টালিটে মোর ঘর নাহি পড়িবেশী
হাঁড়ীতে ভাত নাহি নিতি আবেশী ৷।
বেঙ্গ সংসার বড়হিল জা অ।
দুহিল দুধু কি বেণ্টে সমাঅ ।৷ (হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর পাঠ)
ইহার গূঢ় গুহ্য ব্যাখ্যা যাহাই হউক, বস্তুগত, ইহগত ব্যাখ্যা এইরূপ : টিলাতে আমার ঘর, প্রতিবেশী নাই। ইয়াড়িতে ভাত নাই; নিত্যই ক্ষুধিত। (অথচ আমার) ব্যাঙ-এর সংসার বাড়িয়াই চলিয়াছে (ব্যাঙের যেমন অসংখ্য ব্যাঙচি বা সন্তান আমারও সন্তান তেমনই বাড়িয়া যাইতেছে); দোহা দুধ আবার বাটে ঢুকিয়া যাইতেছে (অর্থাৎ, যে—খাদ্য প্রায় প্রস্তুত তাহাও নিরুদ্দেশ হইয়া যাইতেছে)।
কিন্তু, দারিদ্র্যের আরও নিষ্কারুণ বৰ্ণনা পাওয়া যায় সদুক্তিকর্ণামৃতদৃত নিম্নোক্ত তিনটি শ্লোকে। তিনটিই বাঙালী কবির রচনা; বাঙলাদেশের দারিদ্র্যের ধূসর চিত্র। প্রথম শ্লোকটি অজ্ঞাতনামা এক কবির।।
ক্ষুৎকামা শিশবঃ শবাইব তনুমন্দাদরো বান্ধবো
লিপ্ত জর্জর কর্করী জললবৈনোমাং তথা বাধতে।
গেহিন্যাঃ ফুটিতাংশুকং ঘাটয়িতুং কৃত্বা সকাকুস্মিতং
কুপান্তী প্রতিবেশিনী প্রতিমুহুঃ সূচীং যথা যাচিত ৷।
শিশুরা ক্ষুধায় পীড়িত, দেহ শবের মত শীর্ণ, বান্ধবেরা গ্ৰীতিহীন, পুরাতন জীর্ণ জলপাত্রে স্বল্পমাত্রা জল ধরে-এ সকলও আমায় তেমন কষ্ট দেয় নাই, যেমন দিয়াছিল যখন দেখিয়াছিলাম। আমার গৃহিণী করুণ হাসি হাসিয়া ছিন্ন বস্ত্র সেলাই করিবার জন্য কুপিত প্রতিবেশিনীর নিকট হইতে সূচ চাহিতেছেন।
দারিদ্র্যের এই বাস্তব কাব্যময় চিত্ৰ সাহিত্যে সত্যই দুর্লভ। অথচ, ইহার ঐতিহাসিক সভ্যতা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। সমসাময়িক আর একটি অনুরূপ বাস্তব অথচ কাব্যময় চিত্র আঁকিয়া গিয়াছেন কবি বার। এই চিত্র আরও নির্মম, আরও নিষ্কারুণ।
বৈরাগ্যৈকসমুন্নতা তনুতনুঃ শীর্ণস্বরং বিভ্রতী
ক্ষুৎক্ষামেক্ষণ কুক্ষিভিশ্চ শিশুভির্ভোণ্ডুংসমূভার্থিতা।
দীনা দুঃস্থ কুটুম্বিনী পরিগলদবাষ্পায়ূধৌতাননা–
প্যেকং তণ্ডুলমানকং দিনশতকং নেতুং সমাকাঙক্ষতি ৷।
বৈরাগ্যে (আনন্দহীনতায়?) তাহার সমুন্নত দেহ শীর্ণ, পরিধানে জীর্ণবস্ত্র; ক্ষুধায় শিশুদের চক্ষু কুক্ষিগত হইয়া এবং উদর বসিয়া গিয়াছে; তাহারা আকুল হইয়া খাদ্য চাহিতেছে। দীনা দুঃস্থ গৃহিণী চোখের জলে মুখ ভাসাইয়া প্রার্থনা করিতেছেন, এক মান তণ্ডুলে যেন তাহাদের একশত দিন চলিতে পারে।
আরও একটি কাব্যময় অথচ বস্তৃগর্ভ বর্ণনা রাখিয়া গিয়াছেন কবি বার। এই শ্লোকটিও সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্ৰন্থ হইতেই উদ্ধৃত করিতেছি।
চলৎকাষ্ঠং গলৎকুড়মুক্তানতৃণসঞ্চয়ম।
গণ্ডুপদার্থিমণ্ডুকাকীর্ণং জীর্ণং গৃহং মম ৷।
কাঠের খুঁটি নড়িতেছে, মাটির দেয়াল গালিয়া পড়িতেছে, চালের খড় উড়িয়া যাইতেছে; কেঁচোর সন্ধানে নিরত ধ্যাঙের দ্বারা আমার জীর্ণ গৃহ আকীর্ণ।
সমাজের এই দারিদ্র্য, এই দুঃখ দৈন্য সম্বন্ধে রাষ্ট্র যথেষ্ট সচেতন ছিল বলিয়া মনে হয় না।
অথবা শ্রেণীবিন্যস্ত, ব্যক্তিগত অধিকার নির্ভর, সামন্ততন্ত্র ও আমলাতন্ত্র ভারগ্রস্ত, একান্ত ভূমি ও কৃষিনির্ভর সমাজের ইহাই হয়তো সামাজিক প্রকৃতি!
সেনরাজ বিজয়সেনের প্রশস্তি গাহিয়া কবি উমাপতিধর বলিতেছেন। “-ভিক্ষা-ভুজেস্যাক্ষয়ং লক্ষ্মীং স ব্যািতনোদরিদ্র-ভরণে সুজ্ঞো হি সেনান্বিয়”, অর্থাৎ “[বিজয়সেনের কৃপায়] ভিক্ষাই ছিল যাহার উপজীব্য সে হইয়াছে লক্ষ্মীর অধিকারী। কী করিয়া দরিদ্রের ভরণপোষণ করিতে হয় সেনবিংশ তাহা ভালই জানে”। ব্যক্তিগতভাবে রাজারা দান-ধ্যান করিতেন, পাত্ৰাপাত্র বিবেচনা করিয়া কৃপাবৰ্ষণও করিতেন, সন্দেহ নাই; উমাপতিধরও সে কৃপালাভ করিয়াছিলেন এবং লক্ষ্মীর প্রিয়পাত্ৰ হুইয়াছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্র জনসাধারণের দুঃখ-দারিদ্র্য দূর করা সম্বন্ধে বা দুঃস্থপীড়িতদের সম্বন্ধে কোনও দায়িত্ব স্বীকার করিত বলিয়া মনে হয় না। অন্তত চর্যাগীতি ও সদুক্তিকর্ণামৃত-গ্রন্থের শ্লোকগুলিতে যে ছবি ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহাতে এই স্বীকৃতির ইঙ্গিত নাই।
সংযোজন
এ-অধ্যায়ে সংযোজন করবার মতো নূতন তথ্য তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। নূতন দু’একটি রাজপুরুষের নাম এখানে সেখানে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তা এমন কিছু অর্থবহ নয়। একটি নাম আমার একটু কৌতুহলোদ্দীপক মনে হয়েছে; সেটি উল্লেখ করছি। চন্দ্ৰবংশী রাজা শ্ৰীচন্দ্রের (দশম শতাব্দী) পশ্চিমভাগ পট্টোলীতে পাদমূলক নামে একটি রাজপুরুষের উল্লেখ আছে। দীনেশচন্দ্র সরকার মশায় মনে করেন, পাদমূলক হচ্ছেন একান্ত সচিব বা Private Secretary। আমার মনে হয় দীনেশবাবুর অনুমান-অনুবাদ যথাৰ্থ। যদি তা হয় তাহলে আমাদের সমসাময়িক শাসক-কর্তৃপক্ষ শব্দটিকে কাজে লাগাতে পারেন। (Epigraphic Discoveries in East Pakistan by D. C. Sirkar, Sanskrit College, Calcutta, 1973, p. 30)।
১০. রাজবৃত্ত
০১. যুক্তি – রাজবৃত্ত
রাজবৃত্ত বর্ণন ইতিহাসের এক অপরিহার্য অধ্যায়। “রাগদ্বেষ বহির্ভূত হইয়া ভূতাৰ্থ কথন’ বহুদিন পর্যন্ত আমাদের দেশে (এবং বিদেশেও) রাজা ও রাজকীয় বর্ণনাতেই পর্যবসিত ছিল; এখনও নাই এমন বলা যায় না। এক সময় এই বর্ণনাই সমস্ত ইতিহাস জুড়িয়া বিরাজ করিত। তাহার প্রয়োজন ছিল না, এমন নয়। কিন্তু ইতিহাসের যে যুক্তি আমার এই বাঙালীর ইতিহাসের মূলে সেই যুক্তিতে রাজবৃত্ত বৰ্ণনা, অর্থাৎ রাজা, রাজবংশ, যুদ্ধবিগ্রহ, রাষ্ট্রের উত্থান ও পতনের সন-তারিখ প্রভৃতির নিছক বিবরণ একেবারে অপরিহার্য না হইলেও গৌণ। ভূত-বিবরণ, অতীতের যথাযথ তথ্য—কখনই ইতিহাসের বড় কথা নয়, ভূতাৰ্থ অর্থাৎ অতীত ঘটনার অর্থের বর্ণনাই যথার্থ ইতিহাস; এই অর্থ বর্ণনাই ঘটনার প্রাণহীন কঙ্কালকে জীবনের গৌরব ও সৌন্দর্য দান করে। রাজতরঙ্গিনীর কবি কহ্লন তাহা জানিতেন; তিনি শুধু ভূত-বৰ্ণনা করেন নাই, ভূতাৰ্থ কথনই ছিল তার লক্ষ্য ও আদর্শ; কিন্তু হর্ষচরিত-রচয়িতা বাণভট্ট এই লক্ষ্য ও আদর্শের সন্ধান জানিতেন না।
