ইহার সামাজিক অর্থ
এই প্রসঙ্গের আলোচনার প্রয়োজন হইল। শশাঙ্ক-চরিত্রের কলঞ্চ-মুক্তির চেষ্টায় নয়, ইহার সামাজিক ইঙ্গিত উদঘাটনের জন্য। বাঙালী জনসাধারণের ইতিহাসের দিক হইতে শশাঙ্ক-চরিত্র রাহুমুক্ত হইল কি না হইল, সে প্রশ্ন অবান্তর; সে প্রশ্ন একান্তই ব্যক্তিক। কিন্তু, এই প্রসঙ্গ তাহা নয়। শশাঙ্ক যদি বৌদ্ধ-বিদ্বিষ্ট হইয়া থাকেন তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, তাহার বা তাহার রাষ্ট্রের সামাজিক সমগ্রতা সম্বন্ধে সচেতনতা ছিল না, ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্ব ছিল এবং সমাজের একটা অংশ, যত ক্ষুদ্র বা বৃহৎই হউক, রাষ্ট্রের পোষকতা লাভ করিতে পারে নাই। যদি শশাঙ্ক বৌদ্ধ-বিদ্বিষ্ট না হইয়া থাকেন তাহা হইলে এই স্বীকৃতি মিথ্যা হইয়া যাইবে না, কারণ, এই প্রসঙ্গের সূচনায় আমি দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছি, সুদীর্ঘ দেড়শত বৎসর ধরিয়া কোনও রাষ্ট্র বা রাজবংশই সমসাময়িক বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির কোনও পোষকতা করেন নাই; অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতি তাঁহাদের অবারিত কৃপা লাভ করিয়াছে এবং তঁহাদের সকলেরই আশ্রয় ঐ ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতি।
০৬. মাৎস্যন্যায়ের শতবৎসর ॥ আ ৬৫০-৭৫০ খ্ৰীষ্টাব্দ ৷ তিব্বত ও বাঙলা
৬৪৬ বা ৬৪৭ খ্ৰীষ্টাব্দে হর্ষবর্ধনের মৃত্যু হইল। তাহার মৃত্যুর পর চীনা-পুরাণের মতে ন-ফু-টি ও-লো-ন-সুয়েন (অর্জন বা অরুণাশ্ব) নামে তি-ন-ফু-তি বা তীর-ভূক্তির (তিরহুত) শাসনকর্তা পুষ্যভূতি সিংহাসন দখল করেন। অর্জন বা অরুণাশ্ব মগধে হর্ষবর্ধনের নিকট প্রেরিত এক চীনা রাজদূত ওয়াঙ-হিউয়েনৎ-স্যের সমস্ত সাঙ্গোপাঙ্গোদের হত্যা করেন। রাজদূত নেপালে পলাইয়া গিয়া সে-দেশ ও তিব্বত হইতে একদল সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং ভারতবর্ষে ফিরিয়া আসিয়া অরুণাশ্বের রাজধানী (বোধ হয় মগধ) ও অন্যান্য বহু প্রাচীর-বেষ্টিত নগর ধ্বংস করেন; অরুণাশ্বকেও বন্দী করিয়া চীনদেশে লইয়া যান। কামরূপরাজ ভাস্করবর্মর সাহায্যও তিনি লাভ করিয়াছিলেন বলিয়া চীনা-ইতিহাসে বর্ণিত আছে। এই ঘটনা বোধ হয় ঘটিয়াছিল ৬৪৮-র গোড়ায় বা শেষে, কিন্তু চীনা রাজবৃত্ত বর্ণিত এই কাহিনী কতদূর বিশ্বাসযোগ্য বলা কঠিন। তবে, এ তথ্য নিঃসংশয় যে, হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর পূর্ব ভারতের রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলার সুযোগে চীন-তিব্বত-কামরূপের লোলুপ দৃষ্টি এইদিকে আকৃষ্ট হইয়াছিল এবং তিব্বতরাজ শ্ৰং-ৰহসন-গ্যাম্পে (৬০০-৬৫০) ভারতীয় রাষ্ট্রীয় আবর্তে বহুখ্যাত তিব্বতী বৌদ্ধ যোগদান করিয়াছিলেন। এই নরপতি আসাম ও নেপাল এবং ভারতবর্ষের বহুস্থান জয় করিয়াছিলেন কলিয়া দাবি করা হইয়াছে। মনে হয়, এই দাবি একেবারে নিরর্থক নয়। গ্যাম্পোর আমল হইতে আরম্ভ করিয়া নেপাল তো প্রায় দুইশত বৎসর তিব্বতের অধীন ছিল। কামরূপে ভাস্করবর্মার রাজবংশ এক ম্লেচ্ছ।রাজ কর্তৃক বিনষ্ট হইয়াছিল, এ তথ্যও সুবিদিত। এই ম্লেচ্ছ।রাজ গ্যাম্পো হওয়া বিচিত্র নয়, অথবা, গ্যাম্পোর মতই ভোট-ব্রহ্মীয় কোনও নরপতিও হইতে পারেন। কামরূপের শালস্তম্ভ ও তদবংশীয় রাজারা যে ভোট-ব্ৰহ্ম নরগোষ্ঠীরই প্ৰতিনিধি, এ সম্বন্ধে সন্দেহ কি? গ্যাম্পো ৬৫৩ খ্ৰীষ্টাব্দে তনুত্যাগ করেন এবং তাঁহার পৌত্র কি-লি-প-পু (৬৫০-৬৭৯) তিব্বতের অধিপতি হন। তিনিও দিগ্নিজয়ী বীর ছিলেন এবং মধ্য ভারত পর্যন্ত তাঁহার রাষ্ট্ৰীয় প্রভাব বিস্তৃত ছিল। ৭০২ খ্ৰীষ্টাব্দে নেপাল ও মধ্য ভারত তিব্বতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, কিন্তু এই বিদ্রোহ বোধ হয় রাষ্ট্ৰীয় উদ্দেশ্য সফল করিতে পারে নাই। কারণ, ৭১৩ হইতে ৭৪১ খ্ৰীষ্টাব্দের মধ্যে কোনও সময়ে তিব্বতী ও আরবীদের বিরুদ্ধে সহায়তা প্রার্থনা করিয়া মধ্য ভারত হইতে এক দৌত্য চীন রাজসভায় প্রেরিত হইয়াছিল বলিয়া চীন-রাজবৃত্তে বর্ণিত আছে। চীনা ইতিহাসের মধ্য-ভারত সাধারণত বর্তমান বিহার অঞ্চলকেই বুঝায়, অন্তত এই যুগে। যাহা হউক, এই সব রাষ্ট্ৰীয় উপপ্লবের ঢেউ বাঙলাদেশে আসিয়াও লাগিয়াছিল সন্দেহ নাই। তিব্বত রাষ্ট্রের ভীতিশঙ্কাময় প্রভাব বহুদিন ভারতবর্ষে, বিশেষত কাশ্মীর, কামরূপ, নেপাল এবং বাঙলাদেশে সক্রয় ছিল বলিয়া মনে হয় এবং সম্ভবত শুধু সপ্তম শতকেই নয়, সপ্তম-অষ্টম শতক এবং নবম শতকের কিয়দংশ জুড়িয়া বাঙলাদেশকে বারবার তিব্বতী অভিযানে বিব্রত ও পযুদস্ত হইতে হইয়াছিল, এমন কি পাল-সম্রাট ধর্মপাল সিংহাসনে আরোহণ করিবার পরও। নারায়ণপালের রাজত্বকালেও একাধিক তিব্বতী সামরিক অভিযান বাঙলাদেশের বুকের উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছে। তিব্বতরাজ খ্ৰী শ্ৰং-লদে বৎসন (Khere-strong-lde-tsan 755-97) ভারতবর্ষ জয়ের দাবি করিয়াছেন। তাহার পুত্র মুক্তিগ-বৎ সনা-পো (Mu-tig-Btsen-po)ও ভারতবর্ষে বিজয়বাহিনী প্রেরণ করিয়াছিলেন :
in the south the Indian kings there established the Raja Dharma-dpal and Drahu-dpun, both waiting in their lands under order to shut up their armies yielded the Indian kingdom in subjection to Tibet; the wealth of the Indian country, gems and all kinds of excellent provisions, they punctually paid. The two great kings of India, upper and lower, out of kindness to themselves (or in obedience to him), pay honour to commands.
