কুষাণ মুদ্রা, মুরাণ্ড
কুষাণ-আমলের কিছু কিছু সুবর্ণ ও অন্য ধাতব মুদ্রা বাঙলাদেশে পাওয়া গিয়াছে। মহাস্থানের ধ্বংসস্তুপেও কনিষ্কের (?) মূর্তি-চিহ্নিত একটি সুবর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হইয়াছে। বাঙলাদেশের কুষাণাধিপত্যের কোনও অকাট্য প্রমাণ নাই; এই সব মুদ্রা হয়তো বাণিজ্যসূত্রে এখানে আসিয়া থাকিবে। তবে, টলেমি গঙ্গার পূর্বদিকে (India Extra-Gangem-Si) কোনও স্থানে Murandooi নামে এক কৌমজনপদের উল্লেখ করিয়াছেন। এই মুরগুরা পঞ্জাব অঞ্চলের সুপরিচিত মুরুগুদের সঙ্গে সম্পূক্ত হইলেও হইতে পারেন। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদািস্তম্ভলিপিতে কুষাণ রাজবংশ এবং শাক-মুরুগুদের উল্লেখ আছে। শাক-মুরুগু বলিতে কেহ বুঝেন, “শক-প্রধান’, কেহ-প্ৰা মনে করেন। শাক এবং মুরগু দুইটি পৃথক কাম। টলেমির উল্লেখ হইতে মনে হয়, মুরগু বা মুরুগু এক স্বতন্তু কোম। ইহারা যদি কখনো বাঙলাদেশের অধিবাসী হইয়া থাকেন, তাহা হইলে শক এবং কুষাণ জনগোষ্ঠী সম্পূক্ত মুরুদণ্ডরা হয়তো প্রথম বা দ্বিতীয় শতকে কখনো বাঙলাদেশে আধিপত্য বিস্তার করিয়া থাকিবেন এবং কুষাণ মুদ্রার প্রচলন তাহারাই করিয়া থাকিবেন। তবে, এ সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছুই বলিবার উপায় নাই।
সামাজিক ইঙ্গিত, আর্থিক ও বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি
বস্তুত, গ্ৰীক-লাতিন লেখকবৰ্গ-কথিত গঙ্গারাষ্ট্র এবং মৌর্য-আমলের পর হইতে আরম্ভ করিয়া খ্ৰীষ্টোত্তর চতুর্থ শতকের প্রারম্ভে গুপ্তরাজবংশ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত প্রাচীন বাঙলার রাজবৃত্তকাহিনী সম্বন্ধে স্বল্প তথ্যই আমরা জানি। দুই চারিটি বিচ্ছিন্ন সংবাদ ছাড়া রাজা, রাজবংশ বা রাষ্ট্র সম্বন্ধে কিছুই নিশ্চয় করিয়া বলিবার উপায় নাই। অথচ, পেরিপ্লাস ও টলেমির বিবরণ, মিলিন্দপঞহ, জাতকের গল্প, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র প্রভৃতি গ্রন্থে দেখিতেছি, এই সময়ে বাঙলাদেশে সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত ব্যাবসা-বাণিজ্যের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত; বাণিজ্যসূত্রে ভারতবর্ষের অন্যান্য দেশ এবং ভারতের বাহিরে বিদেশের সঙ্গে—একদিকে মিশর ও রোম সাম্রাজ্য, অন্যদিকে পূর্ব-দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ও দ্বীপপুঞ্জ এবং চীন-তাহার যোগাযোেগ। বৌদ্ধধর্ম প্রচার সূত্রে সিংহল ও পূর্ব-দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগেরও কিছু কিছু পরিচয় পাওয়া যাইতেছে। রাষ্ট্র ও সমাজগত শাসন শৃঙ্খলা বর্তমান না থাকিলে এই ধরনের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, বিশেষভাবে সুসমৃদ্ধ, সুদূরপ্রসারী অন্তঃ ও বহির্বাণিজ্য কিছুতেই সম্ভব হইতে না। সুবর্ণমুদ্রার প্রচলনও এই অনুমানের অন্যতম ইঙ্গিত। এই যুগের বিভিন্ন বাণিজ্যিক দ্রব্বাসম্ভারের কথা পেরিপ্লাস ও টলেমির বিবরণে সবিশেষ উল্লিখিত আছে; ধনসম্বল ও ব্যাবসা-বাণিজ্য প্রসঙ্গে তাহা আলোচনাও করিয়াছি। সোনা, মনি-মুক্তা, বিচিত্ৰ সূক্ষ্ম রেশম ও কার্পাস বস্ত্ৰ, নানাপ্রকার মসলা ও গন্ধদ্রব্য ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে দেশ-বিদেশে রপ্তানী হইত এবং তাহার ফলে দেশে প্রচুর অর্থাগম হইত। তাহা ছাড়া, যুদ্ধের ও যানবাহনের একটি মস্ত বড় উপকরণ-হস্তী-প্রাচীন বাঙলা ও কামরূপ হইতে ভারতের ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে যাইত, তাহার প্রমাণ তো বারবার পাওয়া যায়। দিয়োদোরস ও পুতার্ক ঔগ্রসৈন্যের সৈন্যবাহিনীর যে বিবরণ দিতেছেন তাহার তুলনামূলক আলোচনা হইতে মনে হয়, প্রাচ্য বাহিনীতে যেমন গঙ্গারাষ্ট্র বাহিনীতেও তেমনই যথেষ্ট সংখ্যক হস্তী ছিল। মহাভারত ও অর্থশাস্ত্রের সাক্ষ্য পুনরুল্লেখ করিয়া লাভ নাই। যাহাঁই হউক, এই আমলে বাঙলাদেশ নানা ধনরত্নে ও উৎপন্ন দ্রব্যাদিতে খুবই সমৃদ্ধ ছিল, সন্দেহ নাই; এবং এই সমৃদ্ধির আকর্ষণেই মহাপদ্মনন্দ হইতে আরম্ভ করিয়া গুপ্তদের আমল পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন রাজবংশ একের পর এক বাঙলাদেশে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করিয়াছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সফলকামও হইয়াছেন। আর, বাণিজ্য-বিস্তারের চেষ্টা তো মিশর দেশ হইতে আরম্ভ করিয়া চীন পর্যন্ত সকলেই করিয়াছে। মহাবোধিবংশ-গ্রন্থে মহাপদ্মনদের কনিষ্ঠতম পুত্রের নাম পাইতেছি। ধন (নন্দ); এই ধননন্দ সম্বন্ধে সিংহলী মহাবংশ-গ্রন্থে বলা হইয়াছে, এই রাজা প্রভূত ধন সংগ্ৰহ করিয়াছিলেন নানা ন্যায় ও অন্যায় উপায়ে; ধনের পরিমাণ দেওয়া হইয়াছে আশি কোটি; বোধ হয়। সুবর্ণমুদ্রাই হইবে; এই ধন তিনি গঙ্গার নীচে এক সুড়ঙ্গের ভিতর লুকাইয়া রাখিতেন। য়ুয়ান-চোয়াঙও এ-বিষয়ে সাক্ষ্য দিতেছেন। কথাসরিৎসাগরের এক গল্পেও আছে যে, নন্দরাজের ধনের পরিমাণ ছিল নিরানব্বই কোটি সুবর্ণখণ্ড (মুদ্রা?)। নন্দদের এই বিপুল অর্থ ও সম্পদের কতকটা অংশ যে গঙ্গারাষ্ট্র হইতে সংগৃহীত হইত এ-সম্বন্ধে তো কোনও সন্দেহ থাকিতে পারে না। মৌর্যরাও নিশ্চয়ই এই বিপুল ধনের অধিকারী হইয়াছিলেন; বিশেষত কৌটিল্য অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার যে-ইঙ্গিত দিতেছেন তাহাতে তো রাজকোষে প্রচুর অর্থগম হওয়ার কথা। এ-বিষয়ে কিছু পরোক্ষ প্রমাণও মহাস্থান শিলাখণ্ডলিপিতে সুবর্ণমুদ্রার প্রচলন ইত্যাদি সাক্ষ্যে পাওয়া যাইতেছে।
আর্যীকরণ ও পরাভাবের হেতু
মধ্য ও উত্তর-ভারত হইতে যে-সব রাজবংশ, যে-সব বণিক ও ব্যবসায়ী যুদ্ধ, রাষ্ট্রকর্ম ও ব্যাবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে বাঙলাদেশে আসিয়াছেন, তাহারাই সঙ্গে সঙ্গে মধ্য ও উত্তর-ভারতের আর্য-ভাষা, আর্য-ধর্ম এবং আর্য-সংস্কৃতিও বহন করিয়া আনিয়াছেন। তাহারাই পথ ও ক্ষেত্র রচনা করিয়াছেন এবং সেই পথ বাহিয়া সেই সব ক্ষেত্রে আসিয়া আর্য অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিয়াছেন আর্য-ধর্ম ও শিক্ষার প্রচারকেরা। প্রথমে জৈন-ধর্ম ও সংস্কৃতি, পরে বৌদ্ধ-ধর্ম ও সংস্কৃতি এবং আরও পরে, বিশেষ ভাবে গুপ্ত আমলে পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য-ধর্ম ও সংস্কৃতি ক্রমশ বাঙলাদেশে বিস্তার লাভ করিয়াছে। যে-আমলের কথা বলিতেছি, সেই আমলে বিশেষভাবে অগ্নি জৈন ও বৌদ্ধধর্মের প্রভাব, এবং দুই ধর্মকে আশ্ৰয় করিয়া আৰ্য ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি।
