শশাঙ্কের বৌদ্ধ বিদ্বেষ?
বৌদ্ধধর্ম ও অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান, বৌদ্ধ সংস্কৃতি সম্বন্ধে রাষ্ট্রের এই নেতিবাচক ঔদাসীন্য কি কখনো কখনো ইতিবাচক বিদ্বেষ ও শক্রতায় রূপান্তরিত হইয়াছিল? কোথাও কি তাহার কোনও ইঙ্গিত আছে? য়ুয়ান-চোয়াঙ কিন্তু ইঙ্গিত শুধু নয়, সুস্পষ্ট অভিযোগই করিয়াছেন শশাঙ্কের বৌদ্ধ-বিদ্বেষ ও শত্ৰুতা সম্বন্ধে। শশাঙ্ক নাকি একবার কুশীনগরে এক বিহারের ভিক্ষুদের বহিষ্কার করিয়া দিয়াছিলেন, পাটলিপুত্রে বুদ্ধপদাঙ্কিত একখণ্ড প্রস্তর গঙ্গাগর্ভে নিক্ষেপ করিয়াছিলেন, বুদ্ধগয়ার বোধিদ্রুম কাটিয়া ফেলিয়া উহার মূল পর্যন্ত ধ্বংস করিয়া পুড়াইয়া দিয়াছিলেন, একটি বুদ্ধমূর্তি সরাইয়া সেখানে শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করিতে চাহিয়াছিলেন এবং সাধারণভাবে বৌদ্ধধর্মের প্রভূত অনিষ্ট সাধন করিয়াছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যু সম্বন্ধেও যুয়ান-চেয়াঙ একটি অলৌকিক কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছেন; সেই প্রসঙ্গেও শশাঙ্কের বৌদ্ধ-বিদ্বেষ এবং তাহার ফলে শশাঙ্কের শাস্তির প্রতি ইঙ্গিত আছে। বোধিদ্রুম ধ্বংস ও এই মৃত্যু-কাহিনীর প্রতিধ্বনি মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প গ্রন্থেও আছে। যুয়ান-চায়াঙ বৌদ্ধ শ্রমণ, আংশিকত হর্ষবর্ধনের প্রসাদ প্রার্থী এবং সেই হেতু শশাঙ্কের প্রতি বিদ্বিষ্ট হইয়া থাকিতে পারেন। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পও বৌদ্ধ লেখকের রচনা এবং বৌদ্ধসমাজে প্রচলিত গ্রন্থ। কাজেই এ বিষয়ে ইহাদের সাক্ষ্য প্রামাণিক বলিয়া স্বীকার করা একটু কঠিন, বিশেষত য়ুয়ান-চোয়াঙের সাক্ষ্য। শশাঙ্ক-হৰ্ষবর্ধন বা শশাঙ্ক-বৌদ্ধধর্ম ব্যাপারে এই বিদেশী শ্ৰমণ সর্বত্র হয়তো অপক্ষপাত দৃষ্টির পরিচয় দিতে পারেন নাই। তবু, একটু আগেই ষষ্ঠ-সপ্তম শতকের রাজবংশের ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের ঔদাসীন্য এবং সঙ্গে সঙ্গে ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি ঐকাস্তিক শ্রদ্ধা ও অনুরাগের যে সংক্ষিপ্ত যুক্তি আমি উপস্থিত করিয়াছি তাহার পটভূমিকায় শশাঙ্কের বৌদ্ধ বিদ্বেষ কাহিনী একেবারে নিছক অনৈতিহাসিক কল্পনা, এমন মনে হয় না। য়ুয়ান-চোয়াঙ যে সব ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন তাহার মধ্যে অত্যুক্তি প্রচুর, সন্দেহ নাই; কিন্তু মোটামুটিভাবে এ কথা উড়াইয়া দেওয়া যায় না যে, শশাঙ্ক বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন এবং বৌদ্ধধর্মের প্রভূত ক্ষতিও করিয়াছিলেন। কিছুটা সত্য কোথাও না থাকিলে য়ুয়ান-চোয়াঙ বারবার একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করিয়া গিয়াছেন, একথা মনে করা একটু কঠিন। এমন কি, তিনি যখন বলিয়াছেন, কর্ণসুবর্ণরাজ কর্তৃক বৌদ্ধধর্মের ক্ষতির খানিকটা পূরণ এবং ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যই হৰ্ষবর্ধনের সিংহাসনারোহণ প্রয়োজন, বোধিসত্ত্ব হর্ষকে তাহাই বুঝাইয়াছিলেন, তখন মনে হয়, খুব জোর দিয়াই য়ুয়ান-চোয়াঙ শশাঙ্কের বৌদ্ধ-বিদ্বেয্যের কথা বলিতেছেন। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের লেখকও এক জায়গায় শশাঙ্ককে দুষ্কর্মকারী এবং চরিত্রহীন বলিয়াছেন; বৌদ্ধলেখক বৌদ্ধধর্মবিদ্বেষীর সম্বন্ধে খুব সংযত ভাষা ব্যবহার করিতে পারেন নাই, একথা অনস্বীকার্য; কিন্তু কোথাও সত্যের বীজ একটু সুপ্ত না থাকিলে শতাব্দীর লোকস্মৃতিই – বা এই ইঙ্গিত ধরিয়া রাখিবে কেন?
শশাঙ্কের বৌদ্ধ-বিদ্বেষের কারণ অনুমান সহজেই করা যায়। প্রথমত, এই যুগে ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতি ক্রমশ বিস্তার লাভ করিতেছিল বাঙলাও আসামের সর্বত্র; তাস্থার নানা সাক্ষ্য-প্রমাণ আগেই উল্লেখ করিয়াছি। কোনও কোনও রাজবংশ, এই নবধর্ম ও সংস্কৃতির গোড়া পোষক ও ধারক হইবেন, ইহা কিছু অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত, যে সব উচ্চকোটি শ্রেণীসমূহের মধ্যে এই ধর্ম ও সংস্কৃতি বিস্তারলাভ করিতেছিল। সেই সব শ্রেণীই তো রাষ্ট্রের প্রধান ধারক ও সমর্থক; কাজেই, তঁহাদের ধর্ম ও সংস্কৃতির ধারক ও সহায়ক হইবে রাষ্ট্র, ইহা আর বিচিত্র কী? এই যুগের সকল রাজবংশই তো ব্ৰাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কারাশ্রয়ী। দ্বিতীয়ত, শশাঙ্কের অন্যতম প্রধান শত্রু হর্ষবর্ধন বৌদ্ধধর্মের অতি বড় পোষক; শত্রুর আশ্রিত ও লালিত ধর্ম নিজের ধর্ম না হইলেও তাহার প্রতি বিদ্বেষ স্বাভাবিক। যুয়ান-চোয়াঙ শশাঙ্কের অপকীর্তি যে সব স্থানের সঙ্গে যুক্ত করিয়াছেন, তাহার প্রত্যেকটির অবস্থিতি বাঙলার বাহিরে। অন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ বিদ্যমান থাকাও অসম্ভব নয়, যথা বাণিজ্যে বৌদ্ধদের প্রতিপত্তি। তৃতীয়ত, বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ও বর্ধিষ্ণু অবস্থা হয়তো ব্ৰাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী রাজার খুব রুচিকর ছিল না। য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণী পাঠে মনে হয়, বাঙলার পাচটি বিভাগেই বৌদ্ধধর্ম ও অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব, প্রসার ও প্রতিপত্তি যথেষ্টই ছিল শশাঙ্কের সময়ে এবং পরেও } সেই যুগে এবং পারিপার্শ্বিক ধর্ম ও সংস্কৃতির অবস্থা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবস্থার পরিবেশের মধ্যে শশাঙ্কের বৌদ্ধবিদ্বেষী হওয়া খুব বিচিত্র বলিয়া মনে হয় না। ভারতবর্ষের অনেক স্থানে এই সময় বৌদ্ধ-চিন্তা ও সংস্কৃতির প্রতি একটা বিরূপ মনোবৃত্তি গড়িয়া উঠিতেছিল, এরূপ ইঙ্গিত দুর্লভ নয়। তবে, কী উপায়ে এবং কতটুকু অনিষ্ট তিনি করিতে পারিয়াছিলেন এ সম্বন্ধে য়ুয়ান-চোয়াঙ পক্ষপাতশূন্য মত দিয়ে পারিয়াছেন, স্বীকার করা কঠিন। খুব কিছু অনিষ্ট যে করিতে পারেন নাই তাঁহা তো যুয়ান-চোয়াঙ ও ইৎসিঙের বিবরণীতেই সুস্পষ্ট। তাহা হইলে শশাঙ্কের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে য়ুয়ান-চোয়াঙ এবং ৫০ বৎসর পরে ইৎসিঙ বাঙলাদেশে বৌদ্ধধর্মের এতটা সমৃদ্ধি দেখিতে পাইতেন না।
