খড়্গ বংশ, লোকনাথের বংশ এবং রাত বংশের রাজারা প্রায় সমসাময়িক; ইহারা সকলেই আবার সমতটে রাজত্ব করিয়াছিলেন। কে কাহার পরে সমতটের অধিকার লাভ করিয়াছিলেন, নিশ্চয় করিয়া বলা কঠিন; ইহাদের বৃহৎ-পরমেশ্বর মহারাজাধিরাজরাই-বা কাহারা ছিলেন, তাহাও বলা যায় না। তবে, মনে হয়, খড়্গ বংশ প্রথমে বঙ্গেই রাজত্ব করিতেন, পরে রাজা দেবখড়্গ সমতটে রাজ্যবিস্তার করেন। বোধ হয়, খড়্গদের সামন্ত হিসাবে, অথবা তাহাদের অবসানের পর আর কাহারও সামন্ত হিসাবে লোকনাথ সমতটের অধীশ্বর হন এবং লোকনাথকে পরাজিত করিয়া রাতবংশীয় জীবধারণ নিজ বংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে সমতট একটি ব্ৰাহ্মণ রাজবংশ রাজত্ব করিতেছিলেন এবং নালন্দার বৌদ্ধ মহাস্থবির য়ুয়ান-চোয়াঙের গুরু শীলভদ্র সেই রাজবংশের সন্তান ছিলেন বলিয়া য়ুয়ান-চোয়াঙ নিজেই সাক্ষ্য দিতেছেন। এই ব্ৰাহ্মণ রাজবংশ রাত বংশ হওয়া কিছু অসম্ভব নয়।
অসম্ভব নয় যে, সপ্তম শতকে গৌড়ে এবং উত্তর ও পশ্চিম-দক্ষিণবঙ্গে শশাঙ্ক যে গৌড়ত স্ত্ৰ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন খড়্গ ও রাতবংশীয় রাজারা গোড়ায় তাহারই সামন্ত ছিলেন। শশাঙ্কের মৃত্যুর পর গৌড় তন্ত্র বিনষ্ট হইলে এই সব সামন্ত বংশ একে একে কার্যত স্বাধীন হইয়া উঠেন। ৮ এই সংক্ষিপ্ত তথ্যবিবৃতি হইতেই বুঝা যাইবে, সপ্তম শতকের শেষাশেষি পর্যন্ত কি অষ্টম শতকের গোড়া পর্যন্ত বঙ্গ ও সমতটের স্বাতন্ত্র্য বজায় ছিল; কিন্তু ঘন ঘন রাজবংশ পরিবর্তন ও প্রবল সামস্তাধিপত্য দেখিয়া মনে হয়, এই স্বাতন্ত্র্যের মূল শিথিল হইয়া পড়িতেছিল। তাহা ছাড়া, সমসাময়িক অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণ হইতে জানা যায়, বঙ্গ ও সমতট এই সময় একাধিকবার বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হইতেছে এবং রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলার সূচনা দেখা দিতেছে। এই বিশৃঙ্খলার ইতিহাস পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা যাইবে।
সপ্তম শতকের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাদে যখন বঙ্গ ও সমতটে খড়্গ ও রাজবংশীয় সামন্তদের প্রভুত্ব চলিতেছে তখন গৌড়ের অবস্থােটা কি, তাহা দেখা যাইতে পারে।
গৌড়তন্ত্র
৫ নং দামোদরী-লিপির সাক্ষ্যানুযায়ী পুণ্ড্রবর্ধন ৫৪৪ খ্ৰীষ্ট—শতকেও জনৈক গুপ্তরাজের অধীন ‘ মহাসেনগুপ্ত নামক জনৈক গুপ্তান্তনামা নরপতি (আনুমানিক ষষ্ঠ শতকের চতুর্থ পাদ) লোহিত্যতীরে কামরূপরাজ সুস্থিতবর্মকে পরাজিত করিয়াছিলেন বলিয়া লিপি-প্রমাণ বিদ্যমান। পুণ্ড্রবর্ধন ও গৌড় ষষ্ঠ শতকের চতুর্থ পাদের আগে স্বাতন্ত্র্য লাভ করিতে পারিয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। যাহা হউক, সপ্তম শতকের সূচনায় দেখা যাইতেছে, জনৈক শ্ৰীমহাসামন্ত শশাঙ্ক গৌড়ের স্বাধীন স্বতন্ত্র নরপতিরূপে দেখা দিতেছেন এবং গৌড়রাষ্ট্র উত্তর-ভারতের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র বিশিষ্ট অধ্যায় রচনা করিতেছে।
গৌড়ের এই স্বাতন্ত্র্য লাভ ঐতিহাসিকেরা সাধারণত যতটা আকস্মিক বলিয়া মনে করেন, ততটা আকস্মিক নয়। ৫৫৪ খ্ৰীষ্টাব্দে বা তাহার অব্যবহিত আগে কোনও সময়ে কনৌজ-কোশলের মৌখরীরাজ। ঈশানবৰ্মার সঙ্গে একবার গৌড়জনদের এক সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল। হোড়াহালিপিতে ঈশানবৰ্মা দাবি করিয়াছেন, তিনি গৌড়জনদের সমগ্র জনপদের ভবিষ্যৎ বিনষ্ট করিয়া দিয়া তাহাদিগকে সমুদ্রাশ্রয়ী করিতে বাধ্য করিয়াছিলেন। ঈশানবৰ্মার দাবি একটু অভিনিবেশে বিশ্লেষণ করিলে মনে হয়, ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি সময়েই গৌড় জনপদ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যলাভ করিতে আরম্ভ করিয়াছে এবং এই জনপদ একান্তই সমুদ্রনির্ভর। একাদশ শতকের গুরগি-শিলালিপিতেও দেখা যাইতেছে, গৌড়জনদের একটি সমুদ্র-জলদুর্গ ছিল (জলনিধিজলদুর্গং গৌড়েরাজ্যোহধিশেতে)। যাহা হউক, এই গৌড় জনপদ বোধ হয় যষ্ঠ শতক হইতে স্বাতন্ত্র্যাভিলাষী, অথবা নামে মাত্র গুপ্তবংশধরদের আয়ত্বে এবং ঈশানবৰ্মার গৌড়বিজয় বোধ হয় বংশপরম্পর-বিলম্বিত গুপ্ত-মৌখরী সংঘর্ষের একটি ক্ষুদ্র কাহিনী মাত্র। গুপ্তরাজ মহাসেনগুপ্তের ভগিনীকে বিবাহ করিয়াছিলেন পুষ্প বা পুষ্যভূতিরাজ প্রভাকরবর্ধন; তাহাদের দুই পুত্র ও এক কন্যা : রাজ্যবর্ধন, হর্ষবর্ধন ও রাজ্যশ্ৰী। রাজ্যশ্ৰীকে বিবাহ করিয়াছিলেন মৌখরীরাজ গ্রহবর্মী। গৌড়-স্বাতন্ত্রোর নায়ক শশাঙ্ক ইহাদের সকলের এবং মহাসেনগুপ্তের পরবর্তী গুপ্তরাজ দেবগুপ্তের সমসাময়িক; কাজেই তাহার ইতিহাস এবং গৌড়-স্বাতন্ত্র্যের ইতিহাস ইহাদের সকলের সঙ্গে জড়িত। সে-ইতিহাস সমসাময়িক লিপিমালা, বাণভট্টের হর্ষচরিত, যুয়ান-চোয়াঙের বিবরণী এবং আর্যমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প প্রভৃতি গ্রন্থে উল্লিখিত, ব্যাখ্যাত ও কীর্তিত হইয়াছে। তাহার ফলে পুষ্যভূতিরাজ হর্ষবর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে শশাঙ্ক-কাহিনীও অল্পবিস্তর সুপরিচিত।
শশাঙ্ক
শশাঙ্কের প্রথম পরিচয় মহাসামন্তরূপে। কাহার মহাসামপ্ত তিনি ছিলেন, নিঃসংশয়ে বলা কঠিন, তবে, মনে হয়, মহাসেনগুপ্ত বা তৎপরবর্তী মালবাধিপতি দেবগুপ্ত তাহার অধিরাজ ছিলেন। রাজ্যবর্ধন কর্তৃক দেবগুপ্তের পরাজয়ের পর শশাঙ্কই যে দেবগুপ্তের দায়িত্ব ও কর্তব্যভার (মৌখরী-পুষ্যভূমি মৈত্রীবন্ধনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম) নিজের স্কন্ধে তুলিয়া লইয়াছিলেন; তাহা হইতে মনে হয়, শশাঙ্ক মগধ-মালবাধিপতি গুপ্তরাজাদেরই মহাসামন্ত ছিলেন। যাহা হউক, এ তথ্য নিঃসংশয় যে, ৬০৬-৭ খ্ৰীষ্টাব্দের আগে কোনও সময়ে শশাঙ্ক গৌড়ের স্বাধীন নরপতিরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং কর্ণসুবৰ্ণে (মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটির নিকট কানসোনা) নিজ রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করেন।
