দেবপাল ৷ আঃ ৮১০-৮৪৭ ৷৷
ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (আঃ ৮১০-৮৪৭) রাজা হইয়া পিতৃ-আদর্শনুযায়ী পাল সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগী হইলেন। তাহা ছাড়া উপায়ও ছিল না; প্ৰতীহার ও রাষ্ট্রকুটেরা তখনও প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী; আরও নিকট উৎকল ও প্ৰাগজ্যোতিষ (কামরূপ)। তখন নিজ নিজ রাজবংশের অধীনে পরাক্রান্ত রাষ্ট্র গড়িয়া তুলিয়াছে; দূরে দক্ষিণে পাণ্ডারাও প্রবল হইয়া উঠিতেছে। এমন সময়ে স্বীয় রাজ্য ও রাষ্ট্র বজায় রাখিতে হইলেও বাধ্য হইয়া আক্রমণমুখী হওয়া ছাড়া অন্য উপায়ই বা কী? তাহা ছাড়া, উত্তর ভারতাধিপত্যের আদর্শ তখনও উত্তর ভারতের রাষ্ট্ৰক্ষেত্রে সক্রয়। মৌর্য ও গুপ্ত যুগের আদর্শ ছিল সর্বভারতের একরাট হওয়া; হর্ষবর্ধন-পরবর্তী রাষ্ট্ৰীয় আদর্শ “সকলোত্তরপথনাথ” বা “সকলোত্তর পথস্বামী” হওয়া। নবম শতক পর্যন্তও এই আদর্শ উত্তর ভারতে সক্রয় ও প্রায় সর্বব্যাপী, এই আদর্শ অনুসরণে দেবপালের সহায়ক হইলেন পর পর তাহার দুই প্রধান মন্ত্রী : ব্রাহ্মণ দৰ্ভপাণি ও তাহার পৌত্র কেদারমিশ্র। লিপিমালার সাক্ষ্য এই যে, এই দুই মন্ত্রীর সহায়তায় দেবপাল হিমালয় হইতে বিন্ধ্য পর্যন্ত এবং পূর্ব হইতে পশ্চিম সমুদ্রতীর পর্যন্ত সমস্ত উত্তর ভারত হইতে কর ও প্ৰণতি আদায় করিয়াছিলেন; কুণ-উৎকল- দ্রাবিড়-গুর্জরনাথদের দৰ্প খর্ব করিয়া তিনি সমুদ্রমেখলা রাজ্য ভোগ করিয়াছিলেন; তাহার এক সমরনায়কের (খুল্লতাত ভ্ৰাতা জয়পাল) সহায়তায় তিনি উৎকল-রাজকে রাজ্য ছাড়িয়া পলাইতে এবং প্ৰাগজ্যোতিষ-রাজকে বিনা যুদ্ধে আত্মসমৰ্পণ করাইতে বাধ্য করিয়াছিলেন। তাহার বিজয়ী সমারাভিযান তাহাকে উত্তর পশ্চিমে কম্বোজ এবং দক্ষিণে বিন্ধ্য পর্যন্ত লইয়া গিয়াছিল। দেবপাল, দেবপালের মন্ত্রী ও সমরনায়কদের এই দাবি খুব মিথ্যা বলিয়া মনে হয় না। যুণরাষ্ট্র (উত্তরাপথে হিমালয়ের সানুদেশে), কম্বোজ, উৎকল ও প্ৰাগজ্যোতিষ রাজ্য ধর্মপালবিজিত সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত সীমায় অবস্থিত; কাজেই দেবপাল কর্তৃক এই সব রাজ্য নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করিবার চেষ্টা স্বাভাবিক। গুর্জররাষ্ট্র ও প্ৰতীহারিদের এবং প্ৰতীহারিদের সঙ্গে পালদের সংগ্রামের সূচনা ও পরিণতি কতকটা ধর্মপালের সাম্রাজ্যবিস্তার উপলক্ষেই আমরা দেখিয়াছি। নাগভটের সঙ্গে দেবপালের কোনও সংগ্রাম হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না; তঁহার পুত্র রামভদ্রও উল্লেখযোগ্য নরপতি ছিলেন না। কিন্তু রামভদ্রপুত্র ভোজ প্ৰতীহারিদের হৃতগৌরব অনেকটা উদ্ধার করিয়াছিলেন; এবং বোধ হয় ভোজদেবের সঙ্গেই দেবপালের সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল। এই সংঘর্ষে ভোজদেব জয়ী হইতে পারেন নাই; কিছুদিন পর রাষ্ট্রকূট-রাজের কাছেও তিনি পরাজিত ও পর্যুদস্ত হন। যে-দ্ৰাবিড়নাথকে দেবপাল পরাজিত করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করিয়াছেন, তিনি বোধ হয় রাষ্ট্ৰকুট-রাজ অমোঘবর্ষ। কেহ কেহ মনে করেন, এই দ্রাবিড়নাথ হইতেছেন। পাণ্ডারাজ শ্ৰীমার শ্ৰীবল্লব, কিন্তু তাহার স্বপক্ষে যুক্তি দুর্বল। যাহা হউক, এই তথ্য সুস্পষ্ট যে, দেবপাল ধর্মপালের সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করিয়াছিলেন এবং হিমালয়ের সানুদেশ হইতে আরম্ভ করিয়া অন্তত বিন্ধ্য পর্যন্ত এবং উত্তর-পশ্চিমে কম্বোজদেশ হইতে আরম্ভ করিয়া প্ৰাগজ্যোতিষ পর্যন্ত তাহার আধিপত্য স্বীকৃত হইত। সেতুবন্ধ রামেশ্বর পর্যন্ত এক সমারাভিযানের ইঙ্গিত মুঙ্গের লিপিতেও আছে; ইহার সত্যতা সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা কঠিন, কারণ, রাজসভাকবির অত্যুক্তি বলিয়াই মনে হয়। দেবপালের সময়েই পালসাম্রাজ্য সর্বাপেক্ষা বিস্তৃতি লাভ করিয়াছিল। আরব-দেশী বণিক ও পর্যটক সুলেমান এই সময় (৮৫১) যি কয়েকবারই ভারতবর্ষে আসা-যাওয়া করিয়াছিলেন। তাহার বিবরণীতে দেখা যাইতেছে, পালরাজ গুর্জর-প্ৰতীহারও রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে সংগ্রামরত ছিলেন। তাহার সৈন্যদলে ৫০,০০০ হাজার হাতি ছিল এবং সৈন্যদলের সাজসজ্জা ও পোষাক পরিচ্ছদ ধোওয়া, গুছানো ইত্যাদি কাজের জন্যই ১০ হইতে ১৫ হাজার লোক নিযুক্ত ছিল। ধর্মপালের সাম্রাজ্যে যেমন, দেবপালের সময়ও তেমনই বিজিত রাজ্যের রাজারা স্ব স্ব রাষ্ট্রে স্বাধীন বলিয়া গণ্য হইতেন; কেন্দ্রীয় রাজ্য ও রাষ্ট্রের অন্তর্গত ঘৃতাহারা ছিলেন না, যদিও দেবপালের সর্বময় আধিপত্য তাহাদের স্বীকার করিতে হইত।
সাম্রাজ্যের বিলয় ৷ আঃ ৮০০—৯৮৮ ॥ নারায়ণ পাল ৷ আঃ ৮৬১-৯১৭ ৷৷
দেবপালের মৃত্যুর (আঃ ৮৪৭) কিছুদিন পর হইতেই পালবংশের সাম্রাজ্য-গৌরবসূর্য পশ্চিমাকাশে হেলিয়া পড়িতে আরম্ভ করে। যে-সাম্রাজ্য প্রায় শতাব্দীর তিনপাদ ধরিয়া প্রধানত ধর্মপাল ও দেবপালের চেষ্টা ও উদ্যমে গড়িয়া উঠিয়াছিল, তাহা প্রথম বিগ্ৰহপাল (আঃ ৮৬০-৬১) হইতে আরম্ভ করিয়া দ্বিতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বের মধ্যে (আঃ ৯৭২-৭৭) স্ট্রীরে ধীরে ভাঙিয়া পড়িল। প্রথম বিগ্রহপাল দেবপালের পুত্র ছিলেন না; দেবপালের সমরনায়ক বাকপাল বোধ হয় ছিলেন তাহার পিতা। দেবপালের পুত্র থাকা সত্ত্বেও এই উত্তরাধিকার পরিবর্তন কেন হুইয়াছিল। বলা কঠিন; তবে, ইহার মধ্যে কেহ কেহ পারিবারিক অনৈক্যের হেতু বিদ্যমান বলিয়া মনে করেন। হয়তো পাল-সাম্রাজ্যের শক্তিহীনতা এবং অস্তবিরোধও অন্যতম কারণ হইতে পারে। এই অনুমান কতটা ঐতিহাসিক বলা কঠিন, তবে মোটামুটি ইহা যুক্তিসিদ্ধ { বিগ্রহপালের অন্য নাম শুরপাল; তিনি ধর্মনিষ্ঠ ধর্মাচরণরত নৃপতি ছিলেন বলিয়া মনে হয়; পুত্ৰ নারায়ণপালকে সিংহাসন অৰ্পণ করিয়া তিনি ধর্মাচরণোদেশে বানপ্রস্থ অবলম্বন করেন। নারায়ণপাল (আঃ ৮৬১-৯১৭) অন্যান ৫৪ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন; কিন্তু এই সুদীর্ঘ রাজত্বকালে বাঙলার গৌরবের হেতু হইতে পারে নাই। সম্ভবত, এই সময়ই রাষ্ট্ৰকুট-রাজ অমোঘবর্ষ একবার অঙ্গ-বঙ্গ-মগধে বিজয়ী সমারাভিযান প্রেরণ করিয়াছিলেন; উড়িষ্যার শুন্ধিরাজ মহারাজাধিরাজ রণস্তম্ভও বোধ হয়। এই সময়ই রাঢ়ের কিয়দংশ জয় করেন। প্ৰতীহাররাজ ভোজদেবও নারায়ণপালের রাজত্বকালেই প্রায় মগধ পর্যন্ত সমস্ত পালসাম্রাজ্য অধিকার করেন এবং কলচুরীরাজ গুণাম্বোধিদেব এবং গুহিলোট্র-রাজ দ্বিতীয় গুহিল ভোজদেবের এই বিজয়ের অংশীদার হন। এই সময়ই বোধ হয় ডাহািলরাজ প্রথম কোকল্পদেবী (৮৪০-৮৯০) বঙ্গরাজ্যভাণ্ডার লুণ্ঠন করেন। ভোজদেকের পুত্ৰ প্ৰতীহার মহেন্দ্ৰপাল পাটনা এবং গয়া পার হইয়া একেবারে পুণ্ড্রবর্ধনের পাহাড়পুর অঞ্চল-পর্যন্ত প্ৰতীহার-সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন। মহেন্দ্ৰপালের পঞ্চম রােজ্যাঙ্কের একটি লিপি পাহাড়পুরের ধ্বংস্তুপের মধ্যে পাওয়া গিয়াছে। মহেন্দ্ৰপাল বেশি দিন উত্তরবঙ্গ ও বিহার ভোগ করিতে পারেন নাই বলিয়া মনে হয়; নারায়ণপাল তঁহার মৃত্যুর পূর্বে বঙ্গ-বিহার পুনরাধিকার করিয়াছিলেন, এ-সম্বন্ধে লিপি-প্রমাণ বিদ্যমান। প্ৰতীহারিদের কতকটা খর্ব করা সম্ভব হইলেও রাষ্ট্ৰকুট-রাজ দ্বিতীয় কৃষ্ণের নিকট নারায়ণপালকে বোধ হয় কিছুটা আনুগত্য স্বীকার করিতে হইয়াছিল। দেওলিতে প্রাপ্ত এক শাসনে কৃষ্ণ গৌড়বাসীদের বিনয় শিক্ষা দিয়াছিলেন এবং অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ-মগধে তাহার আদেশ মান্য ও স্বীকৃত হইত, এই বলিয়া দাবি করা হইয়াছে। পিঠাপুরমের এক লিপিতে কৃষ্ণা জেলার বেলনাণ্ডুর এক রাজা বঙ্গ, মগধ এবং গৌড়দের পরাজিত করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করিতেছেন; এই রাজা হয়তো দ্বিতীয় কৃষ্ণৈর সমরাভিযানের সঙ্গে আসিয়া এই সব দেশজয়ে কিছু অংশ গ্রহণ করিয়া থাকিবেন। দেবপালের সময়ে উৎকল ও কামরূপ দেবপালের আধিপত্য স্বীকার করিয়াছিলেন, কিন্তু নারায়ণপালের কালে রাজা মাধববর্মী শ্ৰীনিবাসের নেতৃত্বে (আঃ ৮৫০)। শৈলোদ্ভব বংশ উড়িষ্যায় এবং রাজা হর্জর ও পুত্ৰ বনমালের নেতৃত্বে কামরূপ প্রবল পরাক্রান্ত হইয়া উঠে।
