia) এই কম্বোজদেশ। পাগ-সাম-জোন-জাং নামক তিব্বতী গ্রন্থে লুসাই পৰ্ব্বতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এক কম-পো-ৎসা-বা কম্বোজ দেশের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। এই কম-পোৎস এবং বাণগড় ইর্দা-লিপির কম্বোজ এক এবং অভিন্ন হওয়া কিছু বিচিত্র নয়।
পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গও এই সময় পাল-বংশের কারচুপ্ত হইয়া গিয়াছিল। হরিকেল অঞ্চলে মহারাজাধিরাজ কান্তিদেব (আঃ দশম শতকের প্রথমার্ধ) নামে এক বৌদ্ধ রাজার খবর পাওয়া যায় চট্টগ্রামের একটি তাম্র-পট্টোলীতে। ইহার রাষ্ট্রকেন্দ্র ছিল বর্ধমানপুর। এই বর্ধমানপুরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের কোনও সম্পর্ক আছে বলিয়া মনে হয় না। বর্ধমানপুর শ্ৰীহট্ট-ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম অঞ্চলে বোধ হয় কোনও স্থান হইবে।
ত্রিপুরা জেলার ভারেল্লা গ্রামে প্রাপ্ত নটেশ শিবের এক প্রস্তর মূর্তির পাদপীঠে লহয়চন্দ্র (আঃ দশম শতকের শেষার্ধ) নামে এক রাজার নাম পাওয়া যায়। বোধ হয় ত্রিপুরা অঞ্চলেই তাহার আধিপত্য বিস্তৃত ছিল। লহয়চন্দ্ৰ অন্তত ১৮ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন (আঃ দশম শতকের তৃতীয় পাদ)।
ঢাকা জেলার রামপাল ও ধুল্লা, ফরিদপুর জেলার ইদিলপুর এবং কেদারপুর অঞ্চলে প্রাপ্ত চারিটি লিপি হইতে এক চন্দ্র রাজবংশের চারিজন রাজার খবর পাওয়া যাইতেছে : পূৰ্ণচন্দ্র, পুত্র সুবৰ্ণচন্দ্ৰ, মহারাজাধিরাজ ত্ৰৈলোক্যচন্দ্ৰ (পত্নী শ্ৰীকাঞ্চনা) এবং পুত্ৰ মহারাজাধিরাজ শ্ৰীচন্দ্ৰ, সুবৰ্ণচন্দ্ৰ হইতে আরম্ভ করিয়া সকলেই বৌদ্ধধর্মশ্রিয়ী। ত্ৰৈলোক্যচন্দ্র ও শ্ৰীচন্দ্ৰ হরিকেলে অধিপতি ছিলেন এবং চন্দ্ৰদ্বীপ (বাখরগঞ্জ জেলা) ছিল তাঁহাদের রাষ্ট্রকেন্দ্র। লিপি-প্রমাণ হইতে মনে হয়, শ্ৰীহট্ট, ত্রিপুরা, ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চল। ইহাদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
