রাষ্ট্র ও সামাজিক ধন
সুবৰ্ণমুদ্রার এই প্রচলন এই যুগেও দেখা যাইতেছে-বঙ্গ, সমতট এবং গৌড় প্রত্যেক রাষ্ট্রেই। কিন্তু সুবর্ণমুদ্রার সেই নিকষোন্তীর্ণ সুমুদ্রিত রূপ আর নাই; নকল মুদ্রার প্রচলনও আরম্ভ হইয়াছে। রৌপ্য মুদ্রা তো একেবারেই নাই। ইহার ঐতিহাসিক ইঙ্গিত অন্যত্র ধরিতে চেষ্টা করিয়াছি (ধনসম্বল অধ্যায়ে মুদ্রাপ্রসঙ্গ); এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট যে, বৈদেশিক ব্যাবসা-বাণিজ্যের বিবর্তন মুদ্রার এই অবনতির অন্যতম কারণ হইতেও পারে। রাষ্ট্রও যেন সামাজিক ধনোৎপাদনের দিকে এই যুগে খুব বেশি দৃষ্টি রাখে নাই; কর্মচারী তন্ত্রের বিস্তৃতি এবং বিচিত্ৰ পদনাম ও বিভাগ বিশ্লেষণ করিলে মনে হয়, উৎপাদিত ধনের বণ্টন-ব্যবস্থার দিকেই রাষ্ট্রের ঝোকটা যেন বেশি! কৃষিসমাজ এবং ব্যাপারী-ব্যবহারী সমাজের কিছু কিছু খবর পাওয়া যাইতেছে, কিন্তু রাষ্ট্রে বিশেষভাবে কাহারও প্রাধান্য দেখা যাইতেছে না, অন্তত তেমন কোনও সাক্ষ্য উপস্থিত নাই। বাণিজ্য-ব্যাবসায় ব্যাপারে যেন একটু মন্দা পড়িয়াছে; মহত্তর-গ্রামিক কুটুম্বদের প্রতিপত্তি বাড়িতেছে। এই যুগেই ভূমির চাহিদা বাড়িতে আরম্ভ হইয়াছে এবং সমাজ ক্রমশ ভূমি নির্ভর হইয়া পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। পাল ও সেন আমলে দেখা যাইবে, বাণিজ্য-ব্যাবসায়ে, বিশেষত বহির্বাণিজ্যে একেবারেই মন্দা পড়িয়া গিয়াছে এবং সমাজ উত্তরোত্তর ভূমি ও কৃষিনির্ভর হইয়া পড়িয়াছে। বাৎস্যায়নের আমলে নাগর-সমাজকেই যেমন সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদর্শ বলিয়া তুলিয়া ধরা হইয়াছিল— সওদাগরী ধনতন্ত্রের প্রকৃতিই নগরকেন্দ্ৰিক—এই আমলে সেই আদর্শে যেন একটু ভাটা পড়িতে আরম্ভ হইয়াছে। ভূমি ও কৃষিনির্ভরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমাজ যেন ক্রমশ গ্রামকেন্দ্ৰিক হইবার লক্ষণ প্রকাশ করিতেছে; কৃষিনির্ভর সমাজের প্রকৃতিই তো গ্রামকেন্দ্ৰিক। কিন্তু এই প্রকৃতি এখনও সুস্পষ্ট হইয়া দেখা দেয় নাই; কোটালিপাড়ার পট্টোলীগুলিতে তাহার ক্ষীণ আভাস মাত্র পাওয়া যাইতেছে। একশত বৎসর পরে তাহা একেবারে সুস্পষ্ট হইয়া দেখা দিবে।
ধর্ম ও সংস্কৃতি
এই যুগের বঙ্গ ও সমতটের রাজারা সকলেই ব্ৰাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী; রাত-বংশ ও আচার্য শীলভদ্রের পিতৃবংশও ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী; লোকনাথের সামন্ত-বংশও তোহাই। শশাঙ্ক ছিলেন। শৈব; তৎপ্রচলিত মুদ্রা এবং যুয়ান-চোয়াঙের বিবরণই তাহার প্রমাণ! নিধনপুর-শাসনের সাক্ষ্যে ভাস্করবর্মাকেও শৈব বলা যাইতে পারে। সমাচার দেবের রাজত্বকালে বলি-চরু-সত্ৰ প্রবর্তনের জন্য জনৈক ব্রাহ্মণ রাজকীয় ভূমিদানি গ্রহণ করিয়াছিলেন। বস্তুত, ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্ৰ, সমাচারদেব, জয়নাগ বা লোকনাথের আমলের যে-কয়টি ভূমিদানি লিপি এ পর্যন্ত পাওয়া গিয়াছে তাহার প্রত্যেকটিই ব্ৰাহ্মণদের ভূমিদান সম্পর্কিত পট্টোলী এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের পোষকতার প্রমাণ। চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের রাজকীয় লিপিগুলিতে দেখিয়াছি, বিভিন্ন নামে ও রূপে বিষ্ণু ক্রমশ পূজা ও সমাদর লাভ করিতেছেন; মহারাজ বৈন্যগুপ্ত মহাদেব-ভক্ত ছিলেন এবং পুণ্ড্রবর্ধনে পঞ্চম শতকে বুধগুপ্তের আমলেই নামলিঙ্গ পূজা প্রবর্তিত হইয়াছিল। এই যুগে, অর্থাৎ ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে গৌড়ে-কামরূপেও শৈবধর্ম বিস্তারুলাভ করিয়াছে; উভয়স্থানেই রাজা শৈব। কিন্তু বিষ্ণু এবং কৃষ্ণধৰ্মই অধিক প্রচলিত বলিয়া মনে হয়। পাহাড়পুরের মন্দির-প্রাচীরে সপ্তম-অষ্টম শতকের যে সব মৃৎ ও প্রস্তরচিত্র দেখা যায় তাহাতে মনে হয়, কৃষ্ণলীলার যমলার্জন, কেশীবধ, কৃষ্ণ-বলরামের সঙ্গে কংসরাজের মল্লদের যুদ্ধ, গোবর্ধনধারণ, গোপবালকদের সঙ্গে কৃষ্ণ-বলরাম, কৃষ্ণকে লইয়া বাসুদেবের গোকুলে গমন, গোপীলীলা প্রভৃতি কাহিনী ইতিমধ্যেই বাঙলাদেশে সুপ্রচলিত হইয়াছিল। রাজবংশের মধ্যে একমাত্র খড়্গ রাজারাই ছিলেন বৌদ্ধ; আর কোথাও বৌদ্ধধর্ম রাজকীয় পোষকতা লাভ করিতে পারে নাই।
ষষ্ঠ শতকের গোড়ায় গুণাইঘর লিপির (৫০৭-৮) সাক্ষ্যে দেখিয়াছিলাম, বৌদ্ধধর্ম ত্রিপুরা অঞ্চলে রাষ্ট্র ও রাজবংশের পোষকতা লাভ করিতেছে। প্রায় দেড় শত বৎসর এই ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি বাঙলার কোনও রাষ্ট্রের কোনও অনুগ্রহ বা সমর্থন দেখা যায় না, তাহার পর সপ্তম শতকের শেষপাদে দেখিতেছি, বৌদ্ধধর্ম আবার রাষ্ট্র ও রাজবংশের পোষকতা ও সমর্থন লাভ করিতেছে। খড়্গ বংশই বৌদ্ধরাজবংশ; রাজারা সকলেই পরম সুগত, কাজেই এই পোষকতা খুবই স্বাভাবিক। লক্ষণীয় এই যে, এই পোষকতা ঢাকা-ত্রিপুরা অঞ্চলেই যেন সীমাবদ্ধ; কালপ্রান্তিক দুইটি সাক্ষাই বঙ্গ ও সমতটে ৷ আশ্চর্য হইতে হয় এই ভাবিয়া যে, এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে গৌড়ে বা বাঙলার অন্য কোনও স্থানে বৌদ্ধ বা জৈনধর্ম ও সংস্কৃতি কোথাও রাষ্ট্রের কোনোপ্রকার স্বীকৃতি ও সমর্থন লাভ করিতেছে, এমন একটি দৃষ্টান্তও এ পর্যন্ত জানা যায় নাই। অথচ, অন্যদিকে এই যুগের সব কয়টি রাজবংশই ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কারাশ্রয়ী এবং এই ধর্ম ও সংস্কৃতি সমানেই রাজকীয় সমর্থন ও পোষকতা লাভ করিতেছে; ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর পূজা প্রসারিত হইতেছে—খেড়গ বংশীয় বৌদ্ধরাজত্বেও এবং বৌদ্ধ-রাজমহিষী প্ৰভাবতী দেবীর পোষকতায়ও তাহা হইয়াছে – পৌরাগিক গল্পকথা প্রচারিত হইতেছে। এই যুগের রাষ্ট্র ও রাজবংশ বৌদ্ধ (বা জৈন) ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে যে খুব শ্রদ্ধা ও অনুগ্রহপরায়ণ ছিলেন এমন মনে হয় না; অথচ দেশে বৌদ্ধ অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের কিছু অপ্রতুলতা ছিল, এমন নয়। জনসাধারণের বেশ একটা অংশ বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কারাশ্রয়ী ছিল; য়ুয়ান-চোয়াঙ, ইৎ-সিঙ এবং সং-চি’র বিবরণ এবং আস্রফপুর লিপির সাক্ষ্যেই তাহা সুস্পষ্ট। ধৰ্মকৰ্ম-অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যাইবে।
