সামাজিক ইঙ্গিত
সদ্যোক্ত জগতকের গল্প ও পালি মহানিদোস-গ্রন্থের ইঙ্গিত, মহাভারতে বঙ্গ ও পুঞ্জ-রাজগণ কর্তৃক যুধিষ্ঠিরের নিকট হস্তী, মুক্ত এবং মূল্যবান বস্ত্রাভরণ উপটৌকন আনয়ন, সমুদ্রতীরবাসী ম্লেচ্ছগণ কর্তৃক সুবর্ণ উপহার দান, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে প্রাচীন বাঙলাদেশজাত বিচিত্র দ্রব্যসম্ভারের বর্ণনা, মিলিন্দপঞহ-গ্রন্থে বাঙলার সমৃদ্ধ স্থল ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিবরণ, পেরিপ্লাস-গ্রন্থে, স্ট্র্যাবো ও প্লিনির বিবরণীতে বাঙলার বিচিত্র মূল্যবান বাণিজ্যিক দ্রব্যসম্ভারের বিবরণ প্রভৃতি পড়িলে মনে হয়, খুব প্রাচীন কাল হইতেই বাঙলাদেশ। কতকগুলি কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যে এবং খনিজ দ্রব্যে খুবই সমৃদ্ধ ছিল; বাঙলার হন্তীও উত্তর-ভারতীয় রাজনবর্গের লোভনীয় ছিল। এই সব সমৃদ্ধির লোভেই হয়তো উত্তর-ভারতের ক্ষমতাবান রাজা ও রাজবংশ পূর্ব ভারতের এই জনপদগুলির দিকে আকৃষ্ট হন এবং তঁহাদের রাষ্ট্ৰীয় ও অর্থনৈতিক প্রভূত্ব আশ্রয় করিয়া ধীরে ধীরে উত্তর-গাঙ্গেয়-ভূমির আর্যভাষা, ‘আর্যসমাজ ও সংস্কৃতির ধীরে ধীরে বাঙলায় বিস্তৃতি লাভ করে।
অঙ্গ (উত্তর-বিহার)-পুণ্ড্র-সুহ্ম-বঙ্গ-কলিঙ্গ কোমের লোকেরা, অন্ধ-পুঞ্জ- শবর-পুলিন্দ-মুতিব জনেরা যে সুপ্রাচীন বাঙলায় মোটামুটি একই নরগোষ্ঠীর লোক ছিলেন, এ-তথ্য ঐতরেয় ব্রাহ্মণের ঋষি এবং মহাভারতকারের বোধ হয় অজ্ঞাত ছিল না। আগে এক অধ্যায়ে দেখিয়াছি, ইহারা বোধহয় ছিলেন অস্ট্রিক-ভাষী আদি অস্ট্রলয়েড নরগোষ্ঠীর লোক, মঞ্জুশ্ৰীমূলকল্পের ভাষায় অসুর। উপরোক্ত বিচিত্র উল্লেখ হইতেই দেখা যায়, সেই সুপ্রাচীন কালেই ইহারা কোমবদ্ধ হইয়াছেন এবং এক একটি জনপদকে আশ্রয় করিয়া এক একটি বৃহত্তর কৌমসমাজ গড়িয়া উঠিয়াছে। এক কৌমসমাজের সঙ্গে অন্য কৌমসমাজে পরস্পর বিরোধ ঘটিতেছে, কখনো কখনো আবার পরস্পরের মৈত্রীবন্ধনও দেখা যাইতেছে। মহাভারতে তাহার আভাস পাওয়া যায়। ভারতযুদ্ধ গল্পের তিলমাত্র ঐতিহাসিকত্ব স্বীকার করিলেও ইহাও মানিয়া লইতে হয় যে, মাঝে মাঝে এই সব কোমী ঐক্যবদ্ধ হইয়া প্রতিবেশী জনপদরাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে মিলিত হইত। এবং উভয়ের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করিত। কৌমাবদ্ধ সমাজ যখন ছিল, সেই সমাজের একটা শাসন-শৃঙ্খলাও নিশ্চয়ই ছিল। তাহা না হইলে প্রাচীনতম বাঙলার যে সমৃদ্ধ বাণিজ্য-বিবরণের কথা বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য-পুরাণ গ্রন্থাদিতে পাঠ করা যায় এবং যাহার কয়েকটি সূত্র ইতিপূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি, সেই সমৃদ্ধ বাণিজ্য সম্ভব হইত না। কিন্তু এই শাসন শূঙ্খলার স্বরূপ কী ছিল বলা কঠিন। গোড়ার দিকে এই শাসন-ব্যবস্থা বোধ হয় কৌমতান্ত্রিক, কিন্তু, মহাভারতে ও সিংহলী বিবরণীতে যে-যুগের কথা পাইতেছি। সেই যুগে কৌমতন্ত্র রাজতন্ত্রে বিবর্তিত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু, প্রায় সর্বত্রই প্রাচীন গ্রন্থাদিতে যে-ভাবে বহুবচনে কোমগুলির নাম উল্লেখ করা হইয়াছে (যথা, পুণ্ডাঃ, বঙ্গাঃ, রাঢ়াঃ, সুহ্মাঃ ইত্যাদি) তাহাতে মনে হয়, রাজতন্ত্র সুপ্রচলিত হইবার পরও বহুদিন পর্যন্ত ঐতিহ্য ও লোকস্মৃতিতে কৌমতন্ত্রের স্মৃতি জাগরকে শুধু নয়, তাহার কিছু কিছু অভ্যাস এবং ব্যবস্থাও বোধ হয় প্রচলিত ছিল, বিশেষত শাসনকেন্দ্ৰ হইতে দূরে গ্রাম্য লোকালয়গুলিতে। প্রাচীন বাঙলায় রাজতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুপ্রচলিত হইতে হইতে মৌৰ্য-আমলের খুব আগে হইয়াছিল বলিয়া যেন মনে হয় না।
০৩. আঃ খ্রীস্টপূর্ব ৩৫০-৩০০
প্রাচীন গ্ৰীক ও লাতিন লেখকদের কৃপায় খ্ৰীষ্টপূর্ব শতকের তৃতীয় পাদে বাঙলার রাজবৃত্ত-কথা অনেকটা স্পষ্ট। এই গ্ৰীক ও লাতিন লেখকেরা আলেকজান্দারের ভারত-অভিযান সম্পর্কে এক সুবিস্তৃত সাহিত্য রচনা করিয়া গিয়াছেন; সে-সাহিত্য বর্তমান ঐতিহাসিকদের নিকট সুবিদিত, সুআলোচিত। কাজেই তাহার বিস্তৃত উল্লেখের প্রয়োজন নাই। এই প্রসঙ্গেই প্রথম শোনা যাইতেছে যে, বিপাশা নদীর পূর্বতীরে দুইটি পরাক্রান্ত রাষ্ট্র বিস্তৃত ছিল, একটি Prasioi বা প্রাচ্য এবং আর একটি Gangarida (পাঠান্তরে Gandaridal) বা গঙ্গারাষ্ট্র (?)। প্রাচ্য রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল Paliborthra বা পাটলীপুত্র, এবং গঙ্গারাষ্ট্রের Gange বা গঙ্গা (-নগর)। পেরিপ্লাস-গ্রন্থ ও টলেমীর বিবরণ হইতে জানা যায়, গঙ্গ-নগর সামুদ্রিক বাণিজ্যের বৃহৎ বন্দর ছিল; টলেমি আরও বলিতেছেন, এই গঙ্গা বন্দরের অবস্থিতি ছিল গাঙ্গেয় Kamberikhon-নদীর মোহনায়। Kamberikhon এবং কুমার নদী যে অভিন্ন তাহা আগেই এক অধ্যায়ের নদনদী-প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে! Gangarida-রা যে গাঙ্গেয় প্রদেশের লোক এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই, কারণ গ্ৰীক ও লাতিন লেখকরা এ সম্বন্ধে এক মত। দিয়োদোরািস-কাটিয়াস-প্লতার্ক-সলিন্যাস -প্লিনি-টলেমি-স্ট্র্যাবো প্রভৃতি লেখকদের প্রাসঙ্গিক মতামতের তুলনামূলক বিস্তৃত আলোচনা করিয়া হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী মহাশয় দেখাইয়াছেন যে, Gangaridai বা গঙ্গারাষ্ট্র গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্বতীরে অবস্থিত ও বিস্তৃত ছিল এবং প্রাচ্যরাষ্ট্র গঙ্গা-ভাগীরথী হইতে আরম্ভ করিয়া পশ্চিমদিকে সমস্ত গাঙ্গেয় উপত্যকায় বিস্তৃত ছিল। তাম্রলিপ্তি যে প্রাচ্য রাষ্ট্রের অন্তর্গত ছিল, ইহাও তাঁহারই অনুমান। রায়চৌধুরী মহাশয়ের এই অনুমান যুক্তিসম্মত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বলিয়া মনে করা যাইতে পারে। যাহা হউক, এই দুই রাষ্ট্রে পারস্পরিক সম্বন্ধ প্রসঙ্গে পূর্বোক্ত বিদেশী লেখকরা কী বলিতেছেন তাহা সংক্ষেপে উল্লেখ করা যাইতে পারে। কাটিয়াসের বিবরণী পড়িলে মনে হয়, প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্র দুই স্বতন্ত্র রাজ্য, কিন্তু খ্ৰীষ্টর জন্মের চতুর্থ শতকের তৃতীয় পাদে একই রাজার অধীন এবং একই রাষ্ট্রে সংবদ্ধ। দিয়োদোরসও বলিতেছেন, প্রাচ্য ও গঙ্গা একই রাষ্ট্র, একই রাজার অধীন। প্লুতার্ক এক জায়গায় বলিতেছেন, “the kings of the Gangaridai and the Prasioi”; অথচ আর এক জায়গার ইঙ্গিত যেন একটি রাজা এবং একটি রাষ্ট্রের দিকে। যাহাই হউক, এই সব উক্তি হইতে যেlঅনুমান সহজেই বুদ্ধিতে স্বীকৃতি লাভ করে তাহা এই যে, প্রাচ্য ও গঙ্গা দুইটি স্বতন্ত্র জনপদ-রাষ্ট্র হিসাবেই বিদ্যমান ছিল; দুই স্বতন্ত্র নামই তাহার প্রমাণ। কিন্তু চতুর্থ শতকের তৃতীয় পাদে কিংবা তাহার আগে কোনও সময় দুই জনপদ-রাষ্ট্র এক রাজার অধীনস্থ হয় এবং একটি যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয়, যদিও তাহার পরে খুব সম্ভব দুই জনপদের সৈন্যসামন্ত প্রভৃতির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ছিল। একদিকে কাটিয়াস-দিয়োদোরস এবং অন্যদিকে প্লুতার্কের সাক্ষ্য তুলনা করিয়া দেখিলে এ-অনুমান একেবারে অসঙ্গত বলিয়া মনে হয় না।
