কম্বোজ-বর্মণ-সেন রাষ্ট্রযন্ত্রে পুরোহিততন্ত্রের প্রতিপত্তি লক্ষণীয়। পুরোহিত, মহাপুরোহিত, মহাতন্ত্রাধিকৃত, রাজপণ্ডিত ইহারা সকলেই রাজপুরুষ। এই যুগের লিপিগুলিতে শাস্তিবারিক, শান্ত্যাগারিক, শান্ত্যাগোরাধিকৃত প্রভৃতি পুরোহিতের ছড়াছড়ি; ইহারা রাজপুরুষ ছিলেন। কিনা, – নিঃসংশয়ে বলা যায় না। তবে, রামগঞ্জ লিপির ঠাকুর রাজপুরুষ এবং ঠাকুর হইতেই যে বর্তমান পদোপাধি ঠাকুর উদ্ভূত, এ সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র সন্দেহের কারণ নাই। ঠাকুর বাঙলার বাহিরে কোনও কোনও লিপিতে লেখক বা কারণ অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে; এ ক্ষেত্রেও তাহা হইয়া থাকিতে পারে।
পাল-পর্বের মত এ-পর্বেও রাষ্ট্রের প্রধান জনপদ বিভাগগুলির দেখা মিলিতেছে; ভুক্তিপতির (উপরিকের) শাসনাধীনে ভুক্তি, মণ্ডলপতির শাসনাধীনে মণ্ডল, বিষয়পতির শাসনাধীনে বিষয়। কিন্তু বিষয় বা মণ্ডলের নীচের গ্রাম সংক্রান্ত স্থানীয় বিভাগ-উপবিভাগের সংখ্যা বাড়িয়া গিয়াছে এবং ক্ষুদ্র বৃহৎ একাধিক নূতন বিভাগের সৃষ্টি হইয়াছে। এ-পর্বের লিপিগুলিতে পৌণ্ড বা পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তি, বর্ধমান-ভূক্তি এবং কঙ্কগ্রাম-ভূক্তির খবর পাওয়া যাইতেছে। সেন রাজাদের আমলে পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির সীমা খুব বাড়িয়া গিয়াছিল; উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গের প্রায় সমস্ত জনপদ এবং পূর্ববঙ্গের বৃহৎ একটি অংশ এই ভুক্তি-বিভাগের অন্তৰ্গত ছিল। পাল-পর্বের বর্ধমান-ভুক্তি লক্ষ্মণসেনের সময় খবীকৃত হইয়া দুইটি ভুক্তির সৃষ্টি করিয়াছিল, উত্তরে কঙ্কগ্রাম-ভূক্তি, দক্ষিণে বর্ধমান-ভুক্তি। দণ্ড-ভুক্তির কোনও উল্লেখ এই পর্বে নাই। ভুক্তিপতি বা উপরিকদের একজন উর্ধর্বতন কর্মচারী ছিলেন; তাহার পদােপাধি বৃহদুপরিক এবং তিনি সম্ভবত কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহারাজাধিরাজের অন্তরঙ্গ বা রাজবৈদ্য অনেক সময়ই বৃহদুপরিক কর্তৃক নিযুক্ত হইতেন; সেই জন্যই বোধ হয় কতকগুলি লিপিতে অন্তরঙ্গ-বৃহদুপরিক একসঙ্গে একই রাজপুরুষ বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন।
ভুক্তির অব্যবহিত নিম্নতর বিভাগ মণ্ডল না বিষয়, এ সম্বন্ধে এই পর্বেও নিশ্চয় করিয়া বলিবার উপায় নাই। ভোজ্যবর্মণের বেলাব-লিপির উপ্যালিকা গ্ৰাম কৌশস্বী অষ্টগচ্ছখণ্ডল সংবদ্ধ অধঃপক্কয়-মণ্ডলের অন্তর্গত এবং এই মণ্ডল পৌণ্ডভুক্তির অন্তর্গত। বিজয়সেনের বারাকপুর-লিপির ঘাসসম্ভোভট্টবড়া গ্রাম খাড়ি-বিষয়ের অন্তৰ্গত এবং খাড়ি-বিষয় পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত। নৈহাটি লিপির বাল্লাহিঠঠা গ্রাম স্বল্পদক্ষিণ-বীথীর অন্তর্গত; এই বীথী বর্ধমান-ভুক্তির উত্তররাঢ়-মণ্ডলান্তঃপাতী। আনুলিয়া-লিপির দত্তভূমির (মাথরণ্ডিয়া গ্রামে) মণ্ডলটি পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত। গোবিন্দপুর-শাসনের বিড়ডােরশাসনগ্রাম বেতড়ড-চতুরকে অবস্থিত, এই চতুরক। বর্ধমান-ভুক্তির পশ্চিম-খাটিকার অন্তর্গত। তপণদীঘি-শাসনের বেলহিষ্টী গ্রাম পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির বরেন্দ্রী (মণ্ডলের) অন্তৰ্গত। মাধ্যাইনগর লিপির দাপনিয়া-পাটকও বরেন্দ্রী (মণ্ডলের) অন্তর্গত এবং বরেন্দ্রী পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত। সুন্দরবন লিপির মণ্ডলগ্রাম কাতল্লাপুর চতুরকে অবস্থিত, এই চতুরক খাড়ি-মণ্ডলের অন্তৰ্গত, এবং খাড়ি-মণ্ডল পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত। শক্তিপুর-শাসনের কঙ্কগ্রাম-ভূক্তির মধুগিরি-মণ্ডল কয়েকটি বীথীতে বিভক্ত, তন্মধ্যে দক্ষিণ-বীথী একটি। ইদিলপুর-লিপির তিলপাড়া-পাটকের এবং মদনপাড়া লিপির পিঞ্জোকাষ্টি গ্রামের অবস্থিতি বঙ্গে বিক্রমপুর-ভাগে এবং বঙ্গ পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তৰ্গত। বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ লিপির রামসিদ্ধি-পাটক এবং বিজয়তিলক-গ্রাম পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত বঙ্গের নাব্যভাগে অবস্থিত; আজিকুলপাটিক মধুক্ষীরাক-আবৃত্তির নবসংগ্ৰহ-চতুরকে অবস্থিত; দেউলহস্তী (গ্রাম) বঙ্গের অন্তৰ্গত লাউহণ্ডা-চতুরকে অবস্থিত, এবং ঘাঘরকাটি-পাটক চন্দ্ৰদ্বীপের উরা-চতুরকে অবস্থিত। ঈশ্বরঘোষের রামগঞ্জ লিপির দিগঘাসোনিকা গ্রাম গাল্লিটিপ্যাক-বিষয়ের অন্তর্গত, এবং এই বিষয় পিয়োল্ল-মণ্ডলের অন্তঃপাতী।
উপরোক্ত বিস্তৃত সাক্ষ্যের মধ্যে ভুক্তির সঙ্গে বিষয় বা মণ্ডলের এবং বিষয় ও মণ্ডলের পরস্পর সম্বন্ধের সঠিক ইঙ্গিত পাওয়া যাইতেছে না। কোথাও দেখিতেছি, ভুক্তির অব্যবহিত নিম্নবর্তী বিভাগ মণ্ডল, কোথাও দেখিতেছি বিষয়, আবার কোথাও কোথাও দেখিতেছি। একেবারে বীথী। বর্ধমান-ভুক্তির পরেই মণ্ডল, মণ্ডলের পর, বীথী; অন্তত নৈহাটি ও শান্তিপুর-লিপিতে তো তাঁহাই দেখিতেছি, যদিও গোবিন্দপুর শাসনে ভুক্তির পরেই পাইতেছি। পশ্চিম-খাটিকা। পশ্চিম-খাটিকা কি মণ্ডল, না বিষয়, না বীথী বুঝিবার উপায় নাই; তাহার পরেই চতুরক। কঙ্কগ্রাম-ভূক্তিতে ভুক্তির পরই বীথী। বঙ্গ পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত; কিন্তু বঙ্গ বিষয় না মণ্ডল কিছুই বুঝা যাইতেছে না; মনে হয়, ইহাদের উভয়াপেক্ষা বৃহত্তর বিভাগ, কিন্তু এ-বিভাগ রাষ্ট্রীয় বিভাগ নয়, ভৌগোলিক-বিভাগ মাত্র। বঙ্গের দুই ভাগ : বিক্রমপুর-ভাগ ও নাব্য-(ভাগ?)। এই নাব্য-(ভাগের) উল্লেখ বোধ হয় শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল-লিপিতেও আছে, নাব্য (নান্য পাঠ অশুদ্ধ বলিয়াই মনে হয়) মণ্ডল রূপে। যাহা হউক, বিক্রমপুর-ভাগের “ভাগও কোনও রাষ্ট্রীয় বিভাগ বলিয়া মনে হইতেছে না, ভৌগোলিক বিভাগ মাত্ৰ। বিক্রমপুর-ভাগ-বিক্রমপুর অঞ্চল, নাব্য (ভাগ?)=নাব্য অঞ্চল। অন্যত্র, বিষয় যেন মণ্ডলের অন্তর্গত বলিয়াই মনে হইতেছে। যেমন, পরণয়ি-বিষয় সমতট-মণ্ডলভুক্ত, গাল্পিটিপাক-বিষয় পিয়োল্ল-মণ্ডলের অন্তঃপাতী ৷ লক্ষণীয়। এই যে, বিষয় বিভাগ সেনারাষ্ট্রে বিশেষ দেখা যাইতেছে না; বিজয়সেনের বারাকপুর লিপিতে পৌণ্ডবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত খাড়ি-বিষয়ের উল্লেখ পাইতেছি, কিন্তু লক্ষ্মণসেনের আমলে খাড়ি-মণ্ডলে রূপান্তরিত হইয়া গিয়াছে!
