গুপ্তাধিকারের কেন্দ্ৰ
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পুত্র প্রথম কুমারগুপ্তের আমল হইতে একেবারে প্রায় ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙলার গুপ্ত রাজত্বের প্রধানতম কেন্দ্র ছিল পুণ্ড্রবর্ধন ৷ ৫০৭-৮ খ্ৰীষ্টাব্দের আগে কোনও সময় সমতটেও গুপ্তাধিকার বিস্তৃত হইয়াছিল, এ-সম্বন্ধে লিপি-প্রমাণ বিদ্যমান; এই সময়ে মহারাজ বৈন্যগুপ্ত নামে একজন গুপ্তাস্ত্য নামীয় রাজা ত্রিপুরা জেলায় কিছু ভূমিদান করিয়াছিলেন। সম্ভবত বৈন্যগুপ্ত গুপ্তরাষ্ট্রেই সামন্ত-রাজরূপে পূর্ববাঙলায় রাজত্ব করিতেছিলেন, পরে গুপ্তরাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগ লইয়া দ্বাদশাদিত্য এবং মহারাজাধিরাজ উপাধি লইয়া স্বাধীন স্বতন্ত্র নরপতিরূপে খ্যাত হইয়াছিলেন। যাহা হউক, নিঃসংশয় ঐতিহাসিক তথ্য এই যে, ষষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এবং সম্ভবত একেবারে শেষ পর্যন্ত বাঙলাদেশ গুপ্তাধিকারভুক্ত ছিল এবং এই রাজ্যখণ্ডের প্রধান কেন্দ্র ছিল পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তি। এই রাষ্ট্রবিভাগ এত গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া গণ্য হইত যে, সম্রাট স্বয়ং ইহার শাসনকর্তা—উপরিক বা উপরিক-মহারাজ-নিযুক্ত করিতেন, কখনো কখনো স্বয়ং বিষয়াপতিও নিযুক্ত করিতেন। সময়ে সময়ে উপরিক-মহারাজ হইতেন একেবারে রাজকুমারদেরই একজন।
সামাজিক ইঙ্গিত; শিল্প-ব্যাবসা-বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি, সওদাগরী ধনতন্ত্র
গুপ্তাধিকারে বাঙলাদেশে সুবর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন প্রায় সর্বব্যাপী বলিলেই চলে। সুবর্ণমুদ্রা ছিল দিনার এবং রৌপ্য মুদ্রা রূপক। সাধারণ গৃহস্থীরাও ভূমি ক্ৰয়-বিক্রয়ে সুবর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ব্যবহার করিতেছেন, প্রত্যেকটি লিপির সাক্ষ্য তাঁহাই। প্রাচীন বাঙলার সর্বোত্তম সমৃদ্ধিও এই যুগেই। রক্তমৃত্তিকা (মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটি)-বাসী বণিক বুধগুপ্ত এই সময়েরই লোক; তিনি মালয় অঞ্চলে গিয়াছিলেন ব্যাবসা-বাণিজ্য ব্যপদেশে। সোমদেবের কথাসরিৎসাগর, বিদ্যাপতির পুরুষপরীক্ষা, হাজারিবাগ জেলার দুধপানি পাহাড়ের লিপি, বাৎস্যায়নের কামশাস্ত্ৰ প্রভৃতির ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সাক্ষ্য এই যুগেরই অন্তর্দেশি ও বহির্দেশি বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির দিকে ইঙ্গিত করে। নিকষোত্তীর্ণ, সুমুদ্রিত এবং যথানির্দিষ্ট ওজনের সুবর্ণমুদ্রার বহুল প্রচলনও দেশের আর্থিক সমৃদ্ধির দ্যোতক। মনে হয়, নিয়মিত এবং সুসংবদ্ধ প্ৰণালীগত রাষ্ট্র শাসন-ব্যবস্থার ফলে দেশের অন্তর্গত ও সমাজগত-ব্যবস্থার, তথা বাণিজ্য-ব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব হইয়াছিল এবং তাহারই ফলে দেশের এই সমৃদ্ধি। প্রত্যক্ষ প্রমাণ নাই, কিন্তু পরোক্ষ প্রমাণ বিদ্যমান। এই যুগের প্রায় প্রত্যেকটি লিপিতেই দেখিতেছি, স্থানীয় রাষ্ট্রাধিকরণ (বিষয়াধিকরণ) যে পাচটি লোক লইয়া গঠিত তাহার মধ্যে দুইজন বোধ হয় রাজপুরুষ, বাকী তিনজনই শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি—নগরশ্রেষ্টী, প্রথম সার্থিবাহ এবং প্রথম কুলিক। ব্যাবসা-বাণিজ্যের সমৃদ্ধি ছিল বলিয়াই রাষ্ট্রে এই সব সম্প্রদায়ের প্রাধান্যও স্বীকৃত হইয়াছিল; অথবা এমনও হইতে পারে এই সমৃদ্ধির পশ্চাতে রাষ্ট্রের সজ্ঞান একটা চেষ্টা ছিল এবং সে-চেষ্টারই কতকটা রূপ আমরা দেখিতেছি। এই রাষ্ট্রাধিকরণগুলিতে। বঙ্গের বাহিরে অন্য রাষ্ট্রবিভাগের সাক্ষ্য যদি পুণ্ড্রবর্ধনের পক্ষেও প্রমাণিক হয়, তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয়, শ্ৰেষ্ঠী, সার্থিবাহ ও কুলিক প্রত্যেক সম্প্রদায়েরই নিজ নিজ নিগম বা সংঘ ছিল, নিজেদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষা ও বিস্তারের জন্য এবং প্রত্যেক নিগম বা সংঘের যিনি প্রধান সভাপতি ছিলেন তিনিই স্থানীয় রাষ্ট্রাধিকরণের সভ্য হইতেন, ইহা অসঙ্গত অনুমান নয়। রাষ্ট্রে বণিক, শ্রেষ্ঠী ও ব্যবসায়ী সমাজের এই আধিপত্য, দেশীয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি, সুবর্ণমুদ্রার প্রচলন, বাৎস্যায়ন-বর্ণিত নাগর-জীবনের বিলাস-লীলা, এই সমস্তই সওদাগরী ধনতন্ত্রের দিকে নিঃসংশয় ইঙ্গিত দান করে। এই যুগের বাঙলার সামাজিক ধন শ্রেষ্ঠী-বণিক-ব্যবসায়ী সমাজের আয়ত্তে এবং সেই ধনেই রাষ্ট্র পুষ্ট। সামাজিক ধন উৎপাদন ও বণ্টনের সাধারণ নিয়মে রাষ্ট্র যেমন ইহাদের পোষক ও সমর্থক, ইহারাও তেমনই রাষ্ট্রের প্রধান ধারক ও সমর্থক। শুধু ভূমি ক্রয়-বিক্রয়—দানের ব্যাপারে নয়, স্থানীয় সকল ব্যাপারে এই সমাজই অন্যতম কর্তা; এমন কি, লিপি-প্রমাণ দেখিলে মনে হয়, রাজপুরুষকেও বোধ হয়। ইহাদের নির্দেশ মান্য করিয়া চলিতে হইত। এই সব সাক্ষ্য-প্রমাণ ও তথ্য রাষ্ট্র-বিন্যাস অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচিত হইয়াছে; এখানে রাজবৃত্তের আবর্তন-রিবর্তন প্রসঙ্গে সেই ইঙ্গিতগুলির উল্লেখ রাখিয়া যাইতেছি মাত্র। লক্ষণীয় এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষিসমাজের কোনও স্থান রাষ্ট্রে প্রায় নাই বলিলেই চলে। কৃষি ও সাধারণ গৃহস্থ-সমাজ তো নিশ্চয়ই ছিল; ভূমি মাপ-জোখ, পট্টোলী-রেজেস্ক্রির সাক্ষী ইত্যাদি ব্যাপারে তাহারা স্থানীয় অধিকরণের সাহায্যও করিতেছেন, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রে তাহদের প্রাধান্য তো নাই-ই, স্থানও নাই। এই যুগের দুইটি মাত্র লিপিতে (ধনাইদহ লিপি, ৪৩২-৩৩ এবং ৩ নং দামোদরপুর লিপি, ৪৮২-৮৩) ভূমি ক্ৰয়-বিক্রয় ব্যাপারে রাজপ্রতিনিধির (আয়ুক্তক) সঙ্গে রাজকাৰ্য নির্বাহ যাঁহারা করিতেছেন। তঁহাদের মধ্যে বিত্তবান ব্যবসায়ী-সমাজের প্রতিনিধিদের কাহাকেও দেখিতেছি না, পরিবর্তে দেখিতেছি স্থানীয় মহত্তর (প্রধান প্রধান লোক), গ্রামিক। (গ্রাম-প্রধান), কুটুম্বিক (সাধারণ গৃহস্থ) এবং অষ্টকুলাধিকরণদের। ধনাইদহ-পট্টোলী-উল্লিখিত ভূমি খাদ্য (খাটা?) পার-বিষয়ের অন্তর্গত; দামোদরপুর-পট্টোলীর নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। পলাশবৃন্দকের অধিকরণ হইতে। মনে হয়, এই দুইটি স্থানীয় অধিকরণ-শাসিত জনপদখণ্ডে শিল্প-বাণিজ্য-ব্যবসায়ে প্রসিদ্ধি ছিল না এবং শ্রেষ্ঠী-বণিক-ব্যবসায়ী শিল্পীকুলের কোনও নিগম বা সংঘ ছিল না। বস্তুত, এই সব অধিকরণ গ্রামাধিকরণ; তবে, স্থানীয় সমাজ একান্তভাবে কৃষিসমাজ না-ও হইতে পারে, কারণ মহত্তর, গ্ৰমিক, কুটুম্বিারা সকলেই যে কিছু সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর ছিলেন, এমন কথা নিঃসংশয়ে বলা যায় না। মধ্যবিত্ত সমাজ তো একটা ছিলই, সেই সমাজের লোকেরা ভূমিলব্ধ আয়নির্ভর যেমন ছিলেন, তেমনই কিছুটা পরিমাণে শিল্প-বাণিজ্য-ব্যবসায়নির্ভরও বোধ হয় ছিলেন।
