বঙ্গ-গোপচন্দ্রের বংশ
ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত পাঁচটি এবং বর্ধমান অঞ্চলে আবিষ্কৃত একটি, এই ছয়টি পট্টোলীতে তিনটি মহারাজাধিরাজের খবর পাওয়া যাইতেছে; গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য এবং নরেন্দ্ৰাদিত্য সমাচারদেব। ইহাদের পরস্পরের সঙ্গে পরম্পরের কী সম্পর্ক তাহা নিশ্চয় করিয়া বলিবার উপায় নাই, তবে ইহারা তিনজনে মিলিয়া অনূ্যন ৩৫ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন এবং এই রাজত্বের কাল মোটামুটি ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় পাদ হইতে তৃতীয় পাদ পর্যন্ত। লিপি-প্রমাণ হইতে মনে হয়, গোপচন্দ্ৰই ইহাদের প্রথমতম এবং প্রধানতম, এবং ইহাদের রাজ্য বর্ধমান অঞ্চল হইতে আরম্ভ করিয়া একেবারে ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল; কেন্দ্ৰস্থল ছিল বোধ হয় ফরিদপুর অথবা ত্রিপুরা অঞ্চলে। রাজ্যের ছিল দুইটি বিভাগ, একটি বর্ধমানভুক্তি, অপরটি নব্যাবকাশিকা (নূতন অবকাশ বা নবসৃষ্ট ভূমি = ফরিদপুরের কোটালিপাড়া অঞ্চল?)। বর্ধমান অঞ্চলের যে-বিজযসেন একদা ছিলেন মহারাজ বৈন্যগুপ্তের সামন্ত তিনি এখন সামন্ত হইলেন গোপচন্দ্রের। আবিষ্কৃত সুবর্ণমুদ্রা হইতে মনে হয়, সমাচার দেবের পরও আরও কয়েকজন রাজা এই সব অঞ্চলে রাজত্ব করিয়াছিলেন; ইহাদের মধ্যে একজনের নাম পৃথুজবীর (মতান্তরে, পৃথুবীর অথবা পৃথুবীরাজ) ও আর একজনের নাম সুধন্যা (বা শ্ৰীসুধন্যাদিত্য)। বাতাপী বা বাদামীর চালুক্যরাজ কীর্তিবর্মী। ৫৯৭-৯৮ খ্ৰীষ্টাব্দের আগে কোনও সময় একবার বঙ্গদেশ জয় করিয়াছিলেন। বোধ হয় তাহার এই আক্রমণের ফলে, অথবা গৌড়ে শশাঙ্কের অভ্যুদয় ও রাজ্যবিস্তারের ফলে, অথবা দুইয়েরই সম্মিলিত ফলে বঙ্গের স্বাতন্ত্র্য কিছুদিনের জন্য ক্ষুগ্ধ হইয়া থাকিবে।
বঙ্গ ও সমতট ৷ বৌদ্ধ খড়্গ বংশ
সপ্তম শতকের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাদে সমতটে একটি বৌদ্ধ রাজবংশের খবর পাওয়া যাইতেছে আশ্রফপুরের দুইটি লিপিতে এবং চীন পরিব্রাজক ইৎ-সিঙ ও সেং-চি’র বিবরণীতে। আশ্ৰফপুরের লিপি দুইটিতে নৃপধিরাজ খড়েগাদ্যম, (পুত্র) জাতখড়্গ, (পুত্র) দেবখড়্গ এবং (পুত্র) রাজরাজ (ভট্ট) নামে চারজন রাজার খবর পাওয়া যাইতেছে। এই বংশ ইতিহাসে খড়্গ বংশ নামে খ্যাত। ত্রিপুরা জেলার দেউলবাড়ীতে প্রাপ্ত শর্বাণী দেবীর (দুর্গার) একটি মূর্তির পাদপীঠে দেবখড়্গের স্ত্রী এবং রাজরাজভট্টের মাতা প্রভাবতীর নাম উৎকীর্ণ আছে। সোং-চি’ রাজভটি নামে সমতটের এক বৌদ্ধ রাজার নাম করিয়াছেন, এবং ইৎসিঙও দেববর্মী নামে পূৰ্বদেশের এক রাজার খবর দিতেছেন। দেববর্ম ও দেবখড়্গ এক ব্যক্তি হইলেও হইতে পারেন, না-ও হইতে পারেন; কিন্তু সেং-চি-কথিত রাজভটি যে আম্রফপুর-পট্টোলীর রাজরাজীভট্ট, এ-তথ্য নিঃসংশয় বলিলেই চলে। যাহা হউক, এই বংশের অন্তত একটি জয়স্কন্ধাবার ছিল কর্মন্তবাসক (বোধ হয়, ত্রিপুরা জেলার বর্তমান বড়কামাতা)। আম্রফপুর ঢাকার ত্ৰিশ মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে। অনুমান হয়, অন্তত বর্তমান ঢাকা ও ত্রিপুরা অঞ্চল এই বংশের রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। যাহাই হউক, খড়্গ এই উপান্ত নাম দেশজ বলিয়া মনে হয় না। খড়্গ বংশের রাজারা কোনো পার্বত্য কোমের প্রতিনিধি হইলেও হইতে পারেন। খড়্গ বংশ বোধ হয় স্বাধীন রাজবংশ ছিল না। রাজরাজ্যভট্টের আস্রফপুর-লিপিতে একখণ্ড ভূমির উল্লেখ আছে; এই ভূমিখণ্ড ইতিপূর্বেই জনৈক ‘বৃহৎ-পরমেশ্বর” কর্তৃক দান করা হইয়াছিল। এই “বৃহৎ পরমেশ্বর” কে ছিলেন, বলা কঠিন, তবে খড়্গরা যে সদোক্ত বৃহৎ-পরমেশ্বরের সামন্তবংশ ছিলেন, এমন অনুমান অযৌক্তিক নয়। সামন্তরাও যে অনেক সময় ‘নৃপধিরাজ’, ‘অধিমহারাজ বলিয়া উল্লিখিত হইতেন, এমন প্রমাণ দুর্লভ নয়। খড়্গবংশীয় রাজারা প্রথমে বোধহয় বঙ্গে রাজত্ব করিতেন, পরে সমতট রাজত্ব বিস্তার করিয়া থাকিবেন।
সমতট
ত্রিপুরা জেলায় প্রাপ্ত সপ্তম শতকীয় একটি পট্টোলীতে আর একটি সামন্ত রাজবংশের খবর পাওয়া যাইতেছে। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা। একজন অধিমহারাজ ছিলেন; তাহার পুত্র ছিলেন মহাসামন্ত শিবনাথ, শিবনাথের পুত্ৰ শ্ৰীনাথ, শ্ৰীনাথের পুত্র ভবনাথ, তারপর লোকনাথ। অনেকে মনে করেন এই সামন্ত-রাজবংশের খড়্গবংশীয় নৃপধিরাজদের অধিরাজত্ব স্বীকার করিতেন। এ-সম্বন্ধে নিশ্চয়ই করিয়া কিছু বলিবার উপায় নাই।
সমতটেশ্বর রাতবংশ
লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীতে লোকনাথেরই সমসাময়িক জনৈক নৃপ জীবধারণের উল্লেখ আছে। এই জীবধারণ যে-বংশের রাজা ছিলেন সেই বংশকে রাতবংশ বলা যাইতে পারে। ত্রিপুরা জেলার কৈলান গ্রামে অধুনাবিষ্কৃত একটি পট্টোলী হইতে এই বংশের দুইটি রাজার খবর পাওয়া যাইতেছে। অক্ষর-সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, এই সামন্ত রাজবংশ সপ্তম শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাদে সমতটের অধীশ্বর ছিলেন। এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা বোধ হয় ছিলেন সমতটেশ্বর প্রতাপোেপনত্যসামন্তচক্ৰ-শ্ৰীজীবধারণ রাত; তাহার পুত্র ছিলেন সমতটেশ্বর প্রাপ্তপঞ্চমহাশব্দ (অর্থাৎ যিনি একাধারে মহাপ্ৰতীহার, মহাসান্ধিবিগ্রহিক, মহাঅশ্বশালাধিকৃত, মহাভাণ্ডাগারিক এবং মহাসােধনিক) শ্ৰীশ্ৰীধারণ রাত; শ্ৰীধারণের পুত্র ছিলেন যুবরাজ বলধারণ রাত। বলা বাহুল্য, এই রাতবংশও সামন্তবংশ, স্বাধীন রাজবংশ নহেন। তবে খড়্গ বংশ বা লোকনাথের বংশ বা রাতবংশ, ইহারা নামেই শুধু ছিলেন সামন্তবংশ; কার্যত ইহারা স্বাধীন নরপতিদের মতই ব্যবহার করিতেন। রাতবংশের রাজারা ছিলেন ব্ৰাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী, এবং শ্ৰীধারণ নিজে ছিলেন পরম বৈষ্ণব; কিন্তু কৈলান-পট্টোলীদ্বারা যে-ভূমি বিক্রীত এবং পট্টিকৃত হইয়াছিল সে-ভূমি রাজার মহাসান্ধিবিগ্রহিক জয়নাথ দান করিয়াছিলেন একটি বৌদ্ধবিহারে, আর্যসংঘের অশন,বসন এবং গ্রন্থাদির ব্যয় নির্বাহের জন্য এবং কতিপয় ব্রাহ্মণকে, তাহাদের পঞ্চমহাযজ্ঞের ব্যয় নির্বাহের জন্য। শ্ৰীধারণ ছিলেন পরমকারুণিক এবং একাধারে কবি, মধুর চিত্র রচয়িতা (অতি মধুরচিত্ৰসীতেরুৎপাদয়িতা), শব্দবিদ্যাপারঙ্গম এবং নানা বিদ্যা ও কলায় পারদর্শী। তাহার পুত্ৰ বলধারণও শব্দবিদ্যা, শস্ত্রবিদ্যা এবং হন্তী ও অশ্ববিদ্যায় সুনিপুণ ছিলেন।
