আর্য যোগাযোগ
সদ্যোক্ত পুরাণকথাগুলির ঐতিহাসিক ইঙ্গিত লক্ষ করা যাইতে পারে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-গ্রন্থে পুণ্ড্র, শবর ইত্যাদি কোমদের এবং পুরাণ-মহাভারতে অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ-পুঞ্জ-সূহ্ম কোমগুলির উৎপত্তি সম্বন্ধে যে-আখ্যান বর্ণিত আছে তাহাতে স্পষ্টই অনুমিত হয় যে, এই সব আখ্যান এক সুদূর অতীতের স্মৃতি বহন করিয়া আনিয়াছে। সে-কালে আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির বাহকরা পূর্ব-প্রত্যন্ত এই সব দেশগুলিতে কেবল প্রথম পদক্ষেপ করিতেছেন মাত্র। কোনও বিজয় অভিযান নয়; ইহাদের মধ্যে যাঁহারা দুরন্ত, দুৰ্গম পথকামী তাহারাই শুধু আসিতেছেন দুঃসাহসী প্রথম পথিকৃতের মতো, যেমন বিশ্বামিত্রের অভিশপ্ত পঞ্চাশটি সন্তান। তাহার পরই আসিতেছেন প্রচারকের দল—একটি দুটি করিয়া, যেমন বৃদ্ধ অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমস। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ বড় বিচিত্র; প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মানুষ মানুষের সঙ্গে মিলনের যত কিছু বাধা-জাতি, সমাজ, আচার, ধর্ম, সকল কিছুর বাধা সবলে অতিক্রম করে। এই সব দুঃসাহসী পথিকৃৎ ও প্রচারক যখন দস্য, ম্লেচ্ছ, পাপ ও অসুর কোমদের মধ্যে আসিয়া পড়িলেন, তখন পরস্পরের সংযোগ ঘটিতে দেরী হইল না, প্রাকৃতিক নিয়মেই সকল বাধা ক্রমশ ঘুচিয়া যাইতে লাগিল, এবং বৃদ্ধ অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমাসও প্রকৃতির নিয়ম এড়াইতে পারিলেন না। কিন্তু, প্রাকৃতিক নিয়মও সক্রয় হইল বিরোধের মধ্য দিয়াই। কৰ্ণ, ভীম ও কৃষ্ণের যুদ্ধকাহিনী, পৌণ্ডুক-বাসুদেব কর্তৃক জরাসন্ধের সঙ্গে মৈত্রীবন্ধন, বঙ্গরাজ ও দুর্যোধনের মৈত্রীবন্ধন, আচারঙ্গসূত্রের গল্পে রাঢ়বাসীদের দ্বারা মহাবীর ও ওঁতাহার যতি সঙ্গীতের পশ্চাতে কুকুর লেলাইয়া দেওয়া, ঢ়িল ছোড়া, ইত্যাদি গল্পের ভিতর সেই বিরোধের স্মৃতি সুস্পষ্ট। এই সব কোমের লোকেরা সহজে বিনা যুদ্ধে বিনা প্রতিরোধে আর্য ভাষা ও সংস্কৃতির বাহকদের কাছে পরাভব স্বীকার করিতে রাজী হ’ন নাই। কিন্তু এ-ক্ষেত্রেও সমাজ-প্রকৃতির নিয়মই জয়ী হইল; উন্নততর উৎপাদন ব্যবস্থা, উন্নততর অস্ত্রশস্ত্রবিদ্যা, এবং উন্নততর ভাষা ও সংস্কৃতি জয়ী হইল।
আষীকরণের সূত্রপাত
প্রাথমিক পরাভব ও যোগাযোগের পর এই সব পূর্বদেশীয় কোমগুলি ক্রমশ আর্যসভ্যতা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি এবং আর্য সমাজ-ব্যবস্থার একপ্রান্তে স্থানলাভ করিতে আরম্ভ করিল। এই স্বীকৃতি ও স্থানলাভ একদিনে ঘটে নাই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া একদিকে এই সংঘাত ও বিরোধ এবং অন্যদিকে এই স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তি চলিয়াছিল, কখনও ধীর শান্ত, কখনও দ্রুত কঠোর প্রবাহে, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক পরাভব ঘটিয়াছিল। আগে; সংস্কৃতির পরাভব ঘটিয়াছে অনেক পরে। বস্তুত, এই সব কোমের ধর্ম ও আচারগত, ধ্যান ও বিশ্বাসগত পরাভব আজও সম্পূর্ণ হয় নাই; সামগ্রিক আর্যীকরণের ক্রিয়া আজও চলিতেছে, ধীরে ধীরে, আপাতদৃষ্টির অগোচরে। যাহাই হউক, খ্ৰীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকেও দেখিতেছি, রাঢ়দেশে আর্য জৈনধর্ম প্রচারকেরা বাধা ও বিরোধের সম্মুখীন হইতেছেন। স্থানে স্থানে এই বিরোধ তখনও চলিতেছে, সন্দেহ নাই। তবে, সঙ্গে সঙ্গে আর্য সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্বীকৃতি লাভও ঘটিতেছে; রামায়ণ-কাব্যে দেখিয়াছি, প্রাচীন বঙ্গের রাজন্যরা অযোধ্যার রাজবংশের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হইতেছেন। মানবধর্মশাস্ত্রে আর্যাবর্তের সীমা দেওয়া হইতেছে। পশ্চিম সমুদ্র হইতে পূর্ব সমুদ্র পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রাচীন বাঙলাদেশের অন্তত কিয়দংশও আর্যাবর্তের অন্তৰ্গত, এই যেন ইঙ্গিত। কিন্তু মনুই আবার পুণ্ড্রকোমের লোকদের বলিতেছেন ব্রাত্য বা পতিত ক্ষত্রিয় এবং তঁহাদের পংক্তিভুক্ত করিতেছেন দ্রাবিড়, শক, চীনদের সঙ্গে। মহাভারতের সভাপর্বে কিন্তু বঙ্গ ও পুণ্ড্রদের যথার্থ ক্ষত্রিয় বলা হইয়াছে; জৈন প্রজ্ঞাপনা-গ্রন্থেও বঙ্গ এবং রাঢ় কোম দুইটিকে আর্য কোম বলা হইয়াছে। শুধু তাহাই নয়, মহাভারতেই দেখিতেছি, প্রাচীন বাঙলার কোনও কোনও স্থান তীৰ্থ বলিয়াও স্বীকৃত ও পরিগণিত হইতেছে, যেমন পুণ্ড্র ভূমিতে করতোয়াতীর, সুহ্মদেশে ভাগীরথীর সাগরসঙ্গম। অর্থাৎ, বাঙলা এবং বাঙালীর আর্যীকরণ ক্রমশ অগ্রসর হইতেছে, ইহাই এই সব পুরাণ-কথার ইঙ্গিত।
প্রাচীন সিংহলী পালি-গ্ৰন্থ দীপবংশ ও মহাবংশ-কথিত সিংহবাহু ও তৎপুত্র বিজয়সিংহের লঙ্কবিজয়-কাহিনী সুবিদিত। আগেই বলিয়াছি, এই কাহিনীর লাল দেশ প্রাচীন বাঙলার রাঢ় হওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। বঙ্গ ও রাঢ়াধিপ সিংহবাহুর পুত্র পিতার ক্রোধের হেতু হইয়া রাজ্য হইতে নির্বাসিত হন। তিনি প্রথম সমুদ্রপথে ভারতের পশ্চিম সমুদ্রতীরের সোপারা (সুপ্পারক=শ্বপরিক) বন্দরে গিয়া বসতি আরম্ভ করেন, কিন্তু তাহার সঙ্গীদের অত্যাচারে সোপারার লোকেরা উত্যক্ত হইয়া উঠে। বিজয় সেই দেশও পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়া অবশেষে তাম্বাপঞ্জি দেশের (=তাম্রাপণী-বর্তমান লঙ্কা বা সিংহল) লঙ্কা নামক স্থানে ঢলিয়া যান। এবং সেখানে এক রাজ্য ও রাজবংশ স্থাপন করেন। সিংহলী ঐতিহ্যের মতে এই ঘটনার তারিখ এবং বুদ্ধদেবের পরিনির্বাণের তারিখ (অর্থাৎ ৫৪৪ খ্ৰীষ্টপূর্ব) একই। মোটামুটি ষষ্ঠ-পঞ্চম খ্ৰীষ্টপূর্ব শতকে এই ঘটনা ঘটিয়াছিল বলিয়া ধরা যাইতে পারে। প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যে তাম্রলিপ্তি-তাম্রাপণী বা সিংহল-ভরুকচ্ছ-সুপ্পারকের সামুদ্রিক বাণিজ্যের উল্লেখ একেবারে অপ্রতুল নয়। সমুদ-বৰ্ণিাৰ্জ-জাতক, শঙ্খ-জাতক, মহাজনক-জাতক ইত্যাদি গল্পে তাম্রলিপ্তি-সিংহলের বাণিজ্যের কথা বারবার উল্লিখিত আছে। এসব গল্পে খ্ৰীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতকের বাণিজ্যিক চিত্র প্রতিফলিত বলিয়া অনুমান করা যাইতে পারে। বিজয়সিংহ এই ধরনের কোনও প্রাচীন বাণিজ্য-নায়ক হইয়া থাকিবেন। পিতৃব্রোষে নির্বাসিত হইয়া সুপ্পারকে-সিংহলে নিজ ভাগ্যান্বেষণ করিতে গিয়া হয়তো রাজা হইয়া বসিয়াছিলেন।
