ঋগ্বেদে প্রাচীন বাঙলার একটি কোমেরও উল্লেখ নাই। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে পূর্ব-ভারতের অনেকগুলি ‘দস্য কোমের নাম পাওয়া যাইতেছে, তাহাদের মধ্যে পুণ্ড্রকোম একটি। এই সব ‘দস্য কোম্যদ্বারাই সমস্ত পূর্ব-ভারত তখন অধূষিত। ঐতরেয় আরণ্যকে বঙ্গ ও বগধ (মগধ?) জনদের ভাষা পাখির ভাষার সঙ্গে তুলিত হইয়াছে বলিয়া কেহ কেহ মনে করেন; ইহার অর্থ বোধ হয় এই যে, পাখির ভাষা যেমন দুর্বোধ্য বঙ্গ ও মগধ জনদের ভাষাও তেমনই দুর্বোধ্য ছিল আরণ্যক গ্রন্থের ঋষিদের কাছে। এই দুই কোমের লোকদের তাহারা মনে করিতেন অনাচারী বা আচারবিরহিত। প্রাচীন জৈনগ্রন্থ আচারঙ্গসূত্রে মহাবীর ও তাহার যতি সঙ্গীদের সম্বন্ধে যে গল্প আছে আগে তাহা একাধিকবার উল্লেখ করিয়াছি। তাহাতেও দেখা যাইতেছে, পথহীন রাঢ় দেশ তখনও পর্যন্ত (আনুমানিক, খ্ৰীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক) এক রূঢ় বর্বর কোম্যদ্বারা অধূষিত এবং বজজ ভূমির (উত্তর-রাঢ়ের?) ভোজ্য প্রাচীন বিহারবাসী এই সব ব্যক্তিদের কাছে অরুচিকর { মহাভারতে ভীমের দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে সমুদ্রতীরবাসী বাঙলার লোকেদের বলা হইয়াছে ‘ম্লেচ্ছ; ভাগবত পুরাণে সুহ্মদের বলা হইয়াছে ‘পাপ” কোম (যুণ, কিরাত, পুলিন্দ, পুকুকুশ, আভীর, যােবন, খাস, ইহারাও “পপ” কোম)। বৌধায়ন ধর্মসূত্রে আরাষ্ট্র (বর্তমান পাঞ্জাব), সৌবীর (বর্তমান সিন্ধু এবং পাঞ্জাবের দক্ষিণাংশ), কলিঙ্গ (বর্তমান ওড়িষ্যা ও অন্ধ), বঙ্গ এবং পুণ্ড্র জন এবং জনপদগুলিকে একেবারে আর্য সংস্কার ও সংস্কৃতি-বহির্ভুত বলিয়া বৰ্ণনা করা হইয়াছে। এইসব জনপদে যাঁহারা প্ৰবাস যাপন করিতে যাইতেন। ফিরিয়া আসিয়া তাহদের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইত। আর্যমঞ্জুশ্ৰীমূলকল্প গ্রন্থে গৌড়, পুঞ্জ, বঙ্গ, সমতট ও হরিকেল জনপদের লোকদের ভাষাকে বলা হইয়াছে ‘‘অসুর ভাষা’। ঐতিহাসিক কালে (খ্ৰীষ্টোত্তর সপ্তম শতকের আগে) প্রাচীন কামরূপ রাজ্যে অসুরান্ত ঔপধিক রাজাদের নাম পাওয়া যাইতেছে। এই সব বিচিত্র উল্লেখ হইতে স্পষ্টতই বুঝা যায়, ইহারা এমন একটি কালের স্মৃতি ঐতিহ্য বহন করিতেছেন যে-কালে আৰ্য-ভাষাভাষী এবং আর্য-সংস্কৃতির ধারক ও বাহক উত্তর ও মধ্য-ভারতের লোকেরা পূর্ব-ভারতের বঙ্গ, পুঞ্জ, রাঢ়, সুহ্ম প্রভৃতি কোমদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, সেকালে এই সব কোমদের ভাষা ছিল ভিন্নতর, আচার-ব্যবহার অন্যতর। জনতত্ত্বের দিক হইতেও যে এই সব লোকেরা অন্যতর জনের লোক ছিলেন, তাহার ইঙ্গিত তো আমরা আগেই পাইয়াছি; পুরাণ-কাহিনীর মধ্যেও তাহার কিছু ইঙ্গিত আছে, পরে তাহা উল্লেখ করিতেছি। এই অন্যতার জন, অন্যতর আচার-ব্যবহার, অন্যতর সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং অন্যতর ভাষার লোকদের সেই জন্যই বিজেতা-জাতিসুলভ দপিত উন্নাসিকতায় বলা হইয়াছে দাসু, ম্লেচ্ছ, পাপ, অসুর ইত্যাদি। কিন্তু এই দপিত উন্নাসিকতা বহুকাল স্থায়ী হইতে পারে নাই। ইতিমধ্যে আৰ্য-ভাষাভাষী আৰ্য-সংস্কৃতির বাহকেরা ক্রমশ পূর্বদিকে বিস্তার লাভ করিয়াছেন—ব্যক্তিগত বা কৌমগত খেয়ালবশে নয়, প্রাকৃতিক ও সামাজিক নিয়মের তাড়নায়, উর্বর শস্যক্ষেত্রের সন্ধানে, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য নদীতীরশায়ী বাস্তু ও ক্ষেত্ৰভূমির সন্ধানে এবং আদিমতর কোমবৃন্দের উপর অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভুত্ব বিস্তারের চেষ্টায়। এই বিস্তৃতির মূলে ছিল আৰ্য-ভাষাভাষী ও আর্য-সংস্কৃতিসম্পন্ন লোকদের উন্নততর কৃষিব্যবস্থা, উন্নততর যন্ত্রাদি এবং অস্ত্রশস্ত্র এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। রামায়ণ-মহাভারতে এই অনুমানের কিছু কিছু যুক্তিও আছে। তাহা ছাড়া, মননশক্তি ও অভিজ্ঞতাতেও বোধ হয়। ইহারা উন্নততর স্তরের লোক ছিলেন। গোড়ার দিকে এইসব বিভিন্ন জন, ভাষা ও সংস্কৃতির পরস্পর পরিচয়ের বিরোধের মধ্য দিয়াই হইয়াছিল। যাহাঁই হউক, আপাতত বাঙলাদেশে আর্যভাষীদের ক্রমবিস্তারের, পরস্পর পরিচয় ও যোগাযোগের এবং বিরোধ ও সমন্বয়ের আরম্ভিক দুই চারিটি সাক্ষ্যসূত্রের সন্ধান লওয়া যাইতে পারে।
ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-গ্রন্থে অন্ধ, পুণ্ড্র, শবর, পুলিন্দ এবং মুতিব কোমের লোকেরা ঋষি বিশ্বামিত্রের অভিশপ্ত পঞ্চাশটি পুত্রের বংশধর বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন; তাহারা যে আর্যভূমির প্রত্যন্ত দেশে বাস করিতেন তাহাও ইঙ্গিত করা হইয়াছে। ঠিক এই ধরনের একটি গল্প আছে মহাভারতে এবং বায়ু, মৎস্য ইত্যাদি পুরাণে। এই গল্পে অসুর বলির স্ত্রীর গর্ভে বৃদ্ধ অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমসের পাঁচটি পুত্র উৎপাদনের কথা বর্ণিত আছে; এই পাচ পুত্রের নাম, অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুণ্ড্র এবং সুহ্ম ইহাদের নাম হইতেই পাচ পাচটি জনপদের নামের উদ্ভব। রামায়ণে দেখিতেছি, বঙ্গদেশের লোকেরা অযোধ্যাধিপের অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল এবং বঙ্গ, অঙ্গ, মগধ, মৎস্য, কাশী এবং কৌশল কোমবর্গ অযোধ্যা-রাজবংশের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। ইক্ষবাকু বংশীয় রঘু কর্তৃক সুহ্ম এবং বঙ্গ-বিজয়ের প্রতিধ্বনি কালিদাসের রঘুবংশ কাব্যেও আছে। মহাভারতে কৰ্ণ, কৃষ্ণ ও ভীমের দিগ্বিজয় প্রসঙ্গেও প্রাচীন বাঙলার অনেকগুলি কোমের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। কৰ্ণ সুহ্ম, পুণ্ড্র ও বঙ্গদের পরাজিত করিয়াছিলেন; কিন্তু কৃষ্ণ ও ভীমের দিগ্বিজয়ই সমধিক প্রসিদ্ধ। পৌণ্ডদুক-বাসুদেব নামে পৌণ্ডদের এক রাজা বঙ্গ, পুঞ্জ ও কিরাতদের এক রাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ করিয়া মগধরাজ জরাসন্ধের সঙ্গে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিলেন। কৃষ্ণ-বাসুদেবকে পৌণ্ডুক-বাসুদেব ও জরাসন্ধের সমবেত সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে হইয়াছিল। কৃষ্ণ-বাসুদেব শেষ পর্যন্ত জয়ী হইয়াছিলেন। ভীমও এক পৌণ্ডধিপকে পরাজিত কৃরিয়াছিলেন এবং তাহার পর একে একে বঙ্গ, তাম্রলিপ্ত কৰ্কট ও সুহ্মের রাজাদের ও সমুদ্রতীরবাসী ম্লেচ্ছদের পযুদস্ত করিয়াছিলেন। এই সব কোমদের মধ্যে পুণ্ড্র ও বঙ্গ কোমই সবচেয়ে পরাক্রান্ত ছিল বলিয়া মনে হয়। মহাভারতে পৌণ্ডক-বাসুদেবের কীর্তিকলাপ নগণ্য নয়; জরাসন্ধের সঙ্গে তাঁহার মৈত্রীবন্ধন শ্ৰীকৃষ্ণ ও পাণ্ডব-ভ্রাতাদের পক্ষে শঙ্কা ও চিন্তার কারণ হইয়াছিল। এক বঙ্গরাজ কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে কৌরবপক্ষে দুর্যোধনের সহায়ক হইয়াছিলেন; ভীষ্মপর্বে দুর্যোধন- ঘটোৎকচ। যুদ্ধে ঐই বঙ্গরাজ যথেষ্ট বীরত্ব ও কৃতিত্ব দেখাইয়াছিলেন।
