সেন রাজারা পাল রাজাদের রাজোপাধিগুলি তো ব্যবহার করিতেনই, উপরন্তু নামের সঙ্গে তঁহাদের নিজ নিজ বিরুদও ব্যবহার করিতেন। বিজয়সেন, বল্লালসেন, লক্ষ্মণসেন, বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেনের বিরুদ যথাক্রমে ছিল অরিবৃষভ-শঙ্কর, অরিরাজ নিঃশঙ্ক-শঙ্কর, অরিরাজ মদন-শঙ্কর, অরিরাজ বৃষভাঙ্ক-শঙ্কর এবং অরিরাজ অসহা-শঙ্কর। তাহার উপর, একেবারে শেষ অধ্যায়ের রাজারা আবার এই সব বিরুদের সঙ্গে সঙ্গে আশ্বপতি, গজপতি, নরপতি, রাজত্ৰয়াধিপতি প্রভৃতি উপাধিও ব্যবহার করিতেন এমন কি দেববংশীয় রাজা দশরথদেবও। সেন ও বর্মণ বংশের, ঈশ্বর ঘোষ ও ডোম্মানপালের লিপিগুলিতে রাজ্ঞী ও মহিষীর উল্লেখও পাইতেছি; ভূমিদানক্রিয়া তাহাদেরও বিজ্ঞাপিত হইতেছে। পালবংশের একটি লিপিতেও কিন্তু রাজপুরুষ হিসাবে রাজ্ঞী বা মহিষীর উল্লেখ নাই; চন্দ্র ও কম্বোজ বংশের লিপিতেই ইহাদের প্রথম উল্লেখ দেখা গিয়াছে। ইহারা কী হিসাবে রাজপুরুষ ছিলেন, কী ইহাদের দায় ও অধিকার ছিল, কিছুই বুঝা যাইতেছে না।
জ্যেষ্ঠ রাজকুমার যুবরাজ হইতেন এবং সেই হিসাবে রাষ্ট্রকর্মে, সামরিক ব্যাপারে রাজার সহায়কও ছিলেন। মাধ্যাইনগর লিপিতে দেখিতেছি, যুবরাজ লক্ষ্মণসেন কোনও কোনও বিজয়ী সমারাভিযানে অংশ গ্রহণ করিয়াছিলেন। বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ-লিপিতে সূর্যসেন এবং পুরুষোত্তমসেন নামে দুই (রাজ) কুমারের উল্লেখ আছে; এই লিপিতেই আর একজন অনুল্লিখিতনামা কুমারের সাক্ষাৎ পাওয়া যাইতেছে। ঈশ্বরঘোষের রামগঞ্জ লিপিতে অন্তত তিনজন রাজপুরুষের উল্লেখ পাইতেছি। যাহারা রাজপ্রাসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলিয়া মনে হইতেছে। শিরোরক্ষিক বোধহয় রাজার দেহরক্ষক; অন্তঃপ্ৰতীহার প্রাসাদের অন্দব-মহলের রক্ষাকাবেক্ষক বা প্ৰতীহার এবং আভ্যন্তরিক রাজপ্রাসাদের ব্যবস্থাপক বলিয়াই মনে হইতেছে। ইহাদের ছাড়া অন্তরঙ্গ ঔপধিক রাজবৈদ্যের সাক্ষাৎও পাইতেছি। মহাপাদমূলক নামে আর একজন রাজপুরুষের উল্লেখ এই লিপিতে আছে। ইনি কি ছিলেন রাজার ব্যক্তিগত অনুচর? এই পর্বেও সামন্তরা অত্যপ্ত প্ৰবল এবং সংখ্যায়ও প্রচুর। এক রাণিক শূলপাণি বিজয়সেনের দেওপাড়া-প্রশস্তি খোদিত করিয়াছিলেন; শূলপাণি ছিলেন “বারেন্দ্রকশিল্পীগোষ্ঠীচুড়ামণি”। ত্রিপুরায় রণবঙ্কমল্ল হারিকালদেবের বংশ, চট্টগ্রাম-ঢাকার দেববংশ, ঈশ্বর ঘোষ, ডোম্মনপাল, মুঙ্গেরের গুপ্ত-উপান্ত-নামা এক রাজবংশ-ইহারা সকলেই তো সামন্ত-মহাসামন্ত, মহামাণ্ডলিক বংশ ছিলেন; পরে কেহ কেহ স্বাতন্ত্র্য ঘোষণা করিয়া মহারাজাধিরাজ হইয়াছিলেন। ঢ়েঙ্করীর ঈশ্বর ঘোষ যে মহামাণ্ডলিক ছিলেন তাহা রামগঞ্জ লিপিতেই সপ্রমাণ। ঢেঙ্করীর এক মণ্ডলাধিপতি রামপালের সামন্তরূপে বরেন্দ্রী পুনরুদ্ধারে সহায়তা করিয়াছিলেন। ঈশ্বর ঘোষ, খুব সম্ভব, সেন রাষ্ট্রেরই অন্যতম সামন্ত ছিলেন। রামগঞ্জ লিপি পাঠে স্পষ্টতই মনে হয়, এই সব সামান্তরা প্রকৃতপক্ষে নিজ নিজ জনপদে স্বাধীন রাজার মতই আচরণ করিতেন! দেখিতেছি, পাল ও চন্দ্ৰবংশীয় স্বাধীন মহারাজাধিরাজদের রাজকীয় লিপিতে যেমন ভূমিদানক্রিয়া রাজা, রাজনক, রাজন্যক, রাণিক ইত্যাদি রাজপুরুষকে বিজ্ঞাপিত করা হইতেছে, মহামাণ্ডলিক ঈশ্বরঘোষের লিপিতেও ঠিক তেমনই করা হইয়াছে, অথচ তিনি স্বাধীন রাজা ছিলেন না। বর্মণ ও সেন লিপিতেও যথারীতি রাজা, রাজন্যক, রাণিক প্রভৃতির উল্লেখ বিদ্যমান। মহামাণ্ডলিক ঈশ্বর ঘোষের রামগঞ্জ লিপির তালিকায় এমন – কি মহাসামস্তুেরও উল্লেখ আছে। প্ৰসিদ্ধ কাব্যসংকলনগ্রন্থ সন্দুক্তিকর্ণামৃতের সংকলয়িতা কবি শ্ৰীধরদাস ছিলেন মহামাণ্ডলিক এবং শ্ৰীধরের পিতা, লক্ষ্মণসেনের “অনুপমপ্রেমকপাত্ৰং সখা”, শ্ৰীবটুদাস ছিলেন “প্রতিরাজডস্কৃত মহাসামন্তচূড়ামণি”।
মন্ত্রীবাগের মধ্যে প্রধান মহামন্ত্রীর সাক্ষাৎ এই পর্বেও পাইতেছি। ভট্ট ভবদেবের পিতামহ আদিদেব এক (চন্দ্ৰবংশীয়?)। বঙ্গরাজ্যের মহামন্ত্রী ছিলেন। আদিদেব শুধুই মহামন্ত্রী ছিলেন না, তিনি রাজার বিশ্রাম-সচিব, মহাপাত্র এবং সন্ধিবিগ্রহীও ছিলেন। ভট্ট ভবদেব স্বয়ং বর্মণরাজ হরিবর্মদেবের মন্ত্রশক্তিসচিব ছিলেন এবং ভবদেবের পরামর্শেই হরিবর্মদেব নাগ ও অন্যান্য রাজাদের পরাজিত করিতে পারিয়াছিলেন। মহামন্ত্রী নামে কোনও পদের উল্লেখ সেন লিপিগুলিতে পাওয়া যাইতেছে না। কিন্তু কোনও কোনও লিপিতে যেমন, কেশবসেনের ইদিলপুর লিপিতে, মহামহত্তক বা মহামত্তক নামীয় একজন রাজপুরুষের উল্লেখ পাইতেছি। সেনা-বংশের ভূমিদান লিপিগুলি সাধারণত মহা-সান্ধিবিগ্রহিক দ্বারা অনুমোদিত হইত এবং সান্ধিবিগ্রহিকেরা সাধারণত লিপিগুলির দূতের কাজ করিতেন। কিন্তু ইদিলপুর লিপিটির দৌত্য করিয়াছিলেন শ্ৰীগৌড়মহামহত্তক স্বয়ং এবং লিপিটির এবং লিপিবদ্ধ বিবরণীয় শুদ্ধতা পরীক্ষা করিয়া অনুমোদন করিয়াছিলেন তিনজন করণ বা কেরানী; ইহাদের একজন মহামহত্তকের, একজন মহাসান্ধিবিগ্রহিকের এবং তৃতীয় জন স্বয়ং মহারাজের। মহামহত্তক মনে হইতেছে সেন রাষ্ট্রের ও রাজার অন্যতম প্রধানমন্ত্রী। অন্যান্য মন্ত্রীও ছিলেন। পূর্বোক্ত ইদিলপুর লিপিতেই দেখিতেছি, শতসচিব দ্বারা রাজপাদপদ্ম লালিত হইত (সচিবশতমৌলিলালিতঃ পদাম্বুজ)। ইহাদের মধ্যে মহাসান্ধিবিগ্রহিকই ছিলেন প্রধান, এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। অন্তত মহারাজাধিরাজের ভূমিদানক্রিয়ার তিনিই যে প্রধান অনুমোদনকর্তা তাহা তো একাধিক লিপিতে সুস্পষ্ট। লক্ষ্মণসেনের আনুলিয়া লিপির দূত ছিলেন সান্ধিবিগ্রহিক নারায়ণদত্ত এবং মহারাজের দানক্রিয়া অনুমোদন করিয়াছিলেন মহাসান্ধিবিগ্রহিক। মহাসান্ধিবিগ্রহিকেরাই অধিকাংশ সেন”ভূমিদানলিপির দূত। বস্তুত, এই পর্বে মহাসান্ধিবিগ্রহিক এবং তাঁহার সহকারী সান্ধিবিগ্রহিকেরাই সেন-কেন্দ্রীয়-রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান কর্মচারী এবং রাজার প্রধান সহায়ক বলিয়া মনে হইতেছে। আদিদেব এবং ভট্ট ভবদেব দুইজনই যথাক্রমে বঙ্গ এবং বৰ্মণরাষ্ট্রের সান্ধিবিগ্রহিক; অধিকন্তু আদিদেব ছিলেন মহামন্ত্রী। লক্ষ্মণসেনের ভাওয়াল-লিপি-কথিত শঙ্কর্যধর শুধু গৌড়রাষ্ট্রের মহাসান্ধিবিগ্রহিক ছিলেন না, শতমন্ত্রীর প্রধান প্রভুও ছিলেন। নানা রাষ্ট্রকর্মে নিযুক্ত অন্যান্য প্রধান মন্ত্রীদের মধ্যে বৃহদুপরিক, মহাভোগিক বা মহাভোগপতি, মহাধৰ্মধ্যক্ষ, মহাসেনাপতি, মহাগণস্থ, মহামুদ্রাধিকৃত, মহাবলাধিকরণিক, মহাবলাকোষ্ঠিক, মহাকরণাধ্যক্ষ, মহাপুরোহিত, মহাতন্ত্রাধিকৃত ইত্যাদি রাজপুরুষের সাক্ষাৎ পাইতেছি। ইহারা যে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের এক এক বিভাগের সর্বাধ্যক্ষ বা প্ৰধানমন্ত্রী ছিলেন, সন্দেহ নাই ৷ মহাকার্তাকৃতিকের উল্লেখ এই পর্বে পাইতেছি না। ডোম্মানপালের সুন্দরবন লিপিতে সপ্ত—আমাত্যের উল্লেখ পাইতেছি; ইহার অর্থ পরিষ্কার নয়। পাল-পর্বে ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের যে সব অধ্যাক্ষের সাক্ষাৎ মিলিয়াছে, এই পর্বেও তাহারা বিদ্যমান। চন্দ্ৰবংশীয় শাসনে যেমন, সেনা-বর্মণ লিপিগুলিতেও তেমনই কৌটিল্যের ‘অধ্যক্ষ-প্রচার-অধ্যায়। কথিত কর্মচারীবর্গের উল্লেখ আছে।
