নন্দ বংশাধিকার
এই যুক্তরাষ্ট্রের রাজা ছিলেন Agrammes বা Xandrammes =ঔগ্রসৈনা=উগ্রসেনের পুত্র। পুরাণে যাহাকে বলা হইয়াছে মহাপদ্মনন্দ তাহাকেই বোধ হয় মহাবোধিবংশ-গ্রন্থে উগ্ৰসেন বলা হইয়াছে। Agrammes নীচকুলোদ্ভব” নাপিতের পুত্র ছিলেন, এ-সাক্ষ্য পূর্বোক্ত লেখকেরাই দিতেছেন; হেমচন্দ্রের পরিশিষ্টপর্ব নামক জৈন গ্রন্থেও মহাপদ্মানন্দকে বলা হইয়াছে নাপিত-কুমার। পুরাণে কিন্তু মহাপদ্মনন্দকে, শূদ্রোগর্ভোদ্ভব বলা হইয়াছে। মহাপদ্মকে আরও বলা হইয়াছে, “সর্বক্ষত্রাস্তুক নৃপঃ” এবং “একরাট্”। যিনি কাশী, মিথিলা, বীতিহোত্ৰ, ইক্ষবাকু, কুরু, পঞ্চাল, হৈহয় ও কলিঙ্গদের পরাভূত করিয়াছিলেন তাহার পক্ষে গঙ্গারাষ্ট্র স্বীয় প্রাচ্য রাজ্যের অন্তর্গত করা কিছু অসম্ভব নয়। যাহাই হউক, আজ এ-তথ্য সুবিদিত যে, ঔগ্রসৈন্যের সমবেত প্রাচ্য-গঙ্গারাষ্ট্রের সুবৃহৎ সৈন্য এবং তঁহার প্রভূত ধনরত্ন পরিপূর্ণ রাজকোষের সংবাদ আলেকজান্দারের শিবিরে পৌছিয়ছিল এবং তিনি যে বিপাশা পার হইয়া পূর্বদিকে আর অগ্রসর না হইয়া ব্যাবিলনে ফিরিয়া যাইবার সিদ্ধান্ত করিলেন, তাহার মূলে অন্যান্য কারণের সঙ্গে এই সংবাদগত কারণটিও অগ্রাহ্য করিবার মতন নয়।
মৌর্যাধিকার
মৌর্য-সম্রাট চন্দ্ৰগুপ্ত নন্দবংশ ধ্বংস করিয়া সুবিস্তৃত নন্দ-সাম্রাজ্য, নন্দ-সৈন্যসামন্ত এবং প্রভূত ধনরত্নপূর্ণ নন্দ-রাজকোষের উত্তরাধিকারী হইয়াছিলেন। মহাপদ্মনন্দ ও তাহার পুত্রদের গঙ্গারাষ্ট্রও মৌর্য সাম্রাজ্যের করতলগত হইয়াছিল, এ-সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। প্রাচীন জৈন এবং বৌদ্ধগ্রন্থ, মহাস্থানে প্রাপ্ত শিলাখণ্ডলিপি এবং যুয়ান-চোয়াঙের সাক্ষ্য প্রামাণিক বলিয়া মানিলে স্বীকার করিতে হয়, পুণ্ড্রবর্ধন বা উত্তরবঙ্গ নিঃসন্দেহে মৌর্য-সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। য়ুয়ান-চোয়াঙ তো পুণ্ড্রবর্ধন ছাড়া প্রাচীন বাঙলার অন্যান্য জনপদেও (যথা কর্ণসুবর্ণ, তাম্রলিপ্তি, সমতট) মৌর্য-সম্রাট অশোক-নির্মিত বৌদ্ধস্তুপ ও বিহার দেখিয়াছিলেন বা তাহাদের বিবরণ শুনিয়াছিলেন বলিয়া বলিতেছেন। যদি তাহাই হয় তবে প্রাচীন বাঙলায় মৌর্য-রাষ্ট্রব্যবস্থাও প্রচলিত ছিল বলিয়া স্বীকার করিতে হয়। মহাস্থানের ব্রাহ্মী-লিপিতে দেখিতেছি, রাজধানী পুন্দনগলে (পুঞ্জনগরে) একজন মহামাত্র নিযুক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় রাজকোষ ও রাষ্ট্রশস্যভাণ্ডার গণ্ডক ও কাকনিক মুদ্রায় এবং ধান্যশস্যে পরিপূর্ণ ছিল। দুর্ভিক্ষের সময় প্রজাদের বীজ এবং খাদ্যদানের নির্দেশ কৌটিল্য দিতেছেন; তাহার পরিবর্তে প্রজাদের দুর্গ অথবা সেতু নিৰ্মাণ কার্যে নিযুক্ত করা হইত, অথবা রাজা ইচ্ছা করিলে কোনও শ্রম গ্ৰহণ না করিয়াও দান করিতে পারিতেন (দুর্ভিক্ষে রাজা বীজ-ভক্তোপগ্ৰহম কৃত্বানুগ্রহম কুৰ্য্যাৎ। দুর্গসেতুকর্ম বা ভক্তগনুগ্ৰহেণ ভকতসংবিভাগং বা ৷ অৰ্থশাস্ত্ৰ, ৪।৩৭৮)। মহাস্থান-লিপিতেও দেখিতেছি, কোনও এক অত্যায়িত কালে রাজা পুন্দনগলের মাহামাত্রকে নির্দেশ দিতেছেন, প্রজাদের ধান্য এবং গণ্ডক ও কাকনিক মুদ্রা দিয়া সাহায্য করিবার জন্য, কিন্তু সুদিন ফিরিয়া আসিলে ধান্য ও মুদ্রা উভয়ই রাজভাণ্ডারে প্রত্যাৰ্পণ করিতে হইবে, তাহাও বলিয়া দিতেছেন। বিনা শ্রমবিনিময়ে দান বা দুর্গ অথবা সেতু নির্মাণে শ্রম কোনও কিছুরই উল্লেখ এক্ষেত্রে করা হইতেছে না। লিপি-কথিত অত্যায়িক যে কী জাতীয় তাহাও বলা হয় নাই।
শুঙ্গ রাজাদের আমলেও বোধ হয় বাঙলাদেশ পাটলিপুত্ৰ-রাজ্যের অন্তর্গত ছিল, কিন্তু এ-সম্বন্ধে কোনও নিঃসন্দিগ্ধ প্রমাণ নাই। তবে শুঙ্গ শিল্পশৈলী এবং সংস্কৃতি বাঙলাদেশে প্রচলিত হইয়াছিল, এমন প্রমাণ কিছু কিছু পাওয়া গিয়াছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে গঙ্গাবন্দর
বাঙলাদেশে কিছু কিছু নানা চিহ্নাঙ্কিত (punch-marked) মুদ্রা পাওয়া গিয়াছে; এই সব মুদ্রা মৌর্য ও শুঙ্গ আমলের হইলেও হইতে পারে; নিশ্চয় করিয়া বলিবার উপায় নাই। তবে, খ্ৰীষ্টীয় প্রথম শতকে পেরিপ্লাস-গ্রন্থে নিম্নগাঙ্গেয় ভূমিতে “ক্যালটিস” নামক এক প্রকার সুবর্ণমুদ্রা প্রচলনের খবর পাওয়া যাইতেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের বাঙলাদেশ সম্বন্ধে পেরিপ্লাস-গ্রন্থ ও টলেমির বিবরণে আরও কিছু খবর পাওয়া যাইতেছে। যে-গঙ্গারাষ্ট্রের কথা গ্ৰীক ও লাতিন লেখকদের রচনায় পাওয়া গিয়াছে, সেই গঙ্গারাষ্ট্র একই রূপে ও শাসন-প্রকৃতিতে এই যুগেই ছিল কিনা বলা যায় না; তবে, গঙ্গারাষ্ট্রের রাজধানী গঙ্গাবিন্দর নগর তখনও বিদ্যমান। এই গঙ্গাবিন্দরে অতি সূক্ষ্ম কার্পােস বস্ত্ৰ উৎপন্ন হইত এবং ইহার সন্নিকটেই কোথাও সোনার খনি ছিল। গঙ্গা-বন্দরের অবস্থিতি যে কুমার-নদীর মোহনায়, অর্থাৎ প্রাচীন কুমারতালিক-মণ্ডলে, এই ইঙ্গিত আগেই করা হইয়াছে। ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়া অঞ্চলে প্রাপ্ত ষষ্ঠ শতকের একটি লিপিতে সুবর্ণবীথীর উল্লেখ্য, ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমায় সুবর্ণগ্রাম, মুন্সীগঞ্জ মহকুমার সোনারঙ্গ, সোনাকান্দি, বর্তমান বাঙলার পশ্চিম প্রান্তে সুবর্ণরেখা নদী, ইত্যাদি সমস্তই সুবৰ্ণ-স্মৃতিবহ। টলেমি নিম্ন-মধ্যবঙ্গে যে সোনার খনির কথা বলিতেছেন তাহা একান্ত কাল্পনিক না-ও হইতে পারে।
