শশাঙ্ক কীর্তিমান নরপতি ছিলেন, সন্দেহ নাই। তঁহাকে ‘জাতীয় নায়ক অথবা বীর বলা যাইতে পারে কিনা সে-সম্বন্ধে গভীর সন্দেহ থাকিলেও তিনি যে অজ্ঞাতকুলশীল মহাস্যমন্তরূপে জীবন আরম্ভ করিয়া তদানীন্তন উত্তর-ভারতের সর্বোত্তম রাষ্ট্রগুলির সমবেত শক্তির (কনৌজ-স্থানীশ্বর-কামরূপ মৈত্রী) বিরুদ্ধে সার্থক সংগ্রামে লিপ্ত হইয়া, শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র স্বাধীন নরপতিরূপে সুবিস্তৃত রাজ্যের অধিকারী হইয়াছিলেন, এ-তথ্যই ঐতিহাসিকের প্রশংসিত বিস্ময় উদ্রোকের পক্ষে যথেষ্ট। পুরুষপরম্পরাবিলম্বিত কনৌজ-গৌড়-মগধ সংগ্রাম তাহারই শৌর্য ও বীর্যে নূতন রূপে রূপান্তরলাভ করিয়াছিল; সকলোত্তরপথনাথ হর্ষবর্ধনকে যদি কেহ সাৰ্থক প্রতিরোধ প্ৰদান করিয়া থাকেন তবে শশাঙ্ক এবং চালুক্যরাজ দ্বিতীয় পুলকেশীই তাহা করিয়াছিলেন। উত্তর-ভারতের আধিপত্য লইয়া পালরাজ ধর্মপাল-দেবপাল প্ৰভৃতির আমলে গৌড়-কনৌজের যে সুদীর্ঘ সংগ্রাম পরবর্তী কালের বাঙলার রাষ্ট্ৰীয় ইতিহাসুকে উজ্জ্বল ও গৌরবান্বিত করিয়াছে, তাহার প্রথম সূচনা শশাঙ্কের আমলেই দেখা দিল এবং তিনিই সর্বপ্রথম বাঙলাদেশকে উত্তর-ভারতের রাষ্ট্ৰীয় রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ করাইলেন। বাণভট্ট-য়ুয়ানচোয়াঙ-মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকার যদি তাহার প্রতি বিদ্বিষ্ট হইয়া থাকেন তবে তাহার মূলে ঈর্ষা ও হিংসা একেবারেই কিছু ছিল না, এমন বলা যায় না।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গৌড় ও মগধের অধিকার লইয়া প্রায় কড়াকড়ি পড়িয়া গেল! মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকার মানব নামে শশাঙ্কের এক পুত্রের নাম করিয়াছেন; এই পুত্র নাকি ৮ মাস ৫ দিন রাজত্ব করিয়াছিলেন। অন্য কোনও সাক্ষ্যে এই তথ্যের উল্লেখ নাই, কাজেই ইহা সত্য হইতে পারে, না-ও হইতে পারে। তবে, শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ ও অবিশ্বাসে গৌড়তন্ত্র বিনষ্ট হইয়া গিয়াছিল, মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের এই সাক্ষ্য অবিশ্বাস্য নয় বলিয়াই মনে হয়। ৬৩৮ খ্ৰীষ্টাব্দে যুয়ান-চোয়াঙ যখন বাঙলাদেশ ভ্রমণে আসেন তখন এই দেশ পাঁচটি বিভাগে বিভক্ত : কােজঙ্গল, পুণ্ড্রবর্ধন, কর্ণসুবর্ণ, তাম্রলিপ্তি ও সমতট। এই পাঁচটি জনপদের কোনোটিরই রাজা বা রাষ্ট্র সম্বন্ধে যুয়ান-চোয়াঙ কিছু বলেন নাই। পাচটি জনপদের মধ্যে এক সমতট ছাড়া আর বাকী চারটিই নিঃসন্দেহে শশাঙ্কের রােজ্যান্তর্গত ছিল। মনে হয়, তাহার মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রত্যেকটি জনপদই স্বাধীন ও স্বতন্ত্রপরায়ণ হইয়া উঠে এবং ৬৪২ খ্রীষ্টাব্দে কােজঙ্গলে ভাস্করবর্মা-হৰ্ষবর্ধন সাক্ষাৎকারের আগেই ভাস্করবর্মা কোনও সময় পুণ্ড্রবর্ধন-কর্ণসুবর্ণ জয় করিয়া কর্ণসুবর্ণের জয়স্কন্ধাবার হইতে এক ভূমিদানি পট্টোলী নির্গত করাইয়াছিলেন। চীন-রাজতরঙ্গের সাক্ষানুযায়ী ৬৪৮ খ্ৰীষ্টাব্দে ভাস্করবর্ম পূর্ব ভারতের নরপতি ছিলেন। ৬৪২-৪৩ খ্ৰীষ্টােব্দ নাগাদ কঙ্গোদ এবং কজঙ্গলও হর্ষবর্ধন কর্তৃক বিজিত ও অধিকৃত হইয়াছিল, য়ুয়ান-চোয়াঙের বিবরণ হইতে এইরূপ মনে হয়। তাম্রলিপ্তি-দণ্ডভুক্তি সম্বন্ধে কিছু বলা কঠিন, তবে ৬৩৭-৩৮ খ্ৰীষ্টাব্দে মগধের রাজা ছিলেন পূৰ্ণবর্ম, কিন্তু ৬৪১ খ্ৰীষ্টাব্দে কি তাহার অব্যবহিত আগে মগধও হর্ষবর্ধন কর্তৃক অধিকৃত হইয়াছিল, কারণ চীনদৃত মা-তোয়ান-লিন বলিতেছেন, শিলাদিত্য (হর্ষবর্ধন) ঐ বৎসর “মগধাধিপ” এই আখ্যা গ্রহণ করেন।
কামরূপরাজ ভাস্করবর্মা বোধ হয় বেশিদিন গৌড়-কর্ণসুবর্ণ নিজ-করায়ত্ত রাখিতে পারেন। নাই। শশাঙ্কের গৌড়তন্ত্র বিনষ্টের স্বল্পকাল পরেই গৌড়ে জয় নামক কোন নাগরাজ রাজত্ব করিয়াছিলেন, মঞ্জশ্ৰীমূলকল্পে এইরূপ একটি ইঙ্গিত আছে। আনুমানিক সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে মহারাজাধিরাজ জয়নাগ নামক এক রাজা কর্ণসুবর্ণের জয়স্কন্ধাবার হইতে কিছু ভূমিদানের আদেশ মঞ্জর করিয়াছিলেন। জয় নামক এক রাজার নামাঙ্কিত কয়েকটি মুদ্রাও বীরভূম-মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে পাওয়া গিয়াছে। মুদ্রার জয়, মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের জয়, এবং বপ্লঘোষবাট-পট্টোলীর জয়নাগ এক এবং অভিন্ন বলিয়া বহুদিন স্বীকৃত হইয়াছেন। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের বিবরণ হইতে মনে হয়, ভাস্করবর্মার কর্ণসুবর্ণাধিকারের পর শশাঙ্কপুত্র মানব পিতৃরাজ্য পুনরাধিকারের একক চেষ্টা করিয়া থাকিবেন এবং সে চেষ্টা হয়তো ক্ষণস্থায়ী সার্থকতাও লাভ করিয়া থাকিবে। কিন্তু তাহার পরই কর্ণসুবর্ণ জয়নাগের করায়ত্ত হয় এবং তিনি মহারাজাধিরাজ, আখ্যায় স্বতন্ত্র নরপতিরূপে পরিচিত হন। অথবা এমনও হইতে পারে। ভাস্করবর্মী কর্তৃক কর্ণসুবর্ণ জয়ের আগেই জয়নাগ কোনও সময় ঐ রাজ্য কিছুদিনের জন্য ভোগ করিয়াছিলেন। যাহাই হউক, ৬৫০ খ্ৰীষ্টাব্দের মধ্যেই শশাঙ্কের গৌড় রাজ্য একেবারে তছনছ হইয়া গেল। শশাঙ্ক গৌড়কে কেন্দ্ৰ করিয়া যে বৃহত্তর গৌড়তন্ত্র গড়িয়া তুলিতে চাহিয়াছিলেন তাহা অন্তত কিছুকালের জন্য ধূলিসাৎ হইয়া গেল। যতদিন তিনি বাচিয়াছিলেন ততদিন এই রাষ্ট্রদর্শ কার্যকরী ছিল সন্দেহ নাই; কিন্তু একদিকে ভাস্করবর্মা, অন্যদিকে হর্ষবর্ধন, এ-দুয়ের টানা-পোড়েনের মধ্যে পড়িয়া শশাঙ্কের অব্যবহিত পরই গৌড়তন্ত্র প্রায় বিনষ্ট হইয়া গেল। অষ্টম শতকের দ্বিতীয় পাদে জনৈক গৌড়াধিপ আবার, বোধ হয় শশাঙ্কের আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া, মগধ হইতে গুপ্তবংশের অবশেষ অবলুপ্ত করেন এবং মগধেরও আধিপত্য লাভ করেন। কিন্তু সে-চেষ্টা সত্ত্বেও গৌড়তন্ত্র আর পুনরুদ্ধার করা গেল না। শশাঙ্কের ধনুকে গুণ টানিবার মতন বীর অব্যবহিত পরে আর দেখা গেল না। তাহার পর সুদীর্ঘ একশত বৎসর গৌড়ের, শুধু গৌড়েরই বা কেন, বঙ্গেরও, অর্থাৎ সমগ্র বাঙলাদেশের ইতিহাসে গভীর ও সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা, মাৎস্যন্যায়ের অপ্ৰতিহত প্রভাব {
