অবসরপুষ্ট নাগর সমাজ
যে শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্যনির্ভর সমাজের কথা এই মাত্র বলিয়াছি স্বভাবতই তাহার কেন্দ্র ছিল নগরগুলিতে। এই নাগর-সমাজের জীবন-প্ৰণালীর কিছু কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাৎস্যায়নের কামশাস্ত্রে। বাৎস্যায়ন আনুমানিক চতুর্থ-পঞ্চম শতকের লোক, কাজেই আলোচ্য যুগের সমসাময়িক। গ্রাম ও নগর-বিন্যাস অধ্যায়ে প্রাচীন বাঙলার নাগরজীবন সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করা হইয়াছে; এখানে এ-কথা বলিলেই যথেষ্ট যে, সওদাগরী ধনতন্ত্রে পুষ্ট নগর-সমাজে যে অবসর ও বিলাসলীলা, যে কামচাতুৰ্যলীলা রাজান্তঃপুরে এবং ধনী সমাজের গৃহান্তঃপুরে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বত্র দৃষ্টিগোচর হয়, ভারতবর্ষেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। তবে, বাঙলাদেশ চিরকালই উত্তর-ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির প্রত্যন্তদেশে অবস্থিত বলিয়া এবং এখানে আর্যপূর্ব গ্রাম্য সমাজ ও সংস্কৃতির প্রভাব বহুদিন সক্রয় ছিল বলিয়া এদেশে নগর ও নাগর-সমাজ কোনদিনই খুব একান্ত ও সমাদৃত হইয়া উঠিতে পারে নাই। তবু সামাজিক আবর্তন-বিবর্তনের নিয়ম এবং উত্তর-ভারতের স্পর্শ এড়াইয়া যাওয়া তাহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। নাগরিকদের বিলাস-অবসরময় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সম্বন্ধে বাৎস্যায়ন যাহা বলিয়াছেন তাহা কতকাংশে বাঙলাদেশের প্রতিও প্রযোজ্য। একাধিক জায়গায় তিনি প্রাচীন বাঙলার (গৌড়ের) পুরুষদের সৌন্দর্যবোধ ও সৌন্দর্যচর্চার উল্লেখ করিয়াছেন; তাঁহারা যে লম্বা লম্বা নখ রাখিয়া আঙুলের সৌন্দর্যচর্চা করিতেন তাহাও উল্লেখ করিতে ভুলেন নাই। বঙ্গ ও গৌড়ের রাজান্তঃপুরে নানাপ্রকার কামচাতুর্যলীলা অভিনীত হইত, একথাও তিনি বলিতেছেন।
পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্য-ধর্ম ও সংস্কৃতি
আগেকার রাষ্ট্রপর্বে দেখিয়াছি বাঙলায়। জৈন ও বৌদ্ধধর্মের প্রসার এবং এই দুই ধর্মকে আশ্রয় করিয়া আর্যভাষা ও সংস্কৃতির বিস্তার। এই যুগেও এই দুই ধর্মের বিস্তার অব্যাহত এবং রাষ্ট্র ও রাজবংশের সমর্থন ও পোষকতা ইহাদের পশ্চাতে বিদ্যমান। অশ্বমেধযাজী ব্ৰাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও গুপ্ত-সম্রাটেরা এই দুই ধর্মের, বিশেষত বৌদ্ধধর্মের প্রতি অনুরক্ত ও শ্রদ্ধাবান ছিলেন। নালন্দা-মহাবিহারের গোড়াপত্তন তো তঁহাদের পোষকতায়ই হইয়াছিল বলিয়া মনে হয়; অন্তত য়ুয়ান-চোয়াঙের সাক্ষ্য তাঁহাই। সারনাথ-বিহারের ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতি-সাধনার পিছনেও তাঁহাদের পোষকতা সক্রয় ছিল, এ-সম্বন্ধেও সন্দেহ করিবার কিছু নাই। বাঙলাদেশেও অনুরূপ সাক্ষ্য বিদ্যমান। ইৎ-সিঙের মি-লি-কিয়া -সি-কিয়া-পো –নো যদি ফুসে (Foucher)-কথিত বরেন্দ্ৰদেশান্তর্গত মৃগস্থাপন স্তুপ হইয়া থাকে তাহা হইলে মহারাজা শ্ৰীগুপ্ত বৌদ্ধধর্মের একজন পোষক ছিলেন, স্বীকার করিতে হয়। পাহাড়পুর পট্টোলীর (৪৭৮-৭৯) সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, জৈনধর্ম ও সংঘও গুপ্তরাজাদের সমর্থন লাভ করিয়াছিল। মহারাজ বৈন্যগুপ্ত ছিলেন মহাদেবের ভক্ত অর্থাৎ শৈব; তিনি তাহার সামন্ত মহারাজ রুদ্রদত্তের অনুরোধে ত্রিপুরা জেলার গুণাইঘর (গুণিকাগ্রহার) গ্রামে কিছু ভূমি দান করিয়াছিলেন, মহাযানাচার্য শান্তিদেব প্রতিষ্ঠিত মহাযানিক অবৈবর্তিক-ভিক্ষুসংঘের আশ্রম-বিহারের সেবার জন্য। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ইহাও স্মর্তব্য যে, গুপ্তরাজবংশ ছিল ব্রাহ্মণ্যধর্মাবলম্বী এবং ইহাদের রাজত্বকালেই ভারতবর্ষে পৌরাণিক ব্ৰাহ্মণ্যধৰ্ম—এখন আমরা যাহাকে বলি হিন্দুধর্ম-তোহার অভু্যুত্থান ও প্রসারলাভ ঘটে। মৎস্য, বায়ু, বিষ্ণু প্রভৃতি প্রধান প্রধান পুরাণগুলি এই যুগেই রচিত হয় এবং পৌরাণিক দেবদেবীরা এই সময়ই পূজা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করিতে আরম্ভ করেন। জৈন ও বৌদ্ধধর্মের প্রতি রাজকীয় ঔদার্য ও পোষকতা থাকা সত্ত্বেও তাহারা এই ব্ৰাহ্মণ্য ধর্মের সবিশেষ পোষক ও ধারক হইবেন এবং এই ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রচারে সচেষ্ট হইবেন, ইহাই তো স্বাভাবিক। বাঙলাদেশের সমসাময়িক লিপিগুলির সাক্ষ্যও তাঁহাই। অধিকাংশ • লিপিতেই ব্ৰাহ্মণদের সাক্ষাৎ তো পাই-ই, ভূমিদান তো তঁহারাই লাভ করিতেছেন, ছান্দোগ্য-ব্রাহ্মণের উল্লেখও একটি লিপিতে আছে (ধনাইদহ লিপি); কিন্তু তাহার চেয়েও লক্ষণীয়, বিবিধ ব্ৰাহ্মণ্য যাগযজ্ঞ এবং পৌরাণিক দেবদেবী পূজার প্রচলন, ব্রাহ্মণদের জন্য নূতন নূতন বসতি স্থাপন, ইত্যাদি। অগ্নিহোত্ৰ যজ্ঞ, পঞ্চম মহাযজ্ঞ, চক্রস্বামী (বিষ্ণু), কোকামুখস্বামী, শ্বেতবরাহস্বামী, নামলিঙ্গ, গোবিন্দস্বামী, অনন্তনারায়ণ মহাদেব প্ৰদ্যুমেশ্বর প্রভৃতি দেবতার পূজা, বলি-চরু-সত্ৰ প্রবর্তন, গাব্য-ধূপ- পুষ্প-মধুপৰ্ক-দীপ ইত্যাদি পূজোপকরণ প্রভৃতির সাক্ষাৎ বাঙলাদেশে এই প্ৰথম পাওয়া যাইতেছে। ব্ৰাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতি সমাজের অন্তত একটা অংশের-এবং এই অংশই সমাজের প্রতিষ্ঠাবান অংশ-সবিশেষ শ্রদ্ধা ও পোষকতা কিছুতেই দৃষ্টি এড়াইবার কথা নয়। এই যুগে ইহারা যে ক্রমশ প্রতিষ্ঠা লাভ করিতেছেন এবং ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের আদর্শ বলবত্তর হইতেছে তাহার সবিশেষ প্রমাণ পাই যখন দেখি সাধারণ গৃহস্থ ব্যক্তিরাও নূতন নূতন ব্ৰাহ্মণ বসতি করাইবার জন্য ভূমি ক্রয় করিতেছেন এবং তোহা ব্রাহ্মণদের দান করিতেছেন। ব্রাহ্মণদের ভূমিদান করিবার যে-রীতি পরবর্তীকালে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুপ্রচলিত হইয়াছে তাহার সূত্রপাতও দেখি এই সময় হইতে। অব্যবহিত পরবর্তী যুগে যে এই অভ্যাস আরও বাড়িয়াই গিয়াছে, তাহার প্রমাণ ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতকের প্রত্যেকটি লিপিতেই পাওয়া যাইবে। লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীতে দেখিতেছি, রাজা লোকনাথের মহাসামন্ত ব্ৰাহ্মণ প্রদোষশৰ্মা সুৰ্ব্বঙ্গ বিষয়ের অরণ্যময় ভূমিতে অনন্ত-নারায়ণের এক মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন এবং তাহারই সন্নিকটে চতুর্বেদবিদ্যবিশারদ (চাতুবিদ্যা) দ্বিশতাধিক ব্ৰাহ্মণের বসতি স্থাপন করিয়া দিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের এই যে সবিশেষ পোষকতা ইহার রাষ্ট্ৰীয় ইঙ্গিত লক্ষণীয়; এই পোষকতার ফলেই ব্ৰাহ্মণ ও ব্রাহ্মণ্য-সমাজ রাষ্ট্রের অন্যতম ধারক ও পোষক শ্রেণীরূপে গড়িয়া উঠিতে আরম্ভ করে এবং তোহাৱাই ধৰ্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির আদর্শ নির্দেশের নিয়ামক হইয়া উঠেন। উত্তর-ভারতে এই শ্রেণী ও শ্রেণীগত সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তন আগেই দেখা দিয়াছিল। গুপ্তাধিপত্যক আশ্রয় করিয়া বাঙলাদেশে সেই বিবর্তন এই যুগেই, অর্থাৎ চতুর্থ হইতে ষষ্ঠ শতকের মধ্যে সর্বপ্রথম দেখা দিল; এবং ইহাদের অবলম্বন করিয়াই আর্য ভাষা, আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতির স্রোত সবেগে বাঙলাদেশে প্রবাহিত হইল। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণকথা, বিচিত্র লৌকিক গল্প-কাহিনী ইত্যাদি সমস্তই সেই স্রোতের মুখে এদেশে আসিয়া পড়িয়া এদেশের প্রাচীনতম ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা, লোককাহিনী সমস্ত কিছুকে সবেগে সমাজের একপ্রান্তে অথবা নিম্নস্তরে ঠেলিয়া নামাইয়া দিল। উচ্চতর শ্রেণীগুলির ভাষা হইল। আর্য ভাষা; ধর্ম হইল বৌদ্ধ, জৈন বা পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্যধর্ম; সাংস্কৃতিক আদর্শ গড়িয়া উঠিল আর্যাদর্শনুযায়ী। প্রত্যন্তস্থিত বাঙলাদেশ এই যুগে উত্তর-ভারতের বৃহত্তর রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত হইয়া গেল; এবং তাহা সম্ভব হইল বাঙলাদেশ গুপ্ত রাজবংশের প্রায় সর্বভারতীয় সাম্রাজ্যের অংশ হওয়ার ফলে, ব্যাবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত আদান-প্রদানের ফলে, ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির প্রসারের ফলে।
০৫. যুগান্তর ও বঙ্গ-গৌড়ের স্বাতন্ত্র্য ৷ আঃ ৫০০-৬৫০
খ্ৰীষ্টোত্তর পঞ্চম শতকে দুর্ধর্ষ হ্রণেরা ভারতবর্ষের উপর ঝাপাইয়া পড়িল এবং গুপ্তসাম্রাজ্যের বুকের উপর বসিয়া তাহার ভিত্তি একেবারে ঝাকিয়া নাড়িয়া দুর্বল করিয়া দিল। প্রায় এই সময়ই বা তাহার কিছু আগে এই কুণদেরই আর এক শাখা য়ুরোপের বুকের উপর পড়িয়া পূর্ব ও মধ্য-য়ুরোপের রাষ্ট্র ও সমাজ-ব্যবস্থা তছনছ করিয়া দিয়াছিল। ষষ্ঠ শতকের গোড়ায় গুপ্ত-সাম্রাজ্যের দুর্বলতা সুস্পষ্ট হইয়া উঠিল; পূর্বতম প্রত্যন্তের সামন্ত নরপতি মহারাজ বৈন্যগুপ্ত স্বাতন্ত্র্য লাভ করিয়া মহারাজাধিরাজ হইয়া উঠিলেন। মধ্য-ভারতে মান্দাসের অঞ্চলের বংশগোত্র পরিচয়-বিহীন যশোধৰ্মণ নামে জনৈক দিগ্বিজয়ী বীর প্রবল প্রতাপশালী হইয়া উঠিয়া শিথিলমূল গুপ্তসাম্রাজ্যসৌধটিকে প্রায় ধরাশায়ী করিয়া দিলেন। যশোধৰ্মণ লৌহিত্যতীর পর্যন্ত তাঁহার অপরাভূত সৈন্যবাহিনী লইয়া অগ্রসর হইয়াছিলেন এবং সম্ভবত বাঙলাদেশ আর একবার বৈতসীবৃত্তি আশ্রয় করিয়া এই অপরাজেয় যোদ্ধার কাছে মস্তক অবনত করিয়াছিল। তিনি দুর্ধর্ষ কুণদেরও পরাজিত করিয়া তঁহাদের নেতা মিহিরকুলকে তাড়াইয়া লইয়া গিয়াছিলেন। কাশ্মীরে। কিন্তু যশোবর্মার দিগ্বিজয় ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং তিনি কোনও রাজবংশ বা স্থায়ী রাজ্য বা রাজত্ব গড়িয়া তুলিতে পারেন নাই। সুযোগ পাইয়া উত্তর-ভারতের বড় বড় সামন্তেরা স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিয়া নূতন নূতন রাজ্য ও রাজবংশ গড়িয়া তুলিলেন; কনৌজ-কোশলে মৌখরী রাজবংশ এবং স্থানীশ্বরে পুষ্যভূতি-বংশ মস্তক উত্তোলন করিল। গুপ্ত-রাজবংশের দুর্বল বংশধর ও প্রতিনিধিরা মগধ-মালবকে কেন্দ্ৰ করিয়া কোনও প্রকারে একদা-প্রদীপ্ত সূর্যের স্মৃতি একটি ক্ষুদ্র দীপশিখায় জিয়াইয়া রাখিলেন। বাঙলাদেশও এই সুযোগ গ্রহণে অবহেলা করিল না। সর্বাগ্রে স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিল পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গ এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান অঞ্চল। ৫০৭-৮ খ্ৰীষ্টাব্দে ত্রিপুরা অঞ্চল অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ বৈন্যগুপ্তের অধীন ছিল; বর্ধমান অঞ্চল তখন বৈন্যগুপ্তের সামন্ত বিজয়সেনের শাসনাধীনে। অনুমান হয়, এই অঞ্চল হইতে আরম্ভ করিয়া ত্রিপুরা পর্যন্ত বৈন্যগুপ্তের রাজ্য বিস্তৃত ছিল; এই অঞ্চলই ষষ্ঠ শতকের প্রথম অথবা দ্বিতীয় পাদে, ৫০৭-৮’র কিছু পরে, স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিয়া বসিল। এই শতকের শেষ পাদে কোনও সময়ে স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিল গৌড়। গৌড় ও বঙ্গের স্বাতন্ত্র্যের ইতিহাসই ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় পাদ হইতে সপ্তম শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাঙলাদেশের ইতিহাস; এবং এই ইতিহাস একদিকে ধর্মাদিত্য-গোপচন্দ্ৰ —সমাচার দেবের রাজবংশ এবং অন্যদিকে গৌড়াধিপ শশাঙ্ককে আশ্রয় করিয়া কেন্দ্রীকৃত।
