ললিতাদিত্যের পৌত্র জয়াপীড় সম্বন্ধে। কলহন আর একটি গল্পের উল্লেখ করিয়াছেন। জয়াপীড় দিগ্ধিজয়ে বাহির হইয়া নিজের সৈন্যদল কর্তৃক পরিত্যক্ত হইয়া একা একা ঘুরিতে ঘুরিতে পুণ্ড্রবর্ধন নগরে আসিয়া উপস্থিত হন এবং ছদ্মবেশে এক বারাঙ্গনার গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করেন ৷ জয়ন্ত নামে এক ব্যক্তি তখন পুণ্ড্রবর্ধনের সামন্ত-রাজা; গৌড়ের রাজাদের তিনি অন্যতম সামন্ত। জয়ন্তের কন্যা কল্যাণদেবীর সঙ্গে জয়াপীড়ের প্রণয় সঞ্জাত হয় এবং তিনি তাহাকে বিবাহ করিয়া পঞ্চগৌড়াধিপতিদের পরাজিত করেন এবং জয়ন্তকে তাহাদের অধিরাজ পদে প্রতিষ্ঠিত করেন। কলহনের এই সব কাহিনীর ঐতিহাসিকত্ব সম্বন্ধে নিঃসংশয় হওয়া কঠিন; তবে মনে হয়, এই সময় গৌড়দেশ রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে বহুধা বিভক্ত ছিল এবং সর্বব্যাপী কোনও রাষ্ট্রীয় প্রভুত্বের অস্তিত্ব ছিল না, স্থানীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামঞ্জরাই নিজ নিজ স্থানে রাষ্ট্রপ্রধান হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। এই অবস্থায় বৈপ্রান্তিক পরাক্রান্ত শক্তিদের দ্বারা বারবার পর্যাদাপ্ত হওয়া
ভগদত্ত-বংশীয় হর্ষ
আনুমানিক অষ্টম শতকের দ্বিতীয় পাদে গৌড়ে আর একটি বৈপ্ৰাস্তিক অভিযানের খবর পাওয়া যায়। নেপালের লিচ্ছবিরাজ দ্বিতীয় জয়দেবের একটি লিপিতে দেখিতেছি (৭৫৯ অথবা ৭৪৮), জয়দেবের শ্বশুর (কামরূপের?)। ভগদত্তবংশীয় হর্ষ গৌড়, ওড্র, কলিঙ্গ এবং কৌশলের অধিপতি বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন।
এই সব বিচিত্র বৈপ্রান্তিক বিজয়ী সমারাভিযান বাহিরের বা বাঙলাদেশের কোনও লিপি বা অন্য কোনও স্বতন্ত্র সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা অসমর্থিত; সুতরাং ইহাদের সত্যতা সম্বন্ধে নিঃসংশয় হওয়া কঠিন। তবে, সদ্যোক্ত সমস্ত সাক্ষ্যগুলি একত্র করিলে এই তথ্যই মনকে অধিকার করে যে, এই একশত বৎসর গৌড়রাষ্ট্রে সর্বময় প্ৰভু কেহ ছিলেন না, রাষ্ট্রে কোনও সামগ্রিক ঐক্য ছিল না, এবং এই সমৃদ্ধ অথচ বহুধা বিভক্ত দেশ-পরিবার ভিন্নপ্রদেশি রাজা ও রাষ্ট্রের লোলুপ দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছিল।
চন্দ্ৰবংশ ৷ বঙ্গবীরদের অপমান
গৌড়তন্ত্রের যখন এই অবস্থা বঙ্গরাষ্ট্রের অবস্থাও যে তখন ইহার চেয়ে উন্নত ও দৃঢ় ছিল তাহা বলা যায় না। তবে, আগেকার পর্বে দেখিয়াছি, বঙ্গ ও সমতট রাষ্ট্র সপ্তম শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত খড়্গ ও রাত বংশের নায়কত্বে একটা মোটামুটি সামগ্রিক ঐক্য বাঁচাইয়া রাখিয়াছিল। ভৌগোলিক দূরত্ব এবং কতকটা অনধিগম্যতাও বোধ হয় তাহার অন্যতম কারণ। সুপ্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ও রাষ্ট্রও তাহার অন্যতম কারণ হইতে পারে। বৌদ্ধধর্মের ঐতিহাসিক। তিব্বতী লামা তারনাথের মতে খড়্গ বংশের পতনের পর বঙ্গপ্লাষ্ট্র চন্দ্ৰবংশীয় রাজাদের করায়ও হয় এবং তাহারা বঙ্গে এবং কখনো কখনো গৌড়ে, প্রায় অষ্টম শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। গোবিন্দচন্দ্র এবং ললিতচন্দ্র এই বংশের শেষ দুই রাজা। বোধ হয়। ললিতচন্দ্রর আমলেই বঙ্গ যশোবর্মর বিজয়ী সমারাভিযানের সম্মুখীন হইয়াছিল। এই রাজা যিনিই হউন, গৌড়বহের কবি বাকপতিরাজ তৎকালীন বঙ্গবীরদের পরোক্ষে খুবই সুখ্যাতি করিয়াছেন। পরাজয়ের পর বঙ্গবীরেরা যখন যশোবর্মার সম্মুখে শির অবনত করিয়াছিল তখন তাঁহাদের মুখমণ্ডল (লজ্জা ও অপমানে) রক্তহীন পাণ্ডুবৰ্ণ ধারণ করিয়াছিল, কারণ তাহারা এইরূপ পরাজয়ে (লজ্জা ও অপমান স্বীকারে) অভ্যস্ত ছিল মা (৪২০ শ্লোক)।
নৈরাজ্য ৷ মৎস্যন্যায়
তারনাথের বিবৃতিমতে ললিতচন্দ্রর মৃত্যুর পর সমগ্র বাঙলাদেশ জুড়িয়া অভূতপূর্ব নৈরাজ্যের সূত্রপাত হয়। গৌড়ে-বঙ্গে সমতটে তখন আর কোনও রাজার আধিপতা নাই, সর্বময় রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব তো নাইই। রাষ্ট্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন; ক্ষত্ৰিয়, বণিক, ব্ৰাহ্মণ, নাগরিক স্ব স্ব গৃহে সকলেই রাজা। আজ একজন রাজা হইতেছেন, রাষ্ট্ৰীয় প্রভুত্ব দাবি করিতেছেন, কাল তাহার ছিন্ন মস্তক ধূলায় লুটাইতেছে। ইহার চেয়ে নৈরাজ্যের বাস্তব চিত্র আর কী হইতে পারে!! প্রায় সমসাময়িক লিপি (যেমন, খালিমপুর লিপি) এবং কাব্যে (যেমন, রামচরিত) এই ধরনের নৈরাজ্যকে বলা হইয়াছে মাৎস্যন্যায়। রাজা নাই, অথচ সকলেই রাষ্ট্রীয় প্রভুত্বের দাবিদার। বাহুবলই একমাত্র বল, সমস্ত দেশময় উচ্ছঙ্খল বিশৃঙ্খল শক্তির উন্মুণ্ডতা; এমন যখন হয় দেশের অবস্থা, প্রাচীন অর্থশাস্ত্ৰে তাহাকেই বলে মাৎস্যন্যায়, অর্থাৎ বৃহৎ মৎস্য কর্তৃক ক্ষুদ্র মৎস্য গ্রাসের যে ন্যায় বা যুক্তি সেই ন্যায়ের অপ্ৰতিহত রাজত্ব : বৎসরের পর বৎসর বাঙলাদেশ এই মাৎসান্যায় দ্বারা পীড়িত হইয়াছিল। শেষ পর্যন্তু এই উৎপীড়ন যখন আর সহ্য হইল না। তখন সমগ্র বাঙলাদেশের রাষ্ট্রনায়কের একএ হইয়া নিজেদেরই মধ্য হইতে একজনকে অধিরাজ বলিয়া নির্বাচন করিলেন এবং তঁহার সর্বময় আধিপত্য মানিয়া লইলেন; এই রাষ্ট্রনায়ক অধিরাজটির নাম গোপালদেব! কিন্তু এই বিপ্লবগর্ভ ইতিহাস পরবর্তী পর্বের।
এই মৎস্যন্যায়ের অপ্রতিহত রাজত্ব গোপালদেবের নির্বাচনের পূর্ববর্তী কয়েক বৎসরেই শুধু আবদ্ধ নয়; এ রাজত্ব চলিয়াছিল একশত বৎসর ধরিয়া, সপ্তম শতকের মাঝামাঝি হইতে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এই পর্ব জুড়িয়াই তো বৃহৎ মৎস্য কর্তৃক বাঙলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্ররূপ মৎস্য-ভক্ষণের যুক্তি বিস্তৃত। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকার শশাঙ্কের পর হইতেই গৌড়তন্ত্র পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার সংবাদ দিতেছেন; শশাঙ্কের পর যাঁহারা রাজা হইতেছেন তাহারা কেহই পুরা এক বৎসর রাজত্ব করিতে পারিতেছেন না! শিশু নামক এক রাজার রাজত্বকালে নারীর প্রতাপ ও প্রভাব দুর্জয় হইয়া উঠিয়াছিল এবং হতভাগ্য রাজা এক পক্ষকাল মাত্র রাজত্ব করিবার পরই নাকি নিহত হন। বারবার বৈপ্ৰাদেশিক রাষ্ট্র ও রাজকর্তৃক পরাজিত পৰ্যাদাপ্ত হওয়ার কথা তো আগেই বলিয়াছি। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পে এই পর্বেই আবার পূর্বপ্রত্যন্ত দেশে এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষের খবরও পাওয়া যাইতেছে। এ সমস্ত বিবরণ একত্র করিলে মনে হয়, এই সুদীর্ঘ একশত বৎসর বাঙলাদেশে, অন্তত গৌড়ে, কোথাও কোনও সামাজিক ও রাষ্ট্ৰীয় শৃঙ্খলা বজায় ছিল না। খালিমপুর লিপিতে আছে, মাৎস্যন্যায় দূর করিবার জন্যই প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিল, কিন্তু এই প্রকৃতিপুঞ্জ মাৎস্যন্যায়ের ফলে কতদূর উৎপীড়িত হইয়াছিল তাহা এই সব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও উল্লেখের ভিতর হইতে সুস্পষ্ট ধারণা করা যায় না। অবস্থা যে খুবই শোচনীয় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল তা হাতে আর সন্দেহ কী?
