বাধা ও বিরোধ গড়িয়া তোলা সত্ত্বেও সমসাময়িক বাঙলার প্রাচীন কোমগুলি এই প্রভাব ঠেকাইতে পারে নাই। রাষ্ট্ৰক্ষেত্রে পরাভব স্বীকারের প্রধান সামাজিক কারণ, এই সব প্রাচীন কোমগুলি তাহদের কৌম-সামাজিক মন পরিত্যাগ করিয়া কোমসীমা অতিক্রম করিয়া রাজতন্ত্রের বৃহত্তর সামাজিক ও রাষ্ট্ৰীয় পরিধির মধ্যে স্থায়ীভাবে ঐক্যবদ্ধ হইতে পারে নাই; নিজ নিজ কৌম স্বাৰ্থ বুদ্ধিই বোধ হয় এই পরাভাবের কারণ। রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাহিরের বিজেতা রাষ্ট্রগুলির উন্নততর উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উন্নততর শস্ত্র ও যুদ্ধপ্রণালী নিঃসন্দেহে যেমন পরাভাবের অন্যতম কারণ, তেমনই উহাদের উন্নততর সামাজিক ব্যবস্থাও ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পরাভাবের হেতু, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ স্বল্প। আর, অর্থ ও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পরাভব ঘটিলে ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও অল্পবিস্তুর পরাভব ঘটা যে অনিবার্য তাহা তো আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে বারবারই দেখা গিয়াছে, এমন কি সুপ্রাচীন সংস্কৃতি-সম্পন্ন চীন ও ভারতবর্ষের মতন দেশেও।
০৪. বাঙলায় গুপ্তাধিপত্য – আঃ ৩০০-৫৫০ খ্ৰীষ্টাব্দ
খ্ৰীষ্টোত্তর তৃতীয় শতকের শেষ বা চতুর্থ শতকের সূচনা হইতেই প্রাচীন বাঙলাদেশ যে নিঃসংশয়ে কৌম সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থা অতিক্ৰম করিয়া আসিয়াছে, তাহার কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। কৌমতন্ত্র আর নাই; রাজতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছে; রাষ্ট্রীয় চেতনায় সঞ্চার হইয়াছে; বাহির হইতে আক্রমণের প্রতিরোধ সংঘবদ্ধ হইয়াছে; জনপদগুলির কৌম-নাম জনপদ-নামে বিবর্তিত হইতে আরম্ভ করিয়াছে; পুষ্করণ, সমতট প্রভৃতি নূতন রাজ্যের নাম শুনা যাইতেছে, যদিও বঙ্গ এবং অন্যান্য রাজ্যও, বিদ্যমান।
বঙ্গজনসমূহ
দিল্লীর কুতুব-মিনারের কাছে মেহেরোলি-লৌহস্তম্ভের লিপিতে চন্দ্ৰ নামক এক রাজা বঙ্গজনপদ সমূহে (বঙ্গেযু) তাহার শত্রু নিধনের গৌরব দাবি করিতেছেন। “বঙ্গেযু’ অর্থে বঙ্গ ও তৎসংলগ্ন জনপদগুলি বুঝাইতে পারে, আবার বঙ্গের অন্তর্গত বিভিন্ন ক্ষুদ্রতর জনপদখণ্ডও বুঝাইতে পারে। যে-অর্থেই হউক, মেহেরোলি-লিপিতে একথাও বলা হইয়াছে যে, বঙ্গীয়েরা একত্র সংঘবদ্ধ হইয়া রাজা চন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ রচনা করিয়াছিল। এই চন্দ্ৰ কে, তাহা লইয়া ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিচিত্র মত আছে। কাহারও মতে ইনি গুপ্তসম্রাট প্রথম চন্দ্ৰগুপ্ত, কাহারও মতে দ্বিতীয় চন্দ্ৰগুপ্ত; কেহ কেহ আবার মনে করেন ইনি সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ –লিপির চন্দ্ৰবৰ্মা, যে-চন্দ্ৰবৰ্মা ছিলেন সিংহবর্মার পুত্র এবং পুষ্করণের অধিপতি (শুশুনিয়া-লিপি)। অথবা, এমনও হইতে পারে, তিনি একেবারে স্বতন্ত্র নরপতি ছিলেন। ইনি যিনিই হউন, এ-তথ্য সুস্পষ্ট যে, বঙ্গাজনেরা চন্দ্রের আক্রমণ পর্যন্ত স্বাধীন ও স্বতন্ত্র এবং চন্দ্রের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ রচনা করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাহারা পরাভূত হইয়াছিলেন।
পুষ্করণ
বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ের একটি লিপিতে সিংহবর্মর পুত্র পুঙ্করণাধিপ চন্দ্ৰবৰ্মা নামক এক রাজার খবর পাওয়া যাইতেছে। শুশুনিয়া পাহাড়ের প্রায় ২৫ মাইল উত্তর-পূর্বদিকে বর্তমান পোখর্ণ গ্রাম প্রাচীন পুষ্করণের স্মৃতি আজও বহন করিতেছে বলিয়া মনে হয়। এই পুষ্করণাধিপই বোধ হয় সমসাময়িক রাঢ়ের অধিপতি। কেহ কেহ মনে করেন, ইনিই এলাহাবাদ-লিপি-কথিত এবং গুপ্তসম্রাট সমুদ্রগুপ্ত কর্তৃক পরাজিত চন্দ্ৰবৰ্মা।
সমতট, ডবাক
সমুদ্রগুপ্ত পুষ্করণাধিপ চন্দ্রবর্মকে পরাজিত করিয়াছিলেন। কিনা, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ থাকিলেও তিনি যে সমতট ছাড়া প্রাচীন বাঙলার আর প্রায় সকল জনপদই গুপ্ত-সাম্রাজ্যভুক্ত করিয়াছিলেন, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। তাহার বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যের পূর্বতম প্রত্যন্ত রাজ্য ছিল নেপাল, কর্তৃপুর, কামরূপ, ডবাক এবং সমতট। সমতট নিঃসন্দেহে দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গের কিয়দংশ, ত্রিপুরা অঞ্চল যাহার কেন্দ্র। কিন্তু, প্রত্যন্ত রাজ্য হইলেও সমতটের রাজা সমুদ্রগুপ্তের আদেশ পালন করিতেন এবং তাঁহাকে যথোচিত সম্মান ও করোপহার দান করিতেন। সমুদ্রগুপ্তই বাঙলায় প্রথম গুপ্তাধিকার প্রতিষ্ঠা করেন নাই। সে-অধিকার বোধ হয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তেরও আগে কোনও রাজা প্রতিষ্ঠা করিয়া থাকিবেন। চীন পরিব্রাজক ইৎ-সিঙ বলিতেছেন, মহারাজ শ্ৰীগুপ্ত নামে একজন নরপতি চীন দেশীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য গঙ্গার তীর ধরিয়া নালন্দা হইতে চল্লিশ যোজন পূর্বে মি-লি-কিয়া- সি-কিয়া-পো-নো নামে একটি ধর্মস্থান নির্মাণ করাইয়া দিয়াছিলেন এবং মন্দিরের ব্যয় নির্বাহের জন্য চব্বিশটি গ্রাম দান করিয়াছিলেন। মহারাজ শ্ৰীগুপ্তের এবং সমুদ্রগুপ্তের প্রপিতামহ মহারাজ গুপ্ত (আনুমানিক তৃতীয় শতকের তৃতীয় বা চতুর্থ পাদ) বোধ হয় একই ব্যক্তি; এবং ইৎ-সিঙ-কথিত মি-লি-কিয়া —সি—কিয়া-পো-নো এবং বরেন্দ্রভূমির মৃগস্থাপন স্তুপ (মি-লি-কিয়া —সি—কিয়া-পো-নো =মৃগস্থাপন) একই ধর্মস্থান। এ-তথ্য যদি সত্য হয়, তাহা হইলে স্বীকার করিতে হয় যে, বরেন্দ্ৰভূমির তৃতীয় শতকের তৃতীয়-চতুর্থ পাদেই গুপ্তাধিপত্য স্বীকার করিয়াছিল। কিছু পরবর্তীকালে বাঙলাদেশে পুণ্ড্রবর্ধন যে গুপ্ত-সাম্রাজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্ৰ হইয়া উঠিয়াছিল এবং সেখানকার উপরিক বা উপরিক মহারাজ যে সম্রাট নিজে নিয়োগ করিতেন—কখনো কখনো রাজকুমারদের একজনই নিযুক্ত হইতেন—তাহার ইঙ্গিত একেবারে অকারণ না-ও হইতে পারে। মেহেরোলি-লিপির চন্দ্ৰ যদি প্রথম চন্দ্ৰগুপ্ত হইয়া থাকেন তাহা হইলে তিনি বঙ্গজনদের জয় করিয়াছিলেন, এ-তথ্য স্বীকার করা চলে। প্রথম চন্দ্রগুপ্তের পুত্র সমুদ্রগুপ্ত পুষ্করণাধিপ চন্দ্রবর্মকে পরাজিত করিয়া রাঢ়দেশ অধিকার করিয়াছিলেন, এ-তথ্যের সম্ভাবনাও। অস্বীকার করা যায় না। এলাহাবাদ-লিপির সাক্ষ্য যদি প্রামাণিক হয় তাহা হইলে অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, সমতট ছাড়া বাঙলাদেশের আর সকল অংশেই সমুদ্রগুপ্তের বিস্তৃত সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রানুগত্য স্বীকার করিয়াছিল।
