ধর্মপালের উল্লেখ তো সুস্পষ্ট, কিন্তু Draihu-dipun কে বলা কঠিন। আর একজন তিব্বত-রাজ, রলপ-চন্ (Ral-pa-can, আ ৮১৭–৮৩৬) বাঙলাদেশ জয় করিয়া একেবারে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন বলিয়া লন্দাকী-রাজবৃত্তে দাবি করা হইয়াছে। তিব্বতী ও লদাকী-রাজতরঙ্গিনীর এই সব দাবিদাওয়া কতখানি সত্য, অত্যুক্তি কতখানি আছে বা নাই, বলা কঠিন। তবে, সপ্তম শতকের মাঝামাঝি হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে নবম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত একদিকে কামরূপ-বাঙলা-বিহারকে এবং অন্যদিকে নেপাল ও কাশ্মীরকে বারবার তিব্বতী রাষ্ট্রীয় ও সামরিক পরাক্রমের সন্মুখীন হইতে হইয়াছে, সন্দেহ নাই। বঙ্গ-তিব্বত ইতিহাসের এই বিরোধ-মিলনপর্ব আজও খুব সুবিদিত নয়; তথ্য স্বল্প, অস্পষ্ট এবং অসমর্থিত। তবে, এ তথা অনস্বীকার্য যে, মাৎস্যনায়ের পর্বে একশত বৎসর ধরিয়া যে রাষ্ট্রীয় দুর্যোগে বাঙলার আকাশ সমাচ্ছন্ন তাহার খানিকটা মেঘ ও ঝড় বহিয়া আসিয়াছে তিব্বতের হিমতুষারময় পার্বত্যদেশ হইতে।
নবগুপ্ত বংশ
হৰ্ষের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে মগধ রাষ্ট্রীয় দূযোৰ্গে বিপর্যস্ত হইয়াছিল। বোধ হয়, এই বিপর্যায়ের পর্বেই মগধে এক নবগুপ্ত রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। এই বংশের প্রথম রাজা আদিত্যসেন। (গুপ্ত); ইনি মগধগুপ্তের পুত্র এবং পূর্বকথিত মহাসেনগুপ্তের প্রপৌত্র। কাজেই মগধের উপর বংশগত অধিকারের দাবি আদিত্যসেনের ছিলই। আদিত্যসেন এবং তাঁহার তিনজন বংশধর। প্রত্যেকেই স্বাধীন মহারাজাধিরাজরূপে পর পর মগধে রাজত্ব করিয়াছিলেন, প্রায় অষ্টম শতকের প্রথম পাদ পর্যন্ত। বাঙলাদেশের কোনও অংশ এই রাজবংশের করায়ও ছিল। কিনা বলা কঠিন; ছিল না বলিয়াই মনে হয়। তবে নিজেদের লিপিতে চতুঃসমুদ্র পর্যন্ত রাজ্যজয় এবং উত্তরাপথনাথ হইবার দাবি যে ভাবে জানানো হইয়াছে, তাহাতে মনে হয়, ইহাদের রাষ্ট্রীয় প্রভাব একেবারে তুচ্ছ করিবার মতন ছিল না।
শৈলাধিপত্য
এই নবগুপ্ত বংশের কোনও রাষ্ট্রীয় আধিপত্য থাকুক বা না থাকুক, অষ্টম শতকের প্রথম পাদের শেষে অথবা দ্বিতীয় পাদের প্রারম্ভেই শৈলবংশীয়কোনওরাজা পৌণ্ডদেশ, অর্থাৎ উত্তরবঙ্গ জয় করিয়াছিলেন এবং পৌণ্ডাধিপকে হত্যা করিয়াছিলেন। শেলবংশ হিমালয় উপত্যাকাবাসী; কিন্তু ইহাদের রাষ্ট্রীয় পরাক্রম বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হইয়া গুর্জর, কাশী এবং বিন্ধ্য অঞ্চল গ্রাস করিয়াছিল। কিন্তু ইহাদের পৌণ্ডাধিকার বা ইহাদের বংশ ও রাজত্ব সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যয়ায় না।
যশোবর্মা কর্তৃক মগধ-গৌড়-বঙ্গ জয়
বাঙলাদেশে এই সব বৈদেশিক আক্রমণ ও তৎসম্পূক্ত রাষ্ট্ৰীয় বিপর্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় দেখা দিয়াছিল। কনৌজরাজ যশোবর্মার মগধ এবং গৌড়াইেক্রমণ ও বিজয়ের ফলে। এই দুর্ধর্ষ বিজয়মদমত্ত রাজা, ৭২৫ হইতে ৭৩৫-র মধ্যে কোনও সময় মগধাক্রমণ করিয়া মগধরাজকে প্রথমত বিন্ধ্য পর্বতে পলাইয়া যাইতে বাধ্য করেন, পরে সন্মুখ যুদ্ধে তাহাকে নিহত এবং তাহার সৈন্য-সামশুদিগকে পরাজিত করেন। বোধ হয় মগধ জয়ের পর তিনি গৌড়রাজকেও পরাজিত ও নিহত করেন। বাকপতিরাজ তাহার সভাকবি ছিলেন এবং তিনি এই মগধ ও গৌড় বিজয়কাহিনী লইয়া গৌড়বহো নামে একটি (অসমাপ্ত?) প্রাকৃত কাব্য রচনা করিয়াছিলেন; এই কাব্যে গৌড়রাজ বধের কাহিনী যে ভাবে প্রসঙ্গক্রমে মাত্র উল্লিখিত হইয়াছে, এই সমস্ত কাহিনীটির বর্ণনা যে ভাবে করা হইয়াছে তাহাতে এই অনুমান স্বাভাবিক যে, এই সময় গৌড়ের রাজাই মগধেরও রাজা ছিলেন এবং দুইজনই এক এবং অভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন; কিন্তু তিনি কে ছিলেন বলা কঠিন। মগধ ও গৌড় বিজয়ের পর যশোবর্ম সমুদ্রতীরের দিকে অগ্রসর হন এবং বঙ্গদেশও জয় করেন। স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে, প্ৰায় সমস্ত বাঙলাদেশই তাহার নিকট মস্তক অবনতি করিয়াছিল। কিন্তু যশোবর্মা অধিকদিন তাহার এই বৈদ্যুতিক দিগ্বিজয় ভোগ করিতে পারেন নাই।
কাশ্মীর ও বাঙলা
সম্ভবত্ব ৭৩৬ খ্রীষ্টাব্দের কিছু পরই যশোবর্মা কাশ্মীররাজ মুক্তাপীড় ললিতান্দিতা কর্তৃক অত্যান্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। ললিতাদিত্য কর্তৃক উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে বহু রাজা বিজয়ের কথা কহলন রাজতরঙ্গিনী গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন। এই সব বিবরণের ঐতিহাসিকত্ব কতটুকু বলা কঠিন, তবে কহলনের বিবৃতি পাঠ করিলে মনে হয়, গৌড় কিছুদিনের জন্য হইলেও কাশ্মীরের বশ্যতা স্বীকার করিয়াছিল। গৌড়রাজকে কাশ্মীররাজের আদেশে একদল হস্তী সেনা লইয়া কাশ্মীরে যাইতে হইয়াছিল। কাশ্মীররাজ সম্বন্ধে গৌড়রাজের বোধ হয় কিছু ভীতি ও অবিশ্বাসের কারণ ছিল। সেই হেতু ললিতাদিত্য বিষ্ণুমূর্তি সাক্ষী করিয়া প্রতিজ্ঞা করেন যে, গৌড়রাজের কিছু অনিষ্ট তিনি করিবেন না। কিন্তু গৌড়রাজ কাশ্মীরে পৌছিবার পর ললিতাদিত্য এই প্ৰতিজ্ঞা রক্ষা করেন নাই; গৌড়রাজকে তিনি হত্যা করেন। একদল গৌড়বাসী এই হত্যার প্রতিশোধ মানসে তীর্থযাত্রী সাজিয়া কাশ্মীরে গমন করেন এবং ললিতাদিত্যের শপথসাক্ষী বিষ্ণুমূর্তি ও মন্দির ধ্বংস করেন। ইতিমধ্যে কাশ্মীর রাজ্যের সৈন্যরা আসিয়া গৌড়বাসীদের খণ্ড খণ্ড করিয়া কাটিয়া ফেলে। এই কাহিনীর উল্লেখের কোনও প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু এই উপলক্ষে কাশ্মীর-সন্তান কলহন গৌড়বাসীদের প্রভৃভক্তি, সাহস ও শৌর্য সম্বন্ধে যে স্তুতিবাদ কাব্যস্থ করিয়াছেন তাহা উদ্ধারযোগ্য এবং সেই জনাই এই কাহিনীর উল্লেখ। কলহন বলিতেছেন; গৌড়বাসীরা এই ব্যাপারে যাহা করিয়ছিল তাহা স্বয়ং সৃষ্টিকর্তারও অসাধ্য বলিলে কিছু অত্যুক্তি হয় না (৩৩২ শ্লোক)। ( কলহনের সময়েও) রামস্বামীর মন্দিরটি যেমন একদিকে দেবতাশূন্য হইয়া পড়িয়াছে, তেমনই সেই গৌড়বীরদের অপূর্ব যশোগানে সমগ্র পৃথিবী পরিপূর্ণ হইয়া আছে (৩৩৫ শ্লোক)।
