মৌখরীদের সঙ্গে গুপ্তদের একটা সংগ্রাম কয়েক পুরুষ ধরিয়াই চলিয়া আসিতেছিল এবং তাহা গৌড় ও মগধের অধিকার লইয়াই মনে হয়। দুই পুরুষ সংগ্রাম চলিবার পর বোধ হয়। মহাসেনগুপ্তের পিতা নিজের শক্তিবৃদ্ধির উদ্দেশে নিজ কন্যা মহাসেনগুপ্তাকে পুষ্যভূতিরাজ প্রভাকরবর্ধনের মহিষীরূপে অৰ্পণ করেন। এই মৈত্রীবন্ধনের ভয়ে কিছুদিন মৌখরী বিক্রম শান্ত ছিল। কিন্তু অবন্তীবার্মার পুত্র গ্রহবর্ম যখন মৌখরী বংশের রাজা, তখন মালবের সিংহাসনে রাজা দেবগুপ্ত উপবিষ্ট। পক্ষ-প্রতিপক্ষের রূপ তখন বদলাইয়া গিয়াছে। মগধ ইতিমধ্যেই গুপ্তহস্তচু্যত হইয়া গিয়াছিল। মালবিরাজ মহাসেনগুপ্তের দুই পুত্র, কুমার ও মাধব, প্রভাকরবর্ধনের গৃহে আশ্রয় লইয়াছিলেন এবং মালবের অধিপতি হইয়াছিলেন দেবগুপ্ত। দেবগুপ্তের মৈত্রীবন্ধন গৌড়াধিপ শশাঙ্কের সঙ্গে, যে-শশাঙ্ক মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প-গ্রন্থের মতে ইতিমধ্যেই বারাণসী পর্যন্ত তাহার আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন। অন্যদিকে গ্রহবর্মও ইতিপূর্বেই প্রভাকরবর্ধনের কন্যা এবং রাজ্যবর্ধন-হৰ্ষবর্ধনের ভগিনী রাজ্যশ্ৰীকে বিবাহ করিয়াছিলেন; সেই সূত্রে তাহার মৈত্রীবন্ধন পুষ্যভূতি বংশের সঙ্গে। বৃদ্ধ প্রভাকরবর্ধনের অসুস্থত এবং মৃত্যুর সুযোগে মালবিরাজ দেবগুপ্ত মৌখরীরাজ গ্রহবর্মকে আক্রমণ ও হত্যা করিয়া রানী রাজ্যশ্ৰীকে কনৌজে কারারুদ্ধ করেন। হর্ষচরিত পাঠে মনে হয়, প্রভাকরবর্ধনের মৃত্যু এবং শেষোক্ত দুইটি ঘটনা একই দিনে সংঘটিত হইয়াছিল। দেবগুপ্ত তাহার পর যখন স্থানীশ্বরের দিকে অগ্রসরমান শশাঙ্কও তখন দেবগুপ্তের সহায়তার জন্য কনৌজের দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন; কিন্তু দেবগুপ্তের সৈন্যের সঙ্গে মিলিত হইবার আগেই সদ্যসিংহাসনারূঢ় রাজ্যবর্ধন সসৈন্যে দেবগুপ্তের সম্মুখীন হইয়া তাহাকে আক্রমণ, পরাভূত ও নিহত করেন। তাহার পর হয়তো তিনি ভগিনী রাজ্যশ্ৰীকে কারামুক্ত করিবার জন্য কনৌজের দিকে অগ্রসর হইতেছিলেন, কিন্তু উদ্দেশ্য সিদ্ধির আগেই তাহাকে শশাঙ্কের সম্মুখীন হইতে হয় এবং তিনি তাহার হস্তে নিহত হন। বাণভট্ট ও য়ুয়ান-চোয়াঙ বলিতেছেন, শশাঙ্ক রাজ্যবর্ধনকে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া হত্যা করিয়াছিলেন; অন্যদিকে হর্ষবর্ধনের লিপির সাক্ষ্য এই যে, রাজ্যবর্ধন সত্যানুরোধে (হয়তো কোনও প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য) তাহার শত্রুর শিবিরে গিয়াছিলেন। এবং সেইখনেই তনুত্যাগ করিয়াছিলেন। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকারের মতে রাজ্যবর্ধন নগ্নজাতির কোনও রাজ-আততায়ী কর্তৃক নিহত হইয়াছিলেন। বাণভট্ট ও য়ুয়ান-চোয়াঙ দুইজনেই শশাঙ্কের প্রতি কিছুটা বিদ্বিষ্ট ছিলেন, তাহা ছাড়া দুই জনই রাজ্যবর্ধনের ভ্রাতা হর্ষবর্ধনের কৃপাপাত্র ছিলেন। কাজেই তাঁহাদের সাক্ষ্য কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য বলা কঠিন। যাহাই হউক, এই বিতর্ক কতকটা অবাস্তুর, কারণ শশাঙ্কের ব্যক্তি-চরিত্রগত এই তথ্যের সঙ্গে জনসাধারণের ইতিহাসের যোগ প্রায় অনুপস্থিত। রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর শশাঙ্ক আর স্থানীশ্বরের দিকে অগ্রসর হইয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না, কারণ মৌখরী রাজবংশের পরাভাবের আর কিছু বাকী ছিল না। হর্ষবর্ধন রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত হইয়াই তৎক্ষণাৎ সসৈন্যে গৌড়রাজ শশাঙ্কের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। পথে কামরূপরাঞ্জা ভাস্করবর্মীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মৈত্রীবন্ধন, সংবাদবাহক ভক্টর মুখ হইতে রাজ্যবর্ধন-হত্যার বিস্তৃততর বিবরণ ও বিন্ধ্যপৰ্ব্বতে রাজ্যশ্ৰীর পলায়ন-বৃত্তান্ত প্ৰাপ্তি, সসৈন্যে ভণ্ডীকে গৌড়রাজের বিরুদ্ধে পাঠাইয়া নিজে রাজ্যশ্ৰীীর উদ্ধারে গমন ও অগ্নিকুণ্ডে ঝাপ দিবার আগেই রাজশ্ৰীর উদ্ধার এবং তাহার পর গঙ্গাতীরে ভণ্ডীচালিত সৈন্যের সঙ্গে পুনর্মিলন ইত্যাদি বাণভট্টের কৃপায় আজ অতি সুবিদিত ঐতিহাসিক তথ্য। কিন্তু তাহার পর শশাঙ্কের সঙ্গে হর্ষবর্ধনের সম্মুখ যুদ্ধ কিছু হইয়াছিল। কিনা এ-সম্বন্ধে বাণভট্ট নীরব। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের গ্রন্থকারের মতে এই সময় প্রাচ্যদেশের রাজা ছিলেন সোম (=চন্দ্র= শশাঙ্ক); তাহার রাজধানী ছিল পুঞ্জ। হর্ষবর্ধন এই সোমরাজকে পরাজিত করিয়া তঁহাকে নিজ রাজ্যসীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের বিবরণ কতটুকু সত্য ও বিশ্বাসযোগ্য বলা কঠিন; তবে, তাহার এই জয় যে দীর্ঘ স্থায়ী হয় নাই এবং কামরূপরাজ ভাস্করবর্মী ও হর্ষবর্ধনের সম্মিলিত শত্রুতা সত্ত্বেও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত শশাঙ্ক যে সমগ্র গৌড় দেশ, মগধ-বৃদ্ধগয়া অঞ্চল এবং উৎকল ও কঙ্গোদ দেশের অধিপতি ছিলেন, তাহার প্রমাণ বিদ্যমান। কঙ্গোব্দী-এ শৈলোদ্ভব-বংশীয় অধিপতি মহারাজা-মহাসামন্ত দ্বিতীয় শ্ৰীমাধবরাজের (৬১৯ খ্ৰীষ্ট শতক) একটি লিপিতে মাধবরাজ শশাঙ্ককে তাহার অধিরাজ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছিলেন। সামন্ত-মহারাজ সোমদত্ত এবং মহাপ্ৰতীহার শুভকীর্তির অধুনাবিষ্কৃত মেদিনীপুর (প্রাচীন নাম, মিথুনপুর) লিপি দুইটিতেও শশাঙ্ক অধিরাজ বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। এই লিপি দুইটির সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়, দণ্ডভুক্তিদেশ শশাঙ্কের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং উৎকলদেশ দণ্ডভুক্তি-বিভাগের অন্তর্গত ছিল। ৬৩৭-৩৮ খ্ৰীষ্টাব্দের কিছু পূর্বে শশাঙ্কের মৃত্যু হইয়া থাকিবে, কারণ ঐ সময় য়ুয়ান-চোয়াঙ মগধ-ভ্ৰমণে আসিয়া শুনিলেন, কিছুদিন আগেই শশাঙ্ক বুদ্ধগয়ার বোধিদ্রুম কাটিয়া ফেলিয়াছেন, এবং স্থানীয় বুদ্ধমূর্তিটি নিকটেই একটি মন্দিরে সরাইয়া রাখিয়াছেন; এই পাপের ফলেই নাকি শশাঙ্ক কুণ্ঠ-জাতীয় কোনও ব্যাধিগ্রন্থ হইয়া অল্পদিনের মধ্যে মারা যান। মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প-গ্রন্থেও এই গল্পের পুনরাবৃত্তি দেখিতে পাওয়া যায়; কিন্তু গল্পটি কতদূর বিশ্বাসযোগ্য, বলা কঠিন।
