অন্তত একটি ক্ষেত্রে মণ্ডলের পরবর্তী বিভাগ দেখিতেছি খণ্ডল; অন্যত্র মণ্ডলের পরেই বীথী যেমন, বর্ধমান-ভুক্তিতে; আর এক ক্ষেত্রে মণ্ডলের পরেই পাইতেছি। চতুরক। যেমন, খাড়ি-মণ্ডলের কাপ্তাল্লাপুর-চতুরক। অন্যত্র চতুরক হইতেছে আবৃত্তির নিম্নতর বিভাগ যেমন, নবসংগ্ৰহ-চতুরক। মধুক্ষীরাক-আবৃত্তির অন্তর্গত। কিন্তু, আবৃত্তি কাহার বিভাগ, সঠিক জানা যাইতেছে না। তবে মণ্ডলের উপবিভাগ হওয়া অসম্ভব নয়। চতুরক। কখনো কখনো সোজাসুজি বৃহত্তর বিভাগের অন্তর্গত, যেমন, বেতড়ড়-চতুরক। বর্ধমান-ভূক্তির অন্তর্গত। চতুরকের নিম্নবর্তী উপবিভাগ গ্রাম এবং কখনো কখনো সোজাসুজি পাটক (হেমচন্দ্রের আভিধানিক অর্থে, পাটক গ্রামের একাৰ্ধ) যেমন, বিড়ডােরশাসন—গ্রাম বেতড়ড-চতুরকে অবস্থিত; অন্যত্র অজিকুল-পাটকের অবস্থিতি নবসংগ্ৰহ-চতুরকে। পাটক বর্তমান কালের পাড়া; চতুরক বর্তমানের চৌকি, চক; বোধ হয় চতুরক গোড়ায় ছিল চারিটি গ্রামের সমষ্টি।
এই সব রাষ্ট্রীয়-বিভাগের শাসন-ব্যবস্থা সম্বন্ধে কোনও তথ্যই লিপিগুলিতে পাওয়া যাইতেছে না; স্থানীয় কোনও অধিকরণের উল্লেখও নাই। পাল-পর্বে গ্রামে শাসন-ব্যবস্থার নিয়ামক গ্রামপতির (গ্রামিকের) সাক্ষাৎ পাওয়া গিয়াছিল; এ-পর্বে তাঁহারও দেখা পাওয়া যাইতেছে না। কুটুম্ব প্রভৃতিরা ছিলেন; এ-পর্বে তাহাদের কোনও উল্লেখ নাই। এই তালিকায় পাইতেছি শুধু ব্ৰাহ্মণ, ব্ৰাহ্মণোত্তম এবং ক্ষেত্রকরদের। মেদ, অন্ধ, চণ্ডাল পর্যন্ত যত লোক তঁহাদের উল্লেখও নাই; অর্থাৎ এক কথায়, স্থানীয় জনসাধারণের জন্য রাষ্ট্রের যোগাযোগ একেবারেই অন্তৰ্হিত হইয়া গিয়াছে। অথচ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বহু পাটক পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়া জনপদগুলিকে খণ্ড, চতুরক, আবৃত্তি, গ্রাম, পাটক প্রভৃতিতে খণ্ড খণ্ড করিয়া ক্ষুদ্র হইতে ক্ষুদ্রতর ভাগে বিভক্ত করিয়াছে।
পাল-পর্বের রাষ্ট্রযন্ত্র বিভাগের সব কয়টি বিভাগ এই পর্বেও বিদ্যমান। বিচার-বিভাগে একটি নূতন পদোপাধির উল্লেখ পাওয়া যাইতেছে; এই উপাধিটি মহাধৰ্মধ্যক্ষ। দণ্ডনায়ক এই পর্বেও বিদ্যমান, কিন্তু মহাদণ্ডনায়কের উল্লেখ নাই। বোধ হয়, তাহারই স্থান লইয়াছেন মহাধৰ্মধ্যক্ষ। ঈশ্বরঘোষের রামগঞ্জ-লিপিতে অঙ্গিকরণিক নামে এক রাজপুরুষের দেখা পাইতেছি। বিচারকার্য ব্যাপারে যিনি শপথ বা অঙ্গীকার করাইতেন তিনিই বোধ হয় অঙ্গিকরণিক এবং সেই হিসাবে ইনি হয়তো এই বিভাগের অন্যতম কর্মচারী। এই লিপিতেই দণ্ডপাল নামে যে রাজপুরুষের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তিনিও বিচার-কর্মচারী সন্দেহ নাই। রাজস্ব-বিভাগে নূতন যে রাজপুরুষের উল্লেখ পাইতেছি তাহার পদােপাধি মহাভোগিক। মল্লসরুল-লিপিতে ইহার সাক্ষাৎ পাওয়া গিয়াছিল; ইনি ভোগ-কর আদায়-বিভাগের সর্বময় কর্তা। ষষ্ঠাধিকৃত ঔপধিক রাজপুরুষের উল্লেখ এই পর্বে নাই। তরিক-স্তরপতির উল্লেখও এই পর্বে নাই। তবে, হট্টপতি ঔপধিক এক রাজপুরুষের উল্লেখ রামগঞ্জ-লিপিতে আছে; ইনি হাট-বাজারের কর্তা সন্দেহ নাই এবং সেই হিসাবে রাজস্ব-বিভাগের সঙ্গে যুক্ত থাকা অসম্ভব নয়।
ঠিক রাজস্ব-বিভাগ সম্পূক্ত-নয়, তবে হট্টপতির মতনই আর একজন রাজপুরুষের দেখা পাইতেছি। রামগঞ্জ-লিপিতে; তিনি পানীয়াগারিক। বোধ হয় রাজকীয় বিশ্রামগৃহ, ভোজনশালা, পানীয়াগার প্রভৃতির তত্ত্বাবধান করা ছিল ইহার কাজ। এই লিপিরই বাসাগরিক এবং ঔথিতাসনিক পানীয়াগারিক শ্রেণীরই আর দুই জন রাজপুরুষ। প্রথমোক্ত ব্যক্তিটি বোধ হয় রাষ্ট্রের অতিথিশালা বা রাজকীয় বাসগৃহের তত্ত্বাবধায়ক; দ্বিতীয়টি সম্ভবত রাজসভা ও দরবারের আসনসজা-ব্যবস্থাপক। ভোজ্যবর্মার বেলাব-লিপিতে পীঠিকাবিও নামে আর একজন রাজকর্মচারীর সাক্ষাৎ পাওয়া যাইতেছে; ইনিও বোধ হয় রাজকীয় সভা-সমিতি-দরবারের আসনসজার ব্যবস্থা করিতেছেন।
আয়ব্যয়হিসাব বিভাগে মহাক্ষাপটলিক এই পর্কেও বিদ্যমান। জ্যেষ্ঠ-কায়স্থের উল্লেখ এই পর্বে নাই; কিন্তু রামগঞ্জ লিপিতে মহাকায়স্থের উল্লেখ আছে। ইনি এই বিভাগের অন্যতম উর্ধর্বতন কর্মচারী বলিয়াই তো মনে হয়। এই লিপি-উল্লিখিত মহাকরণাধ্যক্ষ এবং লেখক, এবং বহু সেনলিপি-কথিত করণ একান্তভাবে আয়াবায়হিসাব-বিভাগের কর্মচারী হয়তো নহেন। লেখক ও করণ সকল বিভাগেই প্রয়োজন হইত; উচ্চতর রাজপুরুষদের সকলেরই নিজস্ব করণ থাকিতেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল করণের সর্বময় কর্তা যিনি তঁহারই পদোপাধি মহাকরণাধ্যক্ষ। পূর্ব-পর্কের ভূমি ও কৃষি-বিভাগের ক্ষেত্রপ বা প্ৰমাতৃ কাহারো সাক্ষাৎ এ পর্বে পাইতেছি না। কর্মকর ঔপধিক এক রাজপুরুষের উল্লেখ রামগঞ্জ-লিপিতে পাইতেছি; ইনি কি শ্রমিক-বিভাগের নিয়ামক কর্তা ছিলেন?
অন্তঃরাষ্ট্র বিভাগের প্রধান ছিলেন মহামন্ত্রী বা মহামহত্তক। তাহদের সহায়ক সচিব ও মন্ত্রী তো অনেকেই ছিলেন। পররাষ্ট্র-বিভাগের প্রধান ছিলেন মহাসান্ধিবিগ্রহিক; তাহার সহায়ক সান্ধিবিগ্রহিক। দূতও এই বিভাগের অস্থায়ী উচ্চ রাজপুরুষ; সান্ধিবিগ্রহিকেরাই সাধারণত দূতের কাজ করিতেন। মন্ত্রপাল বা গূঢ়পুরুষ বর্গের উল্লেখ এই পর্বে দেখিতেছি না।
শান্তিরক্ষা-বিভাগ এই পর্কেও খুব সক্রয়। পূর্ব পর্বের মহাপ্ৰতীহার, চৌরোদ্ধরণিক, দণ্ডপাশিক, চাটভাট প্রভৃতি এই পর্বেও আছেন। অধিকন্তু, রামগঞ্জ-লিপিতে পাইতেছি। দণ্ডপশিক ঔপধিক এক রাজপুরুষের উল্লেখ; ইনিও এই বিভাগের কর্মচারী, সন্দেহ নাই। এই লিপিরই শিরোরক্ষক এবং খড়গগ্রাহ উভয়ই বোধ হয় একশ্রেণীর দেহরক্ষক এবং সেই হিসাবে উভয়েই শান্তিরক্ষা-বিভাগের কর্মচারী; আরোহক অশ্বারোহী-প্রহরী ও দেহরক্ষক ১ ইনিও এই বিভাগের সঙ্গে যুক্ত।
