গ, আয়ব্যয়-হিসাব-বিভাগ।। এই বিভাগের সর্বময় কর্তা বোধ হয় ছিলেন মহাক্ষপটলিক। জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ বোধ হয় একজন উচ্চ রাজকর্মচারী। এই পর্বে পুস্তপালের উল্লেখ দেখিতেছি। না। রাজকীয় দলিলপত্ৰ বোধ হয় জ্যেষ্ঠ-কায়ন্থের তত্ত্বাবধানেই থাকিত। ভূমি-সম্পূক্ত দলিলপত্ৰ থাকিত কৃষি-বিভাগের দপ্তরে।
ঘ- ভূমি ও কৃষি-বিভাগ ৷ এই বিভাগের কয়েকজন কর্মচারীর নাম লিপিগুলিতে পাওয়া যায়। ক্ষেত্রপ ছিলেন কৃষ্ট ও কৃষিযোগ্য ভূমির সর্বোচ্চ হিসাবরক্ষক ও পর্যবেক্ষক। প্রমাতৃ ভূমির মাপজোখ, ভূমি জরিপ ইত্যাদির বিভাগীয় কর্তা। কেহ কেহ অবশ্য মনে করেন, প্ৰমাতৃ বিচার-বিভাগীয় কর্মচারী; তিনি বিচারকার্যে সাক্ষ্য লিপিবদ্ধ করিতেন। পাল ও সেন লিপিগুলিতে, বিশেষভাবে সেন লিপিগুলিতে, ভূমির মাপ ও সীমা নির্ধারণে, আয়োৎপত্তি নির্ধারণে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম হিসাবের উল্লেখ আছে, তাহাতে এ তথ্য অনস্বীকার্য যে, ভূমি মাপজোখ-জরিপ সংক্রান্ত একটি সুবিস্তৃত ও সুপরিচালিত বিভাগ বর্তমান ছিল। গুপ্ত আমলের পুস্তপাল-বিভাগ হইতেও এই অনুমান কতকটা করা চলে।
ঙ• পররাষ্ট্র-বিভাগ ।৷ এই বিভাগের আভাসোল্লেখ কম্বোজরাজ নয়পালের ইর্দা লিপিতে পাওয়া যায় এবং তাহার ব্যাখ্যা আগেই করা হইয়াছে। এই বিভাগের উর্ধর্বতম। কর্মচারী ছিলেন
দূত; তাহার অধীনে মন্ত্রপাল ও গূঢ়পুরুষবর্গ। সর্বোচ্চ ভারপ্রাপ্ত রাজপুরুষ বোধ হয় ছিলেন মহাসান্ধিবিগ্রহিক।
চ. শান্তিরক্ষা-বিভাগ। ৷ এই বিভাগের অনেক রাজপুরুষের উল্লেখ লিপিগুলিতে পাওয়া যাইতেছে। মহাপ্ৰতীহার সম্ভবত রাজপ্রাসাদের এবং রাজধানীর রক্ষাকাবেক্ষক। দাণ্ডিক, দাণ্ডপশিক (দণ্ড এবং পাশ-রজু), দণ্ডশক্তি, সকলেই এই বিভাগের কর্মচারী। খোল খুব সম্ভব এই বিভাগের গুপ্তচর (খোল শব্দের আভিধানিক অর্থ খোড়া; অর্ধমাগধী অভিধান মতে গুপ্তচর)। কাহারো কাহারো মতে চৌরোদ্ধারণিকও এই বিভাগেরই উচ্চ কর্মচারী। অঙ্গরক্ষ (দেহরক্ষক)কেও এই বিভাগের কর্মচারী বলা যাইতে পারে। চট্টভট্ট বা চাটভাটরাও এই
ছ. সৈন্য-বিভাগ ৷। এই বিভাগের ঊর্ধর্বতম রাজপুরুষের পদোপাধি মহাসেনাপতি এবং তাঁহার নীচেই সেনাপতি। হস্তী, অশ্ব, রথ ও পদাতিক এই চতুরঙ্গ বলা ছাড়া পাল রাষ্ট্রের বোধ হয় নৌবলও ছিল এবং এই পাঁচটি বলের প্রত্যেকটির একজন ভারপ্রাপ্ত ব্যাপৃতক বা অধ্যক্ষ থাকিতেন। পদাতিক সেনার কর্তা বলাধ্যক্ষ; নৌবলের কর্তা নৌকাধ্যক্ষ বা নাবাধ্যক্ষ। উষ্ট্রবলও ছিল এবং তাহারও একজন ব্যাপৃতক ছিলেন। সৈন্যবাহিনীতে বোধ হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের লোকেরাও যোগদান করিতেন। গৌড়-সৈন্যেরা তো ছিলেনই; তাহা ছাড়া লিপিগুলিতে মালব-খস-তুণ-কৃলিক-কর্ণাট-লাট-চোড় প্রভৃতি যে-সব ভিনদেশি কোমের লোকদের উল্লেখ আছে তাহারা যে রাষ্ট্রের সৈন্যবাহিনীর বেতনভুক সেনা, এ সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম। কোট্টাপাল দুৰ্গাধিকারী-দুৰ্গরক্ষক; প্রান্তপাল রাজ্যসীমা রক্ষক; মহাবৃহপতি যুদ্ধকালে বৃহ-রচনার কর্তা। ইহাদের সকলেরই সাক্ষাৎ মিলিতেছে এবং ইহারা সকলেই যে সৈন্য-বিভাগের উচ্চ রাজকর্মচারী এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই।
এ পর্যন্ত যে সব রাজপুরুষদের উল্লেখ করা হইয়াছে তাহারা ছাড়া পাল, চন্দ্র ও কম্বোজবংশীয় লিপিগুলিতে আরও কয়েকজন রাজপুরুষের পদোপাধির পরিচয় পাওয়া যায়; যেমন অভিত্বরমান, গমাগামিক দৃত-প্ৰৈষণিক, খণ্ডরক্ষ, স(শ)রভঙ্গ, ইত্যাদি। বুৎপত্তিগত অর্থে অভিত্বরমান যে দ্রুত যাতায়াত করে; গামাগামিক অর্থও যাতায়াতকারী। ইহারা উভয়েই যে এক শ্রেণীর সংবাদবাহী বা রাজকীয় দলিলপত্রবাহী দূত এই অনুমান মিথ্যা না-ও হইতে পারে। শান্তিরক্ষণ, পররাষ্ট্র অথবা সৈন্য বিভাগের সঙ্গে হয়তো ইহারা যুক্ত ছিলেন অথবা সাধারণ রাষ্ট্রকর্মেও হয়তো ইহাদের প্রয়োজন হইত। তবে, খুব সম্ভব ইহারা উচ্চশ্রেণীর রাজকর্মচারী ছিলেন না। দূত-প্রেষণিক দুইটি পৃথক শব্দ হইতে পারে, আবার এক শব্দও হইতে পারে। প্ৰৈষণিক অর্থ যিনি প্রেরণ করেন; দূত-প্রেষণিক অর্থ যিনি দূত প্রেরণ করেন অথবা দূতের সংবাদবাহী। ইনি যিনিই ইউন, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র বিভাগের সঙ্গেই ইহার যোগ। খণ্ডরক্ষ অর্ধমাগধী অভিধান মতে শান্তিরক্ষা-বিভাগের অধ্যক্ষ বা শুল্ক্যু-পরীক্ষক; কাহারো কাহারো মতে ইনি সৈন্য-বিভাগের কর্মচারী। আবার, কেহ কেহ মনে করেন, ইনি পূর্তি-বিভাগের কর্মচারী, সংস্কারকার্যাদির পরীক্ষক (খণ্ড-ফুট্ট-সংস্কার)। পরবর্তী পর্বের ঈশ্বরঘোষের রামগঞ্জ লিপিতে খণ্ডপাল নামে এক রাজপুরুষের উল্লেখ আছে; খণ্ডপাল ও খণ্ডরক্ষক সমর্থক বলিয়াই তো মনে হইতেছে। স(শ)রভঙ্গ বলিতে কোনও কোনও পণ্ডিত মনে করেন, তীরধনুকধারী সৈন্যবর্গের অধ্যক্ষ; আবার কেহ কেহ বলেন শরভঙ্গ ছিলেন রাজার মৃগয়ার সঙ্গী, যিনি রাজার তীরন্ধনু ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণ করিতেন। ইহারা কেহই উচ্চ রাজকর্মচারী নহেন, এমন অনুমান কতকটা করা যায়।
পাল ও সমসাময়িক অন্যান্য রাষ্ট্রযন্ত্রের যে সংক্ষিপ্ত কাঠামোর মোটামুটি পরিচয় দেওয়া হইল তাহা হইতেই বুঝা যাইবে, এই যুগে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র পূর্ব পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশি বিস্তার ও স্ফীতি লাভ করিয়াছে। স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের সচেতন মর্যাদা ও প্রয়োজনবোধে এই বিস্তার ও স্ফীতি ব্যাখ্যা করা যায়; তাহা ছাড়া, পাল-পর্বে যে সুবিস্তৃত সাম্রাজ্য গড়িয়া উঠিয়াছিল তাহার প্রয়োজনেও কোনও কোনও বিভাগের আমলাতন্ত্রের বিস্তৃতির প্রয়োজন হইয়াছিল, সন্দেহ নাই। কিন্তু আমলাতন্ত্রের বিস্তৃতি, রাষ্ট্রযন্ত্রের স্ফীতি ও সূক্ষ্মতর বিভাগ সৃষ্টির অর্থই হইতেছে, রাষ্ট্রের বাহু সমাজের সর্বদেহে বিস্তুত করা। পাল-পর্বে তাহারই সূচনা দেখা দিয়াছে এবং সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালনায় জনসাধারণের প্রতিনিধিদের দায় ও অধিকার খবীকৃত হইয়াছে। গ্রাম্য স্থানীয় শাসনকার্য ছাড়া আর যে কোথাও এই সব প্রতিনিধিদের কোনও প্রভাব ছিল, মনে হইতেছে না। বিষয়-শাসনের ব্যাপারে জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ, মহা-মহত্তর, মহত্তর এবং দাশগ্রামিক প্রভৃতি বিষয়-ব্যবহারীর উল্লেখ পাইতেছি, সন্দেহ নাই; কিন্তু ইহাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ ও দাশগ্রামিক উভয়েই রাজপুরুষ। পূর্ব পর্বে যে ভাবে স্থানীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে স্থানীয় জন-প্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ লক্ষ্য করা যায়, এ পর্বে তাহা নাই বলিলেই চলে। বস্তুত, সমাজ-বিন্যাসের বৃহৎ একটা অংশের দায়িত্ব ও অধিকার এই পর্বে রাষ্ট্রের কুক্ষিগত হইয়া পড়িয়াছে। আমলাতন্ত্রের বাহু-বিস্তৃতিই তাহার কারণ; জনসাধারণও সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্বন্ধ বিচ্যুত হইয়া পড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। গ্রামবাসী মহত্তর, ব্ৰাহ্মণ, কুটুম্ব, ক্ষেত্রকর, মেদ, অন্ধ, চণ্ডাল পর্যন্ত ভূমিদানের বিজ্ঞপ্তি প্রাপ্তিতেই ইহাদের রাষ্ট্ৰীয় অধিকারের পরিসমাপ্তি; আর কোনও অধিকারের উল্লেখ নাই।
০৭. সেন-পর্ব
সেন-পর্বে সেন-বৰ্মণ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্রযন্ত্র সম্বন্ধে আর বিশেষ কিছু বলিবার নাই। এই সব রাষ্ট্রযন্ত্রে মোটামুটি পাল-পর্বের রাষ্ট্রযন্ত্রের আদর্শই স্বীকৃতি লাভ করিয়াছিল; রাষ্ট্র-বিন্যাসের আকৃতি-প্রকৃতিও মোটামুটি একই প্রকার। তবে, এই পর্বে আমলাতন্ত্র আরও বিস্তৃত হইয়াছে আরও স্ফীত হইয়াছে। রাজা ও রাজপরিবারের মর্যাদা, মহিমা ও আড়ম্বর আরও বাড়িয়াছে; রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশে ব্ৰাহ্মণ ও পুরোহিততন্ত্ৰ জাকাইয়া বসিয়াছে। রাষ্ট্রযন্ত্রবিভাগ বৃহত্তর গ্রামগুলিকেও বিভক্ত করিয়া একেবারে পাটক বা পাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে, অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের সুদীর্ঘ বাহু জনপদের ও জনসাধারণের শেষসীমা পর্যন্ত পৌঁছিয়া গিয়াছে; ছোটবড় রাজপদের সংখ্যা বাড়িয়াছে, নূতন নূতন পদের সৃষ্টি হইয়াছে, বড় পদগুলির মহিমা ও মর্যাদা বাড়িয়া গিয়াছে। অথচ, সেন বা বর্মণ বা অন্যান্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের রাজ্য-পরিধি পাল ও চন্দ্রবংশের রাজ্য-পরিধি অপেক্ষা সংকীর্ণতর। ঈশ্বরঘোষের রাজবংশ, দেববংশ, ইহারা তো একান্তই স্থানীয় ক্ষুদ্র জনপদ-স্বামী অথচ ইহাদেরও লিপিগুলিতে আমলাতন্ত্রের যে আকৃতি দৃষ্টিগোচর হয়, রাজতন্ত্রের যে প্রকৃতি ধরা পড়ে তাহা অস্বাভাবিক রূপে স্ফীত ও বিস্তৃত।
