দৃশ্যত, মহারাজা-মহারাজাধিরাজের ক্ষমতা, ও অধিকারের কোনও সীমা ছিল না; আঁহাদের রাজদণ্ডের প্রতাপ ছিল অব্যাহত, অপ্ৰতিহত। তিনি শুধু দণ্ডমুণ্ডের সর্বময় প্রভু নহেন, শুধু শাসন, সমর ও বিচার-ব্যাপারের কর্তা নহেন, সর্বপ্রকার দায় ও অধিকারের উৎসই তিনি। রাষ্ট্র-বিন্যাসগত ব্যাপারে অর্থশাস্ত্ৰ-দণ্ডশাস্ত্রোক্ত মতবাদের দিক হইতে এ-সম্বন্ধে কোনও আপত্তিই কেহ তোলে নাই; অস্তুত বাঙলার প্রাচীন রাজবৃত্তের ইতিহাসে তেমন কোনও প্রমাণ নাই। কিন্তু কার্যত রাজার ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা সংস্কারের উপর কিছু কিছু বাধা-বন্ধন ছিলই, একেবারে পুরোপুরি স্বেচ্ছাচারী হইবার উপায় তাহার ছিল না। প্রথম বাধা-বন্ধন, মহামন্ত্রী এবং অপরাপর প্রধান প্রধান মন্ত্রীবর্গ। ইহাদের উপদেশ সর্বত্র সকল সময় না হউক, অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানিতেই হইত। বাদল-প্রশস্তি কিংবা কর্মৌলি-লিপির বর্ণনায় কবিজনোচিত যত অতিশয়োক্তিই থাকুক না কেন, উহার পশ্চাতে খানিকটা ঐতিহাসিক সত্য লুক্কায়িত নাই, এমন বলা চলে না। সেন-আমল সম্বন্ধেও এই উক্তি প্রযোজ্য। আদিদেব, ভবদেব, হলায়ুধ ইত্যাদি ব্যক্তির ইচ্ছা ও মতামত অগ্রাহ্য করা কোনও রাজার পক্ষেই সম্ভব ছিল না। অন্যান্য মন্ত্রী, সভাপণ্ডিত যাহারা থাকিতেন তাঁহারাও রাজা এবং রাজপরিবারের অন্যান্য ব্যক্তির অন্যায়। আচরণের কতকটা বাধা স্বরূপ ছিলেন, সন্দেহ নাই। লক্ষ্মণসেনের সভাকবি গোবর্ধন আচার্য সম্বন্ধে সেখ শুভোদয়া-গ্রন্থে একটি গল্প আছে। লক্ষ্মণসেনের এক শ্যালক—কুমারদত্ত-কামপরায়ণ হইয়া একবার এক বণিকবধূর উপর বলপ্রয়োগ করিয়াছিলেন। বণিকবধূ মন্ত্রীদের নিকট এই অত্যাচারের প্রতিকারের প্রার্থনা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহারা রাজমহিষীর এবং রাজ-শ্যালকের ক্ৰোধাভাজন হইতে সাহসী হন নাই, তবে বণিকবধূকে তাহারা লক্ষ্মণসেন সমীপে উপস্থিত করিয়া রাজার নিকট বিচার প্রার্থনা করিতে বলেন। রাজসভায় মন্ত্রী ও সভাসদ বর্গের সম্মুখে বণিকবধু মাধবীর বিবৃতি শেষ হইলে রাজমহিষী বল্লভা নিজের ভ্রাতাকে রক্ষা করিবার জন্য ভ্রাতার দোষ অপরের (কবি উমাপতিধরের) স্কন্ধে আরোপ করেন। লক্ষ্মণসেনকে মহিষী ও শ্যালক উভয় সম্বন্ধেই দুর্বলতাপরবশ হইয়া বিচারমর্যাদা রক্ষায় অনিচ্ছুক দেখিয়া ক্ষব্ধ বণিকবধু শ্লেষমিশ্রিত ভাষায় নিজের মনের ক্ষোভ ব্যক্ত করেন। মহিষী বল্লভা ক্রুদ্ধা হইয়া রাজসভার মধ্যেই মাধবীকে চুল ধরিয়া টানিয়া পদাঘাত করেন। তাহাতেও মহারাজকে অবিচলিত দেখিয়া সভায় উপস্থিত কবি গোবর্ধনাচার্যের ব্রাহ্মণ্য দৰ্প ও ন্যায়বোধ উদ্দীপ্ত হইয়া উঠে; তিনি ক্রুদ্ধ প্ৰদীপ্ত কণ্ঠে মহারাজাধিরাজকে ভৎসৰ্না করিয়া মহিষীকে আঘাত করিতে যান, কিন্তু নিরস্ত হইয়া মহিষীকে ভৎসৰ্পনা এবং রাজাকে অভিশাপ দিয়া রাজসভা ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হন। তখন লক্ষ্মণসেন সিংহাসন ছাড়িয়া উঠিয়া আসিয়া ক্ষুব্ধ ক্রুদ্ধ ব্ৰাহ্মণ-কবির নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং তাঁহাকে নিরস্ত করেন। নীরব মন্ত্রীদের লক্ষ করিয়া বণিকবধু মাধবী তখন বাক্যবাণ নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন। লজ্জায় ও ঘূণায় উৎপীড়িত লক্ষ্মণসেন তখন খড়গ লইয়া কুমারদত্তকে হত্যা করিতে যাইতেছেন, এমন সময় মাধবী মহারাজকে প্ৰণাম করিয়া বলিলেন, “মহারাজ, আপনার শ্যালক আমার হাত ধরিয়াছিল বলিয়া আমি মরিয়া যাই নাই, আমার জাতও যায় নাই। আমারই স্বকৰ্মফলে এই ঘটনা ঘটিয়াছে। আপনার আচরণে উহার অপরাধের প্রতিকার হইয়াছে, আপনি উহাকে ক্ষমা করুন।” মাধবীর কথা শুনিয়া সভাস্থ সকলে সাধুবাদ করিল। মহারাজ কুমারদত্তকে রাজ্য হইতে নির্বাসিত করিলেন।
গল্পটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য না হইতে পারে, কিন্তু হইতেও কোনও বাধা নাই; কারণ, সমসাময়িক কালের প্রতিচ্ছবি এই গল্পে সুস্পষ্ট। তাহা ছাড়া বর্তমান প্রসঙ্গে, অর্থাৎ রাজার যথেচ্ছ বা দুর্বল আচরণের উপর সভাকবি ও পণ্ডিতদের বাধা-বন্ধনের দৃষ্টান্ত হিসাবেও ইহার মূল্য আছে। দ্বিতীয় মহীপাল মন্ত্রীদের শুভ পরামর্শে কর্ণপাত না করিয়া সামন্ত-চক্রের বিরোধিতা করিতে গিয়া নিজের প্রাণ ও বরেন্দ্রী উভয়ই হারাইয়াছিলেন।
আর এক বাধা-বন্ধনের কারণ ছিলেন সামন্ত-মহাসামন্তরা। বর্তমান নিবন্ধে এবং অন্যত্র বারবার ইহা বলিতে চেষ্টা করিয়াছি যে, অন্তত গুপ্ত আমল হইতে আরম্ভ করিয়া আদিপর্বের শেষ পর্যন্ত বাঙলার, তথা সমগ্ৰ ভারতবর্ষের, রাষ্ট্র ও সমাজ-বিন্যাস একান্তই সামন্ততান্ত্রিক এবং সামস্ততান্ত্রিক রাষ্ট্রই একদিকে সমাজের শক্তি এবং অন্যদিকে দুর্বলতাও। বস্তুত, প্রাচীন ভারতের যে কোনো বৃহৎ রাজ্য বা সাম্রাজ্য। ১. কতকগুলি ক্ষুদ্রতর মিত্ররাজ্য, ২১ ক্ৰমসংকুচীয়মান। জনপদাধিকার এবং ক্ষমতার তারতম্য লইয়া স্তরে উপস্তরে বিভক্ত বহুতর সামন্ত-মহাসামন্ত এবং ৩ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের নিজস্ব জনপদভূমি—এই তিন প্রধান অঙ্গের সম্মিলিত রূপ। বাঙলাদেশের গুপ্ত, পাল বা সেনবংশের রাজ্য-সাম্রাজ্যেও, এমন কি ক্ষুদ্রতর চন্দ্র-বর্মণ-কম্বোঞ্জ-দেবরাজ্যেও এই রূপের কিছু ব্যতিক্রম নাই। এই সব মিত্র ও সামন্ত-মহারাজদের একেবারে অবজ্ঞা করিয়া চলা কোনও মহারাজের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। রামপাল যখন কৈবর্ত ক্ষেীণীনায়ক ভীমের কবল হইতে বরেন্দ্রী পুনরুদ্ধারের আয়োজন করিতেছিলেন তখন সাহায্য ভিক্ষা করিয়া তাহাকে সামস্তদের দুয়ারে দুয়ারে প্রায় করজোড়ে ঘুরিয়া বেড়াইতে হইয়াছিল, অর্থ ও রাজ্য লোভ দেখাইতে হইয়াছিল।
