সামাজিক ইঙ্গিত, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতি
এই মাৎসান্যায়ের সামাজিক ইঙ্গিত ধরিবার মতন সাক্ষ্য-প্রমাণ আমাদের সম্মুখে উপস্থিত নাই, কিন্তু পূর্ব ও পশ্চাতের ইতিহাসের ধারা স্ট্রইতে মোটামুটি অনুমান হয়তো একেবারে অসম্ভব নয়। প্রথমত, রাষ্ট্রের এক বিশৃঙ্খল অবস্থা বিসা-বাণিজ্যের অবস্থা খুব ভালো থাকিবার কথা নয়। ব্যাবসা-বাণিজ্যের পশ্চাতে রাষ্ট্রের যে সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা-বিন্যাস থাকা প্রয়োজন। এই যুগে তাহার কোনও সাক্ষ্যই পাওয়া যাইতেছে না; শান্তি ও শৃঙ্খলা যেখানে অব্যাহত নাই। সেখানে ব্যাবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধি কল্পনা করা কঠিন। ইহার পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, সুবর্ণমুদ্রা এমন কি রৌপ্য মুদ্রারও অপ্রচলন হইতে। বস্তুত এই যুগের কোনও প্রকার মূল্যবান ধাতব মুদ্রা বাঙলাদেশের কোথাও এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নাই। শশাঙ্ক-জয়নাগের কালে রৌপ্যমুদ্রা ছিল না, কিন্তু যত অপকৃষ্ট বা নকলই হউক না কেন, সুবর্ণমুদ্রা তো ছিল। বাঙলাদেশের মুদ্রাজগৎ হইতে সুবর্ণমুদ্রা এই যে অন্তৰ্হিত হইল মুসলমান আমলের আগে আর তাহা ফিরিয়া আসে নাই। আর একটি পরোক্ষ প্রমাণ পাইতেছি, তাম্ৰলিপ্তির ইতিহাসের মধ্যে। সপ্তম শতকের শেষ পাদেও ইৎ-সিঙ তাম্রলিপ্তি বন্দরের উল্লেখ করিতেছেন; অষ্টম শতকের সাক্ষোও, যেমন দুধপানি পাহাড়ের লিপিতো, ২/১ বার তাম্রলিপ্তির উল্লেখ পাইতেছি কিন্তু এই সব উল্লেখ হয় প্রাচীনতর স্মৃতিবহ অথবা শুধু উল্লেখই মাত্র। তাম্রলিপ্তির সেই সম্পদ-সমৃদ্ধির কথা আর কেউ বলিতেছেন না। অষ্টম শতকের শেষার্ধ হইতে উল্লেখও আর পাওয়া যাইতেছে না এবং চতুর্দশ শতকের আগে সমগ্র বাঙলাদেশের আর কোথাও বৈদেশিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের আর কোনও বন্দরই গড়িয়া উঠিল না! বস্তুত, সপ্তম শতকের চতুৰ্থপাদ হইতে অষ্টম শতকের মাঝামাঝির মধ্যে একমাত্র সামুদ্রিক বন্দর তাম্রলিপ্তির সৌভাগ্য চিরতরে ডুবিয়া গেল! সরস্বতীর প্রাচীনতর। খাত বন্ধ হওয়া ইহার একটি কারণ হইতে পারে, কিন্তু সুদীর্ঘকাল জুড়িয়া দেশব্যাপী এই অরাজকতাও অন্যতম কারণ নয়, তাহা কে বলিবে? দেশের অর্থসম্পদ ছিল না। এ কথা সত্যু নয়, কিন্তু এই অর্থসম্পদ ব্যাবসা-বাণিজ্যলব্ধ নয় বলিয়াই যেন মনে হয়- ভূমিলব্ধ, কৃষিলব্ধ সম্পদ। তিব্বতরাজ মু-তিগ-বৃৎ সান-পোর সঙ্গে ধর্মপালের সম্বন্ধের কথা আগেই বলিয়ছি; সেই সময়ও বাঙলাদেশ যথেষ্ট সম্পদশালী, শস্য ও মণিমাণিকে সমৃদ্ধ এবং এই সব শস্য ও মণিমুক্তাসম্পদ নিয়মিত তিব্বতে প্রেরিত হইত। বাৎসরিক উপটৌকন রূপে। ইহার কিছু অবশ্য অন্তর্দেশি ব্যাবসা-বাণিজ্য লব্ধ হইতে পারে, কিন্তু মোটের উপর দেশের সামাজিক ধন ক্রমশ যে উত্তরোত্তর কৃষিলব্ধ ধনে বিবর্তিত হইতেছে, এ সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। কারণ পরবর্তী পাল যুগে বাঙলার সমাজ প্রধানত কৃষি এবং গৃহশিল্পনির্ভর হইয়া পড়িয়াছে অধিকাংশই কৃষিনির্ভর, কারণ, রাষ্ট্রে কৃষক বা ক্ষেত্রকর সমাজের স্থান যদি বা উল্লিখিত হইতেছে, শিল্পী বা বণিক সমাজ পৃথকভাবে উল্লিখিত হইতেছে না। দেখা যাইবে, ভূমির চাহিদাও পরবর্তীকালে উত্তরোত্তর বাড়িয়াই যাইতেছে।
সামন্ততন্ত্র
রাষ্ট্র-বিন্যাস ব্যাপারে নূতন করিয়া কিছু বলিবার নাই; সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রায় অনুপস্থিত। তবে, এই যুগের রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হইতেছে সামন্ততন্ত্র। সর্বময় অধিরাজ কেহ সাধারণত নাই; থাকিলে তো মাৎস্যন্যায়ই হইতে পারিত না। সামন্তরাই এ যুগের নায়ক এবং সকলেই স্ব স্ব প্রধান। বঙ্গে সমতটে খড়্গ বংশীয় রাজারা রাজতন্ত্র হয়তো বজায় রাখিয়াছিলেন, কিন্তু এই রাজতন্ত্রেও সামন্তরা প্ৰবল ও পরাক্রান্ত। লোকনাথের বংশ সামন্তবংশ; সামন্ত লোকনাথেরও আবার সামন্ত ছিল। মাৎস্যন্যায়ের শেষ পর্বে এই সব সামন্ত নায়কেরাই তো একত্র হইয়া গোপালদেবকে রাজা নির্বাচিত করিয়াছিলেন। প্রকৃতিপুঞ্জ বলিতে খালিমপুর লিপি ও রামচরিত এই সব সামন্ত নায়কদেরই বুঝাইতেছে; ইহারাই ছিলেন প্রকৃতিপুঞ্জের নায়ক।
সংস্কৃতি
ধর্ম ও সংস্কৃতির কথা আগেকার রাজবৃত্ত পর্বেই বলিয়াছি। বঙ্গের খড়্গ বংশীয় রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন, এ কথা আগেই বলা হইয়াছে; তোহারা বৌদ্ধধর্মের খুব উৎসাহী পোষকও ছিলেন। আর যাহান্দের, যে সব রাজা, রাজবংশ বা সামন্তদের খবর পাওয়া ফাইতেছে, তাহারা প্ৰায় সকলেই ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী। এই একশত বৎসরের মধ্যে ভিনদেশি বা বৈপ্ৰান্তিক যে সব অভিযাত্রীরা বিরোধের মধ্য দিয়া বাঙলাদেশের সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে তিব্বতী শ্ৰং-২ সান-গ্যাম্পো এবং তাঁহার পৌত্র কি-লি-প-পু ছাড়া আর প্রায় সকলেই ছিলেন ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কারাশ্রয়ী। কিন্তু তৎসত্ত্বেও ইৎ-সিঙ ও সেং-চি’র বিবরণী পড়িলে মনে হয়, বৌদ্ধধর্মের প্রভাবও খুব কম ছিল না। কিন্তু যে ধর্মের যেরূপ প্রভাবই থাকুক না কেন, এই দুর্যোগে দুর্দিনে সকল ধর্ম ও সংস্কৃতিকেই দেশব্যাপী অনিশ্চয়তা ও অরাজকতার কিছু কিছু ফল ভোগ করিতে হইয়াছিল নিশ্চয়ই। তাহার কিছু কিছু প্ৰমাণ-পরিচয় বোধ হয় বাঙলার দুই চারিটি ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পাওয়া যায়। পাহাড়পুরে পাল-সম্রাট ধর্মপালের আমলে বৌদ্ধ সোমপুর-মহাবিহার প্রতিষ্ঠার আগে সেইস্থানে যে একটি জৈন-বিহার ছিল, এ তথা, পাহাড়পুরের পট্টোলীতেই (৪৭৮-৭৯) প্রমাণ। এই বিহারের ধ্বংসাবশেষের উপরই সোমপুর-মহাবিহার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। মহাস্থানের ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও দেখা যায়, গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগের ধ্বংসস্তুপের উপর। পরবর্তী পাল-আমলের বিহার মন্দির ইত্যাদি গড়িয়া উঠিয়াছে। নিশ্চিতভাবে বলিবার উপায় নাই, কিন্তু মনে হয়, এই সব ধ্বংসকার্য এই নৈরাজ্য ও বৈদেশিক আক্রমণের যুগেই সম্ভব হইয়াছিল। তাহা ছাড়া, বৌদ্ধধর্মের যে সমৃদ্ধ অবস্থাই য়ুয়ান-চোয়াঙ, ইৎ-সিঙ ও সেং-চি বৰ্ণনা করিয়া থাকুন না, পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যধর্ম ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করিতেছিল, সন্দেহ নাই। 1 প্রায় সমসাময়িক লোকনাথ-পট্টোলী এবং কৈলান-পট্টোলীর সাক্ষ্য এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। শত শত বৌদ্ধ সঙ্ঘ, বিহার প্রভৃতি থাকা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কার ক্রমশ জয়ী ও সর্বব্যাপী হইতেছিল। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকার গোপালের নির্বাচনের অব্যবহিত পূর্বেকার বাঙলার কথা বলিতে গিয়া বলিয়াছেন–
