সামাজিক ইঙ্গিত ৷ আমলাতন্ত্র
এই যুগের স্বাধীন গৌড়-রাষ্ট্রের আদর্শ ছিল গৌড়তন্ত্র গড়িয়া তোলা; শশাঙ্কের কর্মকীর্তি এবং মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের সাক্ষ্য এবিষয়ে প্রমাণিক বলিয়া স্বীকার করিতে আপত্তি হইবার কারণ নাই।
চাহিয়াছিলেন তাহা তো আগেই আমরা দেখিয়াছি। কিন্তু বঙ্গে-সমতটে এবং গৌড়িতন্ত্রে রাষ্ট্রের সামাজিক আদর্শ কী ছিল তা এখন একটু দেখিবার চেষ্টা করা যাইতে পারে; রাষ্ট্রের গঠন-বিন্যাস এবং পরিচালনা-পদ্ধতি গুপ্ত-আমলের মতই ছিল বলিয়া মনে হয়; রাষ্ট্র-বিভাগ এবং রাজকর্মচারীদের যে-ইঙ্গিত সমসাময়িক লিপিগুলিতে পাওয়া যাইতেছে তাহার দ্বারা এই অনুমান সমর্থিত হয়। এই যুগে নূতন একটি রাষ্ট্র বিভাগ, বীথীর নাম শুনা যাইতেছে, অন্তত বঙ্গে-সমতটে; ভুক্তি এবং বিষয়-বিভাগের মতো বীথী-বিভাগেরও একটি অধিকরণ থাকিত। ভুক্তির যিনি উপরিক বা শাসনকর্তা থাকিতেন। তঁহার মর্যাদা এই যুগে ক্রমশ যেন বাড়িয়া যাইবার দিকে। তাহাকে কখনো কখনো মহারাজ বলা হইয়াছে, যেমন গুপ্ত—আমলেও বলা হইত; কিন্তু কখনো কখনো নূতন উপাধি তাহার উপর অর্পিত হইয়াছে। যেমন, সমাচার দেবের কৃপালা-পট্টোলীতে ভুক্তির শাসনকর্তকে বলা হইয়াছে, “ পৌরোপকারিক-ব্যাপারপরমহাপ্ৰতীহার ” শশাঙ্কের অন্যতম মেদিনীপুর লিপিতেও দণ্ডভুক্তির শাসনকর্তাকে বলা হইয়াছে মহাপ্ৰতীহার; সমাচার দেবের ঘুগ্রাহাটি-লিপিতে উপরিক জীবদ্যুত্তকে অধিকন্তু বলা হইয়াছে অস্তুরঙ্গ। মনে হয়, ভুক্তি-উপরিকের ক্ষমতা এই যুগে বাড়িয়াছে। তাহা ছাড়া, মল্লসরুল-পট্টোলীতে (গোপচন্দ্রের আমল) অনেক নূতন নূতন রাজপুরুষের নামের দীর্ঘ তালিকা সর্বপ্রথম পাওয়া যাইতেছে; এই সব নাম ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্রিয়াকর্তব্য সম্বন্ধে রাষ্ট্র-বিন্যাস অধ্যায়ে বিস্তৃতভাবে বলা হইয়াছে, কিন্তু এখানে এ-কথা নির্দেশ করা প্রয়োজন যে, এই নূতন নূতন রাজপুরুষ এবং রাজকর্মবিভাগ সৃষ্টি একেবারে অর্থহীন নয়; ইহার সামাজিক ইঙ্গিত লক্ষণীয়। স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে, রাষ্ট্ৰীয় স্বাতন্ত্র্য লাভের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র অনেক বেশী আত্মসচেতন হইয়াছে, নূতন নূতন সামাজিক দায় ও কর্তব্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করিতেছে। ইহার পর হইতে এই সচেতনতা ও স্বীকৃতি ক্রমশ বাড়িয়াই যাইবে এবং তাহার পূর্ণতর রূপ দেখা যাইবে পাল-আমলে, পূর্ণতম রূপ সেন ও বর্মণবংশীয় রাজাদের আমলে। যাহা হউক, বিস্তৃত কর্মচারীতন্ত্র (এখন আমরা যাহাকে বলি আমলাতন্ত্র) রচনার সূত্রপাত এই যুগেই প্রথম দেখা যাইতেছে। ছোটখাট সামাজিক দায় ও কর্তব্য সম্বন্ধেও রাষ্ট্র সচেতন হইতেছে; সমাজের অভ্যন্তরেও রাষ্ট্র-হস্ত সম্প্রসারণের চেষ্টা চলিতেছে; আগে যাহা ছিল পল্লী বা স্থানীয় সুগ্নয়নের অন্তর্গত তাহা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রর বৃক্ষগত হইতেছে,এই ইঙ্গিত কিছুতেই অবহেলা করিবার নয়।
বিষয়াধিকরণ যাঁহারা গঠন করিতেছেন তাহাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠী-সার্থবাহ-কুলিকদের দেখিতেছি। না; পরিবর্তে পাইতেছি মহত্তর এবং ব্যাপারী বা ব্যবহারী প্রভৃতিদের। মহত্তরেরা স্থানীয় প্রধান, ব্যাপারী-ব্যবহারীরা তো স্পষ্পটতই শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি। দেখা যাইতেছে, রাষ্ট্রে শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ীদের আধিপত্য এখনও বিদ্যমান; তবে সে-আধিপত্য এখন অন্যান্য স্থানীয় প্রধানদের সঙ্গে ভাগ করিয়া ভোগ করতে হইতেছে, অথবা এমনও হইতে পারে, যে-অঞ্চলের বিষয়াধিকরণে এই গঠন-বিন্যাস পাওয়া যাইতেছে সেই অঞ্চলে এই সমাজের নির্বাধ নিরবচ্ছিন্ন প্রাধান্য ছিল না। মল্লসারল-লিপিতে বীর্থী-অধিকরণ গঠন-বিন্যাসেরও সংবাদ পাওয়া যাইতেছে; এই অধিকরণটি গঠিত হইয়াছিল। একজন বাহনায়ক এবং মহত্তর, অগ্রহরী ও খড়গীদের লইয়া। বাহনায়ক পথঘাট-যানবাহনের কর্তা এবং রাজপুরুষ বলিয়াই মনে হয়। অগ্রহারীরা বোধ হয় (যে-সব ব্রাহ্মণ ব্রহ্মোত্তর ভূমি ভোগ করিতেন। তঁহাদের, এক কথায় ব্রাহ্মণদের প্রতিনিধি অথবা অগ্রহার-ভূমি বা গ্রামের শাসনকর্তা। মহত্তরেরা স্থানীয় প্রধান প্রধান গৃহস্থ। খাড়গীি কাহারা বুঝা কঠিন, তবে পরবর্তী কালের খড়্গগ্রাহী এবং খড়গী বোধ হয় একই শ্রেণীর রাজপুরুষ। শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি এই বীথী-অধিকরণে দেখিতেছি। না, অথচ বীথীটি বর্তমান বর্ধমান জেলায় অবস্থিত ছিল। এই গ্রামে কি এই সম্প্রদায়ের প্রাধান্য ছিল না? গ্রামের বা গ্রামসমূহের অধিকাংশ ব্রাহ্মণই কি ব্রহ্মোওর ভোগ করতেন? বাহনায়ককে দেখিয়া মনে হয়, এই বীথীর পথঘাট নদী-নালা দিয়া নৌকো, শকট, পশু ইত্যাদির যাতায়াত খুব বেশিই ছিল; ইহার কিছু তো নিশ্চয়ই ব্যাবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত, এ সম্বন্ধে সন্দেহ কি?
সামন্ততন্ত্র
এই যুগে রাষ্ট্রের আর একটি বৈশিষ্ট্যও লক্ষ্য করিবার মতন। বাঙলাদেশে এই আমলেই পুরাপুরি সামন্ত্রতন্ত্র রচনারও সূত্রপাত দেখা যায়। শশাঙ্কের জীবনই তো আরম্ভ হইয়াছিল। মহাসামন্তরূপে; বোধ হয় তিনি গুপ্তদেরই মহাসামন্ত ছিলেন। তাহা ছাড়া, মেদিনীপুরে প্রাপ্ত শশাঙ্কের একটি লিপিতে দণ্ডভুক্তির শাসনকর্তা সামন্ত-মহারাজ সোমদত্তের উল্লেখ পাইতেছি; সোমদত্ত বোধ হয় আগে দণ্ডভুক্তির রাজা ছিলেন; দণ্ডভুক্তি শশাঙ্ক কর্তৃক বিজিত হইবার পর তিনি হয়তো সমস্ত শাসনকর্তা রূপে উহার উপরিক নিযুক্ত হন। কঙ্গোদেব শৈলোদ্ভব বংশীয় মহারাজ দ্বিতীয় শ্ৰীমাধবরাজও শশাঙ্কের একজন মহাসামন্ত ছিলেন। তিনিও বোধ হয় শশাঙ্ক কর্তৃক কঙ্গোব্দ-বিজয়ের পর মহাসামন্ত নিযুক্ত হইয়া থাকিবেন। গুণাইঘর-লিপির দূতক মহাপ্ৰতীহার মহাপিলুপতি পঞ্চাধিকরণেপরিক মহারাজ বিজয়সেনও গোপচন্দ্রের একজন শ্ৰীমহাসামন্ত ছিলেন। বিজয়সেন গোপচন্দ্রের আগে মহারাজ বৈন্যগুপ্তেরও অন্যতম মহাসামন্ত ছিলেন। মহারাজাধিরাজ সমাচার দেবের কুপালা-লিপিতে এবং জয়নাগের বপ্লঘোষবাট-লিপিতেও সামন্তের উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে; শেষোক্ত লিপিটিতে দেখিতেছি, সামন্ত নারায়ণভদ্র ঔদুম্বরিক বিষয়ের (= আইন-ই-আকবরী গ্রন্থের ঔদম্বর পরগণা = বীরভূম-মুর্শিদাবাদের কিয়দংশ) বিষয়পতি ছিলেন। খড়্গ-বংশীয় রাজারাও বোধ হয় সামন্ত নরপতিই ছিলেন; এবং লোকনাথের বংশও তো সামন্ত বংশ। রাতবংশীয় রাজারাও সামন্ত-মহাসামন্ত ছিলেন, সন্দেহ কী? এই সামন্তদের সঙ্গে মহারাজাধিরাজদের সম্বন্ধের রূপ ও প্রকৃতি কী ছিল, পরস্পরের দায় ও অধিকার কী ছিল, বলা কঠিন; এ সম্বন্ধে কোনও তথ্য অনুপস্থিত। তবে অনুমান হয়, কোনও কোনও সামস্ত (তাহারা একেবারে মহাসামন্ত অথবা সামস্ত-মহারাজ, যেমন কঙ্গোদাধিপ মাধবরাজ বা শ্ৰীমহাসামন্ত শশাঙ্ক, অথবা দূতক বিজয়সেন, অথবা খড়্গ ও রাত-বংশীয় রাজার) প্রকৃত পক্ষে প্রায় স্বতন্ত্র স্বাধীন নরপতিরূপেই রাজত্ব করিতেন, শুধু মৌখিকত বা দলিলপত্রে নিজেদের সেই ভাবে প্রচার করিতেন না। তবে, মহারাজাধিরাজের ক্ষমতা ও রাষ্ট্র দুর্বল হইলে অথবা কোনও উপায়ে সুযোগ পাইলেই তাহারা স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিয়া বসিতেন।। কোনও কোনও সামন্ত-মহাসামন্ত মহারাজাধিরাজের উচ্চ রাজকর্মচারী (যথা ভুক্তিপতি বা বিষয়াপতি) রূপেও কাজ করিতেন। সামান্ত রাজাদেরও আবার সামন্ত থাকিতেন; লোকনাথ পট্টোলীতে দেখিতেছি, লোকনাথের এক মহাসামন্ত ছিলেন ব্রাহ্মণ প্রদোষশৰ্মা। পরবর্তীকালের সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয় (যেমন, রামচরিতের) তাহা হইলে সামন্তদের অন্যতম প্রধান কর্তব্য ছিল যুদ্ধবিগ্রহের সময় সৈন্যবাহিনী দিয়া এবং নিজে যুদ্ধে যোগ দিয়া মহারাজাধিরাজকে সাহায্য করা। এই সামন্ত-মহাসামন্তরা বস্তুত মহারাজাধিরাজেরই একটি ক্ষুদ্রতর সংস্করণ মাত্র। সামন্ত প্রথা এখন হইতে ক্রমশ বিস্তার লাভ করিয়াই চলিবে এবং পাল-আমলে তাহার পূর্ণতর রূপ দেখা যাইবে। এ-পর্বের বঙ্গ ও সমতট রাষ্ট্র এবং গৌড়তন্ত্র এই আমলাতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্র লইয়াই গঠিত।
