ঐতিহাসিক কালে বাঙলাদেশে—তথা ভারতবর্ষে –কোনও রাজ্যই দেখিতেছি না যিনি রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নূতন করিয়া গড়িতে বা নূতন ব্যবস্থা প্রবর্তন করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কোনও রাজা বা রাজবংশ ব্যক্তিগত রুচি, প্রবৃত্তি ও সংস্কার দ্বারা রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-বিন্যাসকে প্রভাবান্বিত করিয়াছেন, এমন দৃষ্টান্ত একেবারে বিরল নয়, কিন্তু অর্থনীতি-দণ্ডনীতি বা রাষ্ট্র-ব্যবস্থা তাহাতে বদলাইয়া যায় নাই , মোটামুটি তাহা অপরিবর্তিতই থাকিয়া গিয়াছিল। রাজা, রাষ্ট্রদেহ, সমাজদেহ, ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি সমস্ত কিছুরই ধারক, পোষক ও বর্ধক ছিলেন, সন্দেহ নাই, কিন্তু তাহাদের স্রষ্টা ছিলেন না। বরং তাঁহাকে চিরাচরিত সংস্কার, শাস্ত্রনির্দেশ, ধর্মনির্দেশ মানিয়া চলিতেই হইত; সাধারণত ইহার অন্যথা হইবার উপায় ছিল না। বৌদ্ধ পালরাজারাও বারবার এ-সম্বন্ধে আশ্বাস দিয়াছেন; তাঁহারা যে শাস্ত্রনির্দেশ, বর্ণ ও সমাজ-ব্যবস্থা, ধর্মনির্দেশ ইত্যাদি মানিয়া চলিয়াছেন বলিয়া একাধিকবার লিপিগুলিতে বলা হইয়াছে, তাহার ইঙ্গিত নিরর্থক নয়। শাসন-ব্যবস্থা যে মোটামুটি বিস্তৃত, সুবিন্যস্ত ও সুপরিচালিত ছিল, এ-সম্বন্ধে দুই একটি ইঙ্গিত প্রাচীন সাক্ষ্যে পাওয়া যায়। দীপঙ্কর-শ্ৰীজ্ঞান-অতীশ প্রসঙ্গে একটি কাহিনী তিব্বতী গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে; কাহিনীটি উল্লেখযোগ্য। নয়পালের রাজত্বকালে, আনুমানিক ১০৩০-৪০ খ্ৰীষ্ট শতকে কোনও সময়ে নগন্টচো বাঙলাদেশে আসিতেছিলেন, দীপঙ্করকে সঙ্গে করিয়া তিব্বতে লইয়া যাইবার জন্য। বিক্রমশিলা-বিহারের অনতিদূরে গঙ্গাতীরে আসিয়া যখন তাঁহারা পৌঁছিলেন তখন সূর্য অস্ত গিয়াছে, যাত্রী বোঝাই খেয়ানৌকা ঘাট ছাড়িয়া নদী পাড়ি দিতে আরম্ভ করিয়াছে। দুই বিদেশী পথিক মাঝিকে ডাক দিয়া তাঁহাদের ঐ নৌকায়ই নদী পার করিয়া দিতে অনুরোধ করিলেন; কিন্তু বোঝাই নৌকায় মাঝি আর লোক লইতে অস্বীকার করিয়া বলিল, এখন আর সম্ভব নয়, পরে আবার সে, ফিরিয়া আসিবে। নৌকা চলিয়া গেল; এদিকে রাত্রি হইয়া আসিতেছে, অন্যতম পথিক বিনয়ধর মনে করিলেন, মাঝি নৌকা লইয়া আর ফিরিবে না। কিন্তু, বেশ খানিকক্ষণ পরে মাঝি নৌকা লইয়া ফিরিল; বিনয়ধর মাঝিকে বলিলেন, “আমি তো ভাবিয়াছিলাম, এত রাত্রে তুমি আর ফিরিয়া আসিবে না।” মাঝি উত্তর করিল, “আমাদের দেশে ধর্ম আছে, আমি যখন আপনাকে ফিরিয়া আসিব বলিয়া গিয়াছি, তখন অন্যথা কী করিয়া হইবে।” মাঝি বিনয়ধরকে পরামর্শ দিল, এতরাত্রে নদী পার হইয়া কাজ নাই, অদূরবর্তী বিহারের দ্বারমঞ্চের নীচে রাত্রিবাস করাই যুক্তিযুও”, সেখানে চোরের উপদ্রব নাই।
খেয়া পারাবার-বিভাগের কর্তার নাম পাল-লিপিমালায় পাইতেছি ‘তরিক; তাহার বিভাগের সুশাসনের একটু ইঙ্গিত এই গল্পে ধরিতে পারা যায়।
কিন্তু উপরোক্ত গল্প হইতে মনে করিবার প্রয়োজন নাই যে, সমস্ত রাজপুরুষরাই কর্তব্য ও নীতিপরায়ণ ছিলেন। বিষয়পতিরা যে মাঝে মাঝে লোভী হইয়া অত্যাচারী হইতেন, প্রজাসাধারণকে উৎপীড়ন করিতেন তাহার একটু পরোক্ষ ইঙ্গিত পাইতেছি সদুক্তিকর্ণামৃত ধূত একটি শ্লোকে। পল্লীবাসী কৃষিজীবী গৃহস্থের সুখ ও শান্তিলাভের চারিটি উপায়ের মধ্যে একটি উপায় বিষয়পতির (সাধারণ ভাবে, স্থানীয় শাসনকর্তার) লোভহীনতা। নিম্নের শ্লোকটির রচয়িতা হইতেছেন কবি শুভাঙ্ক।
বিষয়পতিরলক্কো ধেনুভির্ধাম পুতং
কতিচিন্দভিমতায়াং সীমি সীরা বহন্তি।
শিথিলয়তি চ ভাৰ্য নাতিথেয়ী সপর্যাম
ইতি সুকৃতমানেন বাঞ্জিতং নঃ ফলেন ৷।
অন্যান্য রাজপুরুষেরাও জনপদবাসীদের উপর নানাভাবে উৎপীড়ন করিতেন। এই সব নানা জাতীয় পীড়ার উল্লেখ প্রতিবাসী কামরূপের সমসাময়িক লিপিতে কিছু কিছু পাওয়া যায়। বাঙলার ভূমি দান-বিক্রয় সম্পর্কিত লিপিগুলিতেও “পরিহািত-সর্বপীড়া” পদটির উল্লেখ আছে। অর্থাৎ, ভূমি যখন দান করা হইতেছে তখন দানকর্তা দানগ্রহীতাকে উল্লিখিত ‘সর্বপীড়া’ হইতে মুক্তি দিতেছেন। ইঙ্গিতটা এই যে, সাধারণত সকল প্রজাদেরই এই সব পীড়া বা উৎপীড়ন অল্পবিস্তর ভোগ করিতে হইত। চাটভাট প্রভৃতি “উপদ্রককারীদের” সংখ্যাও কম ছিল না। অন্যত্র (ভূমি-বিন্যাস অধ্যায় দ্রষ্টব্য) সবিস্তারে ইহাদের উল্লেখ করিয়াছি। রাষ্ট্রকে দেয় কর-উপকরও কম ছিল না; সম্পন্ন ও বিত্তবান গৃহস্থদের পক্ষে এই সব কর-উপকর দেওয়া ক্লেশকর ছিল না, এরূপ অনুমান করা যায়; কিন্তু সমাজের অর্থনৈতিক নিম্ন শ্রেণীর পক্ষে করভার একটু বেশিই ছিল বই কি? বিভিন্ন প্রকারের কারের তালিকা হইতে তো তাঁহাই মনে হয়। তাহা ছাড়া, রাজপুরুষেরা নানা প্রকারের পুরস্কার-উপহার গ্রহণ করিতেন—অর্থে, ফলে, শস্যে এবং অন্যান্য দ্রব্যে।
পাল ও সেন-আমলের ভূমি ও কৃষিনির্ভর রাষ্ট্র ও সমাজে ভূমিবান মহত্তর, কুটুম্ব-সাধারণ গৃহস্থদের অবস্থা মোটামুটি স্বচ্ছল ছিল বলিয়াই মনে হয়; কিন্তু, বৃহৎ ভূমিহীন গৃহস্থ এবং সমাজ-শ্রমিক গোষ্ঠীর আর্থিক অবস্থা যে খুব স্বচ্ছল ছিল, এমন মনে হয় না। যে দুঃখ-দারিদ্র্যের চেহারা শ্রেণীবিভক্ত সমাজের নিম্নতম স্তরে, “বাঙলার পল্লীগ্রামে, শহরের দুঃস্থ পল্লীতে আজও দৃষ্টিগোচর হয় তাহা তখনও ছিল। চর্যাগীতিতে (দশম-দ্বাদশ শতক) ঢ়েণঢণপাদের একটি গীতিতে আছে :
