সৈন্য-বিভাগে মহাসেনাপতি এই পর্বেও সর্বময় কর্তা। কোট্টাপালও আছেন; রামগঞ্জ-লিপিতে তাহাকে বলা হইয়াছে কোষ্ট্রপতি। মহাবৃহপতি, নৌবলাধ্যক্ষ, বলাধ্যক্ষ, হস্তী-অশ্ব-গো— মহিষ-অজবিকাধ্যক্ষরাও আছেন। কিন্তু সর্বাপেক্ষ লক্ষণীয় এই যে, এই পর্বে এই বিভাগে অনেক নূতন নূতন পদোপাধির সাক্ষাৎ পাওয়া যাইতেছে; যেমন, মহাপিলুপতি, মহাগণস্থ, মহাবলাধিকরণিক, মহাবলাকোষ্ঠিক এবং বৃদ্ধধানুষ্ক। মহাপিলুপতি হস্তীসৈন্যচালনাশিক্ষক, হস্তীসৈন্যের অধ্যক্ষ। মহাগণস্থাও সামরিক কর্মচারী; ২৭ রথ, ২৭ হস্তী, ৮১ ঘোড়া এবং ১৩৫টি পদাতিক সৈন্য লইয়া এক এক গণ। এই সৈন্য-গণের তিনি সর্বময় কর্তা যিনি মহাগণস্থ। গ্রাম বা নগরসংঘ অর্থে ‘গণ’ শব্দের ব্যবহার আছে সন্দেহ নাই; কিন্তু মহাগণস্থ শব্দে ‘গণ’ উক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই বলিয়াই মনে হইতেছে। মহাবলাধিকরণিক খুব সম্ভব সৈন্যসংক্রান্ত-অধিকরণের প্রধান কর্তা। মহাবলাকোষ্ঠিক এবং বৃদ্ধধানুষ্কের দায় ও কর্তব্য বুঝা যাইতেছে না, তবে ইহারাও যে সামরিক কর্মচারী, সন্দেহ নাই। প্ৰান্তপালের উল্লেখ এই পর্বে নাই; দৃত-প্ৰৈষণিক এবং খোল বিদ্যমান।
পাল ও সেনা-রাজাদের নৌবলের কথা নানাপ্রসঙ্গে একাধিকবার উল্লেখ করিয়াছি। কালিদাসের রঘুবংশ কাব্যে “নৌসাধনোদ্যতান” সামরিক বাঙালীর বর্ণনা আছে। নদীমাতৃক সমুদ্রাশ্রয়ী বাঙালীর রাষ্ট্র নৌবলনির্ভর হইবে, ইহা কিছুই বিচিত্র নয়। নৌবাটি, নৌবিতান, নেদণ্ডক ইত্যাদি শব্দের উল্লেখ বাঙলার লিপিগুলিতে বারবার দেখা যায়। বৈদ্যদেবের কমৌলি-লিপিতে কুমারপালের রাজত্বকালে দক্ষিণবঙ্গে এক নৌযুদ্ধের সুন্দর অথচ সংক্ষিপ্ত কাব্যময় বর্ণনা আছে :
যস্যানুত্তরবঙ্গ-সংগরাজয়ে নৌবাট হীহীরব
ত্রস্তৈর্দ্দিককরিভিশ্চ বন্নচিলিতং চেন্নাস্তি তদগমাভূঃ।
কিঞ্চোৎপাতুক-কেনিপাত-পতন-প্রোত্সপিতৈঃ শীকরৈ-
রাকাশে স্থিরতা কৃতা যদি ভবেৎ স্যান্নিষ্কলঙ্কঃ শশী।
বিজয়সেনও একবার গঙ্গার উপরে এক বিজয়ী নৌযুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। চর্যাগীতির একটি পদে সেকালের নৌকায় নদীপারাপারের খুব সুন্দর বর্ণনা আছে (১৪ নং–ডোম্বীপাদ)। পাল ও সেনারাষ্ট্রের সৈন্যবাহিনীর অশ্ব আসিত কম্বোজ দেশ হইতে, দেবপালের মুঙ্গোর-লিপিতে এই সংবাদ জানা যায়। কিছু অশ্ব বোধ হয় আসিত ভূটান-তিব্বত অঞ্চল হইতেও; মিনহাজ-উদ-দীন বখতি-ইয়ারের তিব্বত অভিযানের যে-বিবরণ দিতেছেন এবং সেই প্রসঙ্গে করমবতনের হাটের যে বর্ণনা পৃইতেছি তাহাতে এই অনুমান একেবারে মিথ্যা বলিয়া মনে হয় না। আর্তিাহরী-পুত্র সর্বানন্দের টীকাসর্বস্ব গ্রন্থে (১১৬০) ঘোড়ার বিভিন্ন রকম দৌড়ের বর্ণনা ও বাঙলাদেশে ব্যবহৃত নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। বীরব দৌড় (বিষ্টব্ধা সমা চ গতিঃ), পুলিন দৌড় (ঋজুদূরগমনং), হেডু দৌড় (মণ্ডলিকালয়েন গমনং) এবং মার্জা দৌড় (বেগেন বিক্ষিপ্তেপরিচরণং)। সর্বানন্দ যুদ্ধসংক্রাস্ত আর একটি খবর দিতেছেন-শারদীয়া পূজায় মহানবমীর দিনে রাজ্য ও প্রজারা শাস্তিজল গ্রহণ করিতেন! হস্ট্রিসৈন্যের কথা তো প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্রের বর্ণনা দিতে গিয়া গ্ৰীক ঐতিহাসিক হইতে আরম্ভ করিয়া অনেক ভারতীয় ও বাঙালী কবি ও লেখকরাই বলিয়া গিয়াছেন।
এই পর্যন্ত সেনা-পর্বের রাষ্ট্র-বিন্যাসপ্রসঙ্গে যে-সব রাজপুরুষদের উল্লেখ করিয়াছি তাহারা ছাড়া সমসাময়িক লিপিতে আরও কয়েকটি রাজপদোপাধির সাক্ষাৎ মিলিতেছে। দৌঃসাধনিক-দৌঃসাধ্যসাধনিক-মহাদুঃসাধিক ইহাদের একজন। ইহার দায় ও কর্তব্যের স্বরূপ ঠিক বুঝা যাইতেছে না, তবে কাজটা খুব কঠিন দুঃসাধ্য রকমের ছিল তাহা বুঝা যাইতেছে। মহামুদ্রাধিকৃত আর একজন। রাজকীয় মুদ্রা বা শীলমোহর ইহার কাছে থাকিত; যেসব দলিলপত্রে রাজকীয় শীলমোহর প্রয়োজন হইত। তাহা ইনিই অনুমোদন করিয়া মুদ্রায় মুদ্রিত করিয়া দিতেন। কেহ কেহ মনে করেন, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের মুদ্রাধ্যক্ষ এবং মহামুদ্রাধিকৃত একই ব্যক্তি। মহাসর্বাধিকৃতের কর্তব্যের স্বরূপ বুঝা যাইতেছে না। বাকটিক-রাজবংশের লিপিতে সর্বাধ্যক্ষ নামে এক রাজপুরুষের উল্লেখ দেখা যাইতেছে; সর্বাধিকৃত-মহাসর্বাধিকৃত-সর্বাধ্যক্ষ মূলত সকলেরই কর্তব্য বোধ হয় ছিল একই ধরনের। একসরক, মহকটুক, শাস্তকিক, তদানিয়ুক্তক এবং খণ্ডপাল পদোপাধিক কয়েকজন রাজপুরুষের উল্লেখ রামগঞ্জ-লিপিতে দেখা যাইতেছে। প্রথম তিনজনের দায় ও কর্তব্য সম্বন্ধে কোনও ধারণাই আপাতত করা যাইতেছে না। তদানিয়ুক্তক ঔপধিক রাজপুরুষটির সঙ্গে পাল-পর্বের তদায়ুক্তক-বিনিয়ুক্তক রাজপুরুষদের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ, এমন অনুমান করা যাইতে পারে। খণ্ডপালও পাল-পর্বের খণ্ডরক্ষ একই ব্যক্তি, সন্দেহ নাই!
মোটামুটি ইহাই সেনা-পর্বের রাষ্ট্র-বিন্যাসের পরিচয়। এই রাষ্ট্র-বিন্যাসের প্রকৃতি সম্বন্ধে দুই একটি ইঙ্গিত আগেই করিয়াছি। বর্তমান প্রসঙ্গে এবং যে সাক্ষ্যপ্রমাণ বিদ্যমান তাহার উপর নির্ভর করিয়া আর কিছু বলার প্রয়োজন নাই, উপায়ও নাই।
০৮. মন্তব্য ও সংযোজন – রাষ্ট্রবিন্যাস
বিভিন্ন পর্বে বর্ণের সঙ্গে রাষ্ট্রের এবং শ্রেণীর সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্বন্ধের বিস্তারিত আলোচনা অন্যত্র করা হইয়াছে। এখানে আর পুনরুক্তি করিব না। তবে, রাষ্ট্র-বিন্যাস সম্বন্ধেই সাধারণভাবে দুই চারিটি উক্তি হয়তো অবান্তর হইবে না।
