‘এই সময় সমূদ্র পর্যন্ত বাঙলাদেশ তীৰ্থিকদের (ব্রাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী) দ্বারা পরিপূর্ণ, বৌদ্ধ মঠগুলি ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে এবং তাহারই ইটকািঠ কুড়াইয়া লোকে বাড়ি তৈয়ারী করিতেছে; দেশে অনেক ব্রাহ্মণ সামন্ত ভূম্যধিকারী ছিল এবং গোপালও ব্রাহ্মণানুরও ছিলেন।‘
ধর্ম ও সংস্কৃতির দিক হইতে একশত বৎসর ধরিয়া বাঙলায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধিত হইতেছিল বলিয়া মনে হয়। যে সংস্কৃত ভাষা বাঙালী পণ্ডিতদের হাতে কোনোপ্রকারে ভাব প্রকাশের উপায় মাত্র ছিল (পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের সংস্কৃত লিপিগুলিই তাহার প্রমাণ), সেই সংস্কৃত ভাষা সপ্তম শতকের মাঝামাঝি, বিশেষভাবে পাল আমলের সূত্রপাত হইতেই, অপূর্ব ছন্দলালিতাময় কাব্যময় ভােব প্রকাশের বাহন হইয়া উঠিয়াছে (দ্রষ্টব্য, লোকনাথের লিপি, পাল আমলের লিপিগুলি)। বৌদ্ধধর্ম আরও বিস্তৃত হইয়াছে শুধু তাঁহাই নয়, বাঙলার বহুস্থানে সুবৃহৎ মহাবিহার ইত্যাদিও স্থাপিত হইতেছে অষ্টম শতকের শেষপাদ হইতেই এবং বৌদ্ধ শিক্ষা-দীক্ষা বিস্তৃতি লাভ করিতেছে। যে ব্রাহ্মণ্যধর্মের দেবদেবীর সংখ্যা ও প্রসার ছিল সীমিত তাহাদের সংখ্যা যেমন বাড়িয়াছে, বিষ্ণু, শৈব, শাক্ত এবং নানা মিশ্র দেবদেবীতে দেশ যেমন ছাইয়া গিয়াছে, তেমনই তাঁহাদের প্রভাবও গিয়াছে বাড়িয়া। পাল আমলের সূচনা হইতেই বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের এই সমৃদ্ধি দৃষ্টি আকর্ষণ করে; সংস্কৃত ভাষার সমৃদ্ধিও দৃষ্টি এড়াইবার কথা নয়; বৌদ্ধধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তারের কারণ সুবোধ্য; পাল বংশই তো প্রধানত বৌদ্ধ বংশ ছিল। কিন্তু ব্ৰাহ্মণ্যধৰ্মও পূর্বযুগের অনুপাতে এই যুগে বহুতর বিস্তৃতি, প্রসার ও প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছে, এমন কি বৌদ্ধধর্মেরও সাংস্কৃতির আদর্শ অনেকটা ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি অনুযায়ী। এই বিবর্তন সমস্তটাই সংঘটিত হইয়াছে মৎস্যন্যায়ের একশত বৎসরের মধ্যে এবং পাল আমলে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপিত হওয়ার পর তাহার সম্পূর্ণ রূপটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হইতেছে। এই একশত বৎসরের বৈদেশিক আক্রমণের দুর্যোেগ-দুর্বিপাককে আশ্রয় করিয়াই উত্তর ভারতের ক্রমবর্ধমান ক্রমপ্রসারমান ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতি এবং সংস্কৃত ভাষা বাঙলাদেশে আসিয়া বিস্তৃততর সমৃদ্ধি লাভ করিয়াছে। আর, বাঙলাদেশের বৌদ্ধধর্ম যে পাল আমল হইতে উত্তরোত্তর তন্ত্রাশিত হইয়াছে তাহার মূলে স্ৰং-ৎসন-গ্যাম্পে এবং তাহার পৌত্রের এবং তাহারও পরবর্তী একাধিক তিব্বতী অভিযানের কোনও প্রভাব নাই, খড়্গ বংশীয় বৌদ্ধ রাজাদের কোনও প্রভাব নাই, এ কথাই বা কে বলিবে? খড়্গ বংশীয় রাজারা বহির্দেশাগত বলিয়াই তো মনে হয়। একশত বৎসরের রাষ্ট্ৰীয় দুর্যোগের কোন ফাকে কে বা কাহারা কোন সংস্কৃতির ধারায় কোন নূতন স্রোত বহাইয়া দিয়া গিয়াছেন, ইতিহাস তাহার হিসাব, এমন কি ইঙ্গিতও রাখে নাই। অথচ, বৃহৎ সামাজিক আবর্তন-বিবর্তন তো এই রকম দুর্যোগের মধ্যেই ঘটিয়া থাকে। বাঙলাদেশেও তাঁহাই হইয়াছিল; নহিলে পোল আমলের সূচনা হইতেই বৌদ্ধ এবং ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির, সংস্কৃত ভাষার এমন সুসমৃদ্ধ রূপ আমরা দেখিতে পাইতাম না।
০৭. পলায়ন
মাৎস্যন্যায় হইতে রক্ষা পাইবার জন্য বাঙলার প্রকৃতিপুঞ্জ যাঁহাকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিল সেই গোপালদেব ছিলেন দায়িতবিষ্ণুর পুত্র এবং বপ্যটের পৌত্র। সমসাময়িক যুগসুলভ পৌরাণিক বংশ মর্যাদায় নিজেদের কৌলীন্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা পাল অধিপতিদের কাহারও দেখা যায় না; বস্তুত, পাল রাজাদের দলিলপত্রে অথবা রাজসভায় রচিত কোনও গ্রন্থেই সে ‘চেষ্টা নাই। খালিমপুর লিপিতে তিনটি মাত্র শ্লোকে ধর্মপালের বংশ পরিচয়; প্রথম শ্লোকটিতে দয়িতবিষ্ণুর উল্লেখ, দ্বিতীয় শ্লোকে বপ্যাটের; তৃতীয় শ্লোকে বলা হইয়াছে মাৎস্যন্যায় দূর করিবার অভিপ্ৰায়ে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজলক্ষ্মীর কর গ্রহণ করাইয়াছিলেন, অর্থাৎ রাজা নির্বাচন করিয়াছিল। তাহারই পুত্র ধর্মপাল।
অভ্যুদয় ৷ বংশ পরিচয় ৷ পিতৃভূমি
এই প্রকৃতিপুঞ্জ কাহারা? প্রকৃতির অভিধানগত অর্থ প্ৰজা। কিন্তু বাঙলার তৎকালীন সমস্ত প্ৰজাবৰ্গ অর্থাৎ জনসাধারণ সম্মিলিত হইয়া গোপালকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিলেন, এমন মনে হয় না। কেহ কেহ মনে করেন, প্রকৃতি অর্থ রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান কর্মচারী এবং গোপালকে রাজা নির্বাচন তাহারাই করিয়াছিলেন। এই মতও সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ, সেই নৈরাজ্যের যুগে বাঙলাদেশে পরস্পর বিবদমান অনেকগুলি রাষ্ট্রের আধিপত্য; কোন রাষ্ট্রের প্রধান কর্মচারীরা একত্র হইয়া এই নির্বাচন করিয়াছিলেন? একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের ব্যাপারে হইলে হয়তো এইরূপ নির্বাচন সম্ভব হইতে পারিত যেমন একবার কাশ্মীরে হইয়াছিল তৃতীয় শতকে জলৌকের ক্ষেত্রে। সমস্ত প্রজাবর্গের সম্মিলিত নির্বাচনও সেই নৈরাজ্যের যুগে সম্ভব ছিল না; তাহা হইলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমস্ত—লনায়কদের সঙ্গে প্রজাবর্গের একটা প্রবল বিরোধের ইঙ্গিত কোথাও পাওয়া যাইত। বরং মনে হয়, এই সামস্ত—নায়কেরাই বহু বৎসর নৈরাজ্য ওঁ মাৎস্যন্যায়ে উৎপীড়িত হইয়া শেষ পর্যন্ত সকলে একত্র হইয়া এই নির্বাচন কার্যটি নিম্পন্ন করিয়াছিলেন। এই সামান্তু-বনায়কদের এবং সামন্তুতন্ত্রের কথা তো আগেই একাধিকার ইঙ্গিত করিয়াছি; ইহঁদের প্রভাব ও প্রতিষ্ঠা যে কম ছিল না, তাহাও বলিয়াছি। দেশে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র যখন বিদ্যমান তখনই সামন্ত-নায়কদের সংখ্যা অনেক ও নৈরাজ্য ও মাৎস্যন্যায়ের পর্বে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র যখন দুর্বল হইয়া বা ভাঙিয়া পড়িয়াছে তখন ইহাদের সংখ্যা আরও বাড়িয়াই গিয়াছে। বস্তুত, দেশ জুড়িয়া ছোট বড় এই সামন্ত-নায়কেরাই তখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ইহারা যখন দেশকে বারবার বৈদেশিক শত্রুর হাত হইতে আর বাঁচাইতে পারিলেন না, শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখিতে পারিলেন না, তখন একজন রাজা এবং একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র গড়িয়া তোলা ছাড়া বঁচিবার আর পথ ছিল না। ইহারাই গোপাল-নির্বাচনের নায়ক। যাহা হউক, এই শুভবুদ্ধির ফলে বাঙলাদেশ নৈরাজ্যের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক শত্রুর কাছে বারবার অপমানের হাত হইতে রক্ষা পাইল। শুধু বাঙলার ইতিহাসে নয়, সমগ্ৰ ভারতবর্ষের ইতিহাসেই এই ধরনের শুভ সামাজিক বুদ্ধি এবং রাষ্ট্ৰীয় চেতনার দৃষ্টান্ত বিরল। পাল রাজাদের লিপিতে এবং সন্ধ্যাকর নদীর রামচরিতে এই নির্বাচন কাহিনীর সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু ভারতীয় সাহিত্যে কোথাও তাহা যথােচিত কীর্তন ও মর্যাদা লাভ করে নাই। তবে, লোকস্মৃতিতে ইহার গৌরব ও উদ্দীপনা যোড়শ শতক পর্যস্ত জাগ্রত ছিল, তাহার, প্রমাণ তারনাথের বিবরণীতে পাওয়া যায়।
