খ্ৰীষ্টীয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি কোনও সময় গোপালদেব পাল বংশের প্রতিষ্ঠা করেন এবং দ্বাদশ শতকের তৃতীয় পাদে গোবিন্দপালের সঙ্গে সঙ্গে এই বংশের বিলয় ঘটে। সুদীর্ঘ চারিশত বৎসর ধরিয়া নিরবচ্ছিন্ন একটি রাজবংশের রাজত্ব খুব কম দেশের ইতিহাসেই দেখা যায়। গোপালদেবের কুলগৌরব কিছু ছিল বলিয়া মনে হয় না, তেমন দাবিও কোথাও করা হয় নাই। হয়তো তিনিও একজন অন্যতম সামন্ত-নায়ক ছিলেন। অষ্টসাহস্ত্ৰিক প্রজ্ঞাপারমিতার হরিভদ্রকৃতটীকায় ধর্মপালকে “রাজভটাদিবংশপতিত” বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে; খালিমপুর লিপির “ভদ্রাত্মজা” শব্দ কেহ কেহ ধৰ্মপালের মাতা দেদাদেবীর বিশেষণ বলিয়া মনে করিয়াছেন। এই দুই পদের অর্থ লইয়া পণ্ডিত মহলে মতভেদের অtyনাই। মোটামুটি চেষ্টাটা হইয়াছে পালবংশের রাজকীয় আভিজাত্য প্রমাণের দিকে। কিন্তু এই দুইটি পদের একটিও নিঃসংশয়ে তেমন কিছু ইঙ্গিত করে না। তৃতীয় বিগ্রহপালের মন্ত্রী বৈদ্যদেবের কমৌলি লিপিতে পাল রাজাদের সূর্যবংশীয় বলা হইয়াছে; সোঢ়ঢ়ল কবির উদয়সুন্দরীকথায় পালরাজাদের সূর্যবংশীয় মান্ধাত পরিবার-সস্তুত বলা হইয়াছে। এই সব দাবির মূলে কোনও সত্য আছে কিনা সন্দেহ। সন্ধ্যাকর নদীর রামচরিতে, ধর্মপালকে বলা হইয়াছে “সমুদ্রকুলদীপ”; তারনাথও ধর্মপালের সঙ্গে সমুদ্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত করিয়াছেন। ঘনরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যেও সমুদ্রের সঙ্গে ধর্মপাল মহিষীর একটা সম্পর্কের ইঙ্গিত আছে। সমুদ্রাশ্রয়ী ও জলনিধিদুগনির্ভর গৌড়জনদের সঙ্গে অথবা সামুদ্রিক ও সমুদ্রাশ্রয়ী আদি-অষ্ট্রেলীয়-পলিনেশীয় নরগোষ্ঠীর সঙ্গে বাঙলার পাল বংশের কোনও সম্বন্ধের ইঙ্গিত এই সব কাহিনীর সঙ্গে জড়িত থাকা অসম্ভব নয়। সুপ্রাচীন বাঙলাদেশে, বাঙালীর জাতিতত্ত্ব ও ভাষায় এই নরগোষ্ঠীর দানের কথা তো আগে বিস্তৃতভাবেই উল্লেখ করিয়াছি। রামচরিতে এবং তারনাথের ইতিহাসে পাল রাজাদের ক্ষত্ৰিয়ত্বের দাবি উপস্থিত করা হইয়াছে; এ-দাবি কিছু অস্বাভাবিক নয়, কারণ ভারতীয় আর্য-ব্রাহ্মণ্য স্মৃতিতে রাজা মাত্রেই ক্ষত্ৰিয়। ইহার ঐতিহাসিক বর্ণগত ভিত্তি কিছু না-ও থাকিতে পারে। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প গ্রন্থে পালবংশকে বলা হইয়াছে “দাসজীবিনঃ”। আবুল ফজল বলিয়াছেন “কায়স্থ”। যাহা হউক, উপরোক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ হইতে এ তথ্য পরিষ্কার যে, ইহারা উচ্চতর বংশ বা বর্ণসভূত নহেন, এমন কি আর্য-ব্রাহ্মণ্য স্মৃতি ও সংস্কারের উত্তরাধিকারের দাবি পরোক্ষেও কোথাও তাহারা করেন নাই। সমসাময়িক রাজবংশের ইতিহাসে এই ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল।
সন্ধ্যাকর নদী সুস্পষ্ট বলিতেছেন, পালরাজাদের জনকভূমি বরেন্দ্রদেশ। ভোজদেবের গোয়ালিয়র লিপিতে পাল-রাজ (ধর্মপাল)-কে বলা হইয়াছে বঙ্গপতি। ইহারা যে বাঙালী ছিলেন এ সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার এতটুকু কারণ নাই। মনে হয়, ইহাদের আদিভূমি বরেন্দ্ৰভূমি এবং সেখানেই গোপাল কোনও সামন্ত-নায়ক ছিলেন; রাজা নির্বাচিত হইবার পর তিনি বঙ্গদেশেরও রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হন এবং বোধ হয়, গৌড়েরও। তারনাথ ঠিক এই কথাই বলিতেছেন : পুণ্ড্রবর্ধনের কোনও ক্ষত্ৰিয়বংশে গোপালের জন্ম, কিন্তু পরে তিনি ভঙ্গলের (= বঙ্গল বা বঙ্গালের) রাজা নির্বাচিত হন।
গোপালদেব বরেন্দ্রী ও বঙ্গে বাজা হইয়াই দেশে অন্য যত “কামকারী” বা যথেচ্ছপরায়ণশক্তি রা সামস্ত বা নায়কেরা ছিলেন তাহদের দমন করেন এবং বোধ হয়, সমগ্র বাঙলাদেশে আপনি প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। এই প্ৰভুত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হইয়াছিল বহু সামন্ত-নায়কের সহায়তায় সন্দেহ নাই; এই সামন্ত-নায়কেরাই তো স্বেচ্ছায় তাহাকে তাহাদের অধিরাজ নির্বাচন করিয়াছেন।
ধর্মপাল ৷ আঃ ৭৭৫-৮১০ ৷ সাম্রাজ্য-বিস্তার
গোপালদেবের পুত্র ধর্মপাল সিংহাসন আরোহণ করিবার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ভারতের আধিপত্য লইয়া গুর্জরপ্রতীহার-রাষ্ট্ৰকুট-পালবংশে বংশপরম্পরাবিলম্বিত এক তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হইয়া গেল। এই যুগে উত্তর-ভারতাধিপত্যের প্রতীক ছিল কানীজ-রাজলক্ষ্মী বা মহোদয়শ্রীর অধিকার। গুর্জরপ্রতীহার বংশের কেন্দ্ৰভূমি গুর্জরত্র ভূমি (রাজস্থান); রাষ্ট্রকুটেরা চালুক্য বংশের অধিকার লইয়া দাক্ষিণাত্যের অধিপতি; আর, গোপালদেবের উত্তরাধিকার লইয়া ধর্মপাল সমগ্র বাঙলাদেশের সর্বময় রাষ্ট্রনায়ক। ধর্মপালের সাম্রােজ্যালিন্সা পশ্চিমমুখী, বৎসরাজের পূর্বমুখী। এই সময় উত্তর ভারতে আর কোনও পরাক্রান্ত রাষ্ট্র ও রাজবংশ না থাকাতে এই রাজচক্রবর্তীত্বের সংঘর্ষ প্রথম আরম্ভ হইল ধর্মপাল (আঃ ৭৭৫-৮১০) ও প্ৰতীহাররাজ বৎসরাজের (আঃ ৭৭৫-৮০০) মধ্যে। ধর্মপাল পরাজিত হইলেন এবং হয়তো আরও পর্যুদস্ত হইতেন, কিন্তু দক্ষিণ হইতে রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব (আঃ ৭৮১-৭৯৪) একেবারে গাঙ্গেয় উপত্যকায় ঝড়ের মতন আসিয়া পড়িয়া প্রথমে বৎসরাজ এবং পরে ধর্মপাল উভয়কেই পরাজিত করিলেন। বৎসরাজ রাজস্থানের পথহীন মরুভূমিতে পলাইয়া গেলেন; কিন্তু ধ্রুব দাক্ষিণাত্যে ফিরিয়া যাওয়াতে ধর্মপালের বিশেষ কিছু অসুবিধা আর হইল না। তিনি অবাধে এবং নির্বিবাদে তাহার রাজ্যবিস্তারে মনোনিবেশ করিলেন এবং স্বল্পকালের মধ্যে ভোজ (বর্তমান বেরারের অংশ, প্রাচীন ভোজকটক), মৎস্য (আলওয়ার এবং জয়পুর-ভরতপুরের অংশ), মদ্র (মধ্য-পাঞ্জাব), কুরু (পূর্ব-পঞ্জাব), যদু (বোধ হয় পঞ্জাবের সিংহপুর, যাদব রাষ্ট্র), যবন (বোধ হয়, পাঞ্জাব বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কোনও আরব খণ্ডরাষ্ট্র), অবন্তী (বর্তমান মালব), গন্ধার (পশ্চিম-পঞ্জাব) এবং কীর (পঞ্জাবের কাংড়া জেলা) রাজ্য জয় করেন। এই সাম্রাজ্য বিস্তার চক্রেই তিনি কনৌজ বা মহোদয়শ্রীর অধিপতি ইন্দ্ররাজ (ইন্দ্ৰায়ুধ)-কে পরাজিত করেন এবং সেই সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেন চক্রায়ুধকে। কনৌজে চক্রায়ুধের অভিষেকের সময় উপরোক্ত বিজিত রাজ্যের রাজারা ধর্মপালের নিকট “প্ৰণতি পরিণত” হন। এই দিগ্বিজয়চক্ৰ উপলক্ষেই তাহার সৈন্য-সামন্তরা কেদার, গোকৰ্ণ ও “গঙ্গাসমেতাম্বুধি’তে তীর্থপূজাক্রিয়া ইত্যাদি সমাপন করিয়াছিলেন। কেদার (হিমালয়সানুতে গাড়োয়াল জেলায়) এবং গোকর্ণের (নেপাল রাজ্যে বাগমতী নদীর তীরে) উল্লেখ দেখিয়া মনে হয় ধর্মপাল নেপালও জয় করিয়াছিলেন; স্বয়ন্ত্রপুরাণে তো স্পষ্টই বলা হইয়াছে, গৌড়রাজ ধৰ্মপাল নেপালেরও অধিপতি ছিলেন। ধর্মপালের মুঙ্গের লিপির একটি শ্লোকে হিমালয়ের সানুদেশ ধরিয়া ধৰ্মপালের সমারাভিযানের একটু ইঙ্গিতও আছে। কেহ কেহ মনে করেন “গঙ্গাসমেতাম্বুধি” স্থানটিও নেপালেই। হয়তো এই নেপালের অধিকার লইয়াই তিব্বতরাজ মু-তিগ-বৎসন-পো’র সঙ্গে ধর্মপালের সংঘর্ষ হইয়া থাকিবে, কারণ নেপাল এই সময় তিব্বতের অধীন ছিল। পঞ্চগৌড়াধিপ। ধর্মপাল যে উত্তর ভারতের প্রায় সর্বাধিপত্য লাভ করিয়াছিলেন তাহা গুর্জররাষ্ট্রবাসী সোঢ়ঢ়ল কবির উদয়সুন্দরীকথাতেও (একাদশ শতক) স্বীকৃত হইয়াছে; এই গ্রন্থে ধর্মপালকে বলা হইয়াছে “উত্তরাপথস্বামী”। যাহা হউক, এই সব বিজিত রাজা ধর্মপালের সর্বাধিপত্য স্বীকার করিয়াছিলেন, সন্দেহ নাই; কিন্তু, ধর্মপাল ইহাদের তঁহার গৌড়-বঙ্গ-মগধধূত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের অন্তর্গত করেন নাই; স্ব স্ব রাজ্যে ইহাদের রাজারা স্বাধীন নরপতি রূপেই স্বীকৃত হইতেন, কিন্তু ধর্মপালের বশ্যতা ও আনুগত্য স্বীকার করিতে হইত। কিন্তু, ইতিমধ্যে বৎসরাজ পুত্র দ্বিতীয় নাগভট প্ৰতীহার-সিংহাসন আরোহণ করিয়াছেন এবং সিন্ধু, অন্ধ, কলিঙ্গ ও বিদর্ভ রাজ্যের সঙ্গে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া পূর্ব পরাজয়ের প্রতিশোধ লইতে কৃতসংকল্প হইয়াছেন। প্রথমেই কনৌজ আক্রান্ত হইল এবং চক্রায়ুধ পরাজিত হইয়া ধৰ্মপালের নিকট পলাইয়া গেলেন। নাগভট পূর্বদিকে অগ্রসর হইতেছিলেন, এমন সময় মুদগগিরি বা মুঙ্গেরের নিকট এক তুমুল সংগ্রাম হইল। ধৰ্মপাল পরাজিত হইলেন, কিন্তু এবারও রাষ্ট্রকূট-রাজ তৃতীয় গোবিন্দ আসিয়া নাগভটকে একেবারে পরাজিত ও পযুদস্ত করিয়া দিলেন এবং এই পরাক্রান্ততর নরপতির কাছে ধর্মপাল ও চক্রায়ুধ দুইজনেই স্বেচ্ছায় নতি স্বীকার করিলেন। কিন্তু গোবিন্দ আবার দাক্ষিণাত্যে স্বরাজ্যে ফিরিয়া গেলেন এবং ধর্মপাল আবার রাহুমুক্ত হইলেন। এই সাময়িক নতি স্বীকার সত্ত্বেও ধর্মপালের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত উত্তর ভারতে তাহার সর্বময় আধিপত্য ক্ষুন্ন হইয়াছিল, এমন কোনও সাক্ষ্য উপস্থিত নাই। তঁহার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্ৰতীহার রাষ্ট্র দুই দুইবার পর্যুদস্ত হইয়া শীর্ণ ও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল, আর রাষ্ট্রকুটেরা দুই দুইবার জয়ী হওয়া সত্ত্বেও উত্তর-ভারতে রাজ্যবিস্তারের সচেতন চেষ্টা বোধ হয় করেন নাই। যাহা হউক, ধর্মপাল-পুত্র দেবপালের সিংহাসন আরোহণের কালে রাজ্যে কোথাও কোনও যুদ্ধবিগ্রহ বা অশান্তি কিছু ছিল না বলিয়াই মনে হয়।
