মন্ত্রী
পাল-চন্দ্র পর্বের রাষ্ট্রেই আমরা সর্বপ্রথম একজন প্রধান রাজপুরুষের সাক্ষাৎ পাইতেছি। যাহার পদোপাধি মন্ত্রী বা সচিব এবং যিনি রাজা ও সম্রাটদের সকল কর্মের প্রধান সহায়ক, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বপ্রধান কর্মচারী। ভট্ট গুরবমিশ্রের বাদল-প্রশস্তিতে দেখা যাইতেছে, একটি সন্ত্রাস্ত, শাস্ত্রবিদ, সমসাময়িক পণ্ডিতকুলাগ্রগণ্য ব্রাহ্মণ পরিবার চারিপুরুষ ধরিয়া পালসম্রাটদের মন্ত্রীত্ব করিয়াছেন। মন্ত্রী গৰ্গ ধর্মপালকে অখিল রাজ্যের স্বামিত্বপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন বলিয়া দাবি করা হইয়াছে; তাহার পুত্ৰ দৰ্ভপাণির নীতি কৌশলে দেবপাল হিমালয় হইতে বিন্ধ্য পর্যন্ত সমস্ত ভূভাগ করতলগত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। শুধু তাঁহাই নয়, “দেবপাল-উপদেশ গ্রহণের জন্য দৰ্ভপাণির অবসর অপেক্ষায় তাহার দ্বারদেশে দণ্ডায়মান থাকিতেন’ এবং “তিনি আগে সেই মন্ত্রীবরকে আসন প্ৰদান করিয়া স্বয়ং সচকিতভাবেই সিংহাসনে উপবেশন করিতেন।” দর্ভপাণির পুত্ৰ সোমেশ্বর পরমেশ্বর-বল্লভ বা মহারাজাধিরাজের প্রিয়পাত্ৰ বলিয়া আখ্যাত হইয়াছেন। সোমেশ্বরপুত্র কেদারমিশ্রেীর ‘বুদ্ধিবলের উপাসনা করিয়া” দেবপাল উৎকল, গুণ, দ্রাবিড় ও গুর্জরনাথকে পরাজিত করিয়াছিলেন। তাহার যজ্ঞস্থলে শুরপাল নামক নরপাল স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া অনেকবার শ্রদ্ধাসলিলাঞ্ছত হৃদয়ে নতশিরে পবিত্ৰ শান্তিবারিক গ্ৰহণ করিয়াছিলেন। কেদারমিশ্রেীর পুত্ৰ শ্ৰীগুরবমিশ্রকে ‘শ্ৰীনারায়ণপাল যখন মাননীয় মনে করিতেন, তখন আর তাহার অন্য প্রশংসা-বাক্য কী হইতে পারে?” এই সব বর্ণনার মধ্যে অতিশয়োক্তি যথেষ্ট, সন্দেহ নাই; তবে, মন্ত্রীরা সকলেই যে খুব প্রতাপবান ছিলেন, রাজা ও রাষ্ট্রের উপর র্তাহাদের আধিপত্য যে খুব প্রবল ছিল, এ সম্বন্ধেও সন্দেহ করা চলে না। আর একটি ব্ৰাহ্মণ পরিবারও বংশানুক্ৰমে কয়েক পুরুষ ধরিয়া পালরাজাদের মন্ত্রীত্ব করিয়াছিলেন। শাস্ত্রবিদশ্রেষ্ঠ যোগদেব বংশানুক্ৰমে (বংশানুক্রমেণাভুৎ সচিবঃ) তৃতীয় বিগ্রহপালের সচিব নিযুক্ত হইয়াছিলেন; যোগদেবের পর “তত্ত্ববোধভু” বোধিদেব রামপালের সচিব ছিলেন; বোধিদেবের পুত্র কুমারপালের ‘চিত্তানুরূপ সচিব’ হইয়াছিলেন। এই দুইটি বংশানুক্রমিক দৃষ্টান্ত হইতে মনে হয়, বংশানুক্ৰমিক মন্ত্রীত্বপদী পালরাষ্ট্রে প্রচলিত ছিল; সম্ভবত এ ক্ষেত্রেও তাঁহারা গুপ্তবংশীয় প্ৰথাই অনুসরণ করিয়াছিলেন। শুধু মন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য অনেক পদনিয়োগের ক্ষেত্রে পাল, বৰ্মণ ও সেনবংশীয় রাজারা এই বংশানুক্রমিক নিয়োগপ্রথা মানিয়া চলিতেন। গুপ্তরাষ্ট্রের আমলেই এই প্রথা বহুল প্রচলিত হইয়াছিল। আল মাসুদি তো পরিষ্কার বলিয়াছেন, ভারতবর্ষে অনেক রাজকীয় পদই ছিল বংশানুক্রমিক। অন্যান্য দুই একটি লিপিতেও পালরাষ্ট্রের মন্ত্রপদের উল্লেখ আছে, যেমন, প্রথম মহীপালের বাণগড় লিপির দূতক ছিলেন ভট্টবামন মন্ত্রী; তৃতীয় বিগ্রহপালের আমগাছি লিপির দূতকও ছিলেন একজন মন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী (বানগড় লিপির মহামন্ত্রী দ্রষ্টব্য) বা সচিব ছাড়াও রাজার এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের কার্যে সহায়তা করিবার জন্য আরও কয়েকজন মন্ত্রী থাকিতেন; ইহাদের কাহারও কাহারও পদোপাধি পাল ও চন্দ্ৰবংশের লিপিগুলিতে উল্লিখিত হইয়াছে, যেমন, মহাসান্ধি-বিগ্রহিক, রাজামাত্য, মহাকুমারামাত্য, দূত বাদূতক, মহাসেনাপতি, মহাপ্ৰতীহার, মহাদণ্ডনায়ক, মহাদেীঃসাধসাধনিক, মহাকর্তকৃতিক, মহাক্ষপটলিক, মহাসর্বাধিকৃত, রাজস্থানীয় এবং অমাত্য। অমাত্য সাধারণভাবে উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী; রাজপুত্রের পরই রাজামাত্যের উল্লেখ হইতে মনে হয়, মন্ত্রী বা সচিবের পরই ছিল ইহাদের স্থান। কুমারামোত্য সাধারণত বিষয়পতির সমার্থক, বিষয়ের সর্বময় কর্তা; মহাকুমারামাত্য হয়তো বিষয়পতি বা কুমারামোত্যদের সর্বাধ্যক্ষ। দূর কোনও স্থায়ী রাজপদ না-ও হইতে পারে; অস্তুত তিনটি লিপিতে দেখিতেছি, মন্ত্রীরা এবং সান্ধিবিগ্রহিকেরাও দূত নিযুক্ত হইতেছেন। (বাণগড়, আমগাছি ও মনহলি লিপি)। মহাসান্ধিবিগ্রহিক পররাষ্ট্র সম্পৃক্ত যুদ্ধ ও শান্তি ব্যবস্থা বিষয়ক উচ্চতম রাজকর্মচারী। মহাসেনাপতি যুদ্ধবিগ্রহ সম্পর্কিত উচ্চতম রাজপুরুষ। মহাপ্ৰতীহার পদোপাধি রাজপুরুষ ও সামন্ত উভয়েরই দেখা যায় এবং সামরিক ও অসামরিক উভয় বিভাগেই এই পদোপাধি প্রচলিত ছিল। প্ৰতীহার অর্থ দ্বাররক্ষক; রাষ্ট্রের কর্মচারী মহাপ্ৰতীহার বোধ হয় রাজ্যের প্রত্যন্ত সীমারক্ষক ঊর্ধর্বতন রাজকর্মচারী। অথবা, ইহাকে রাজপ্রাসাদের রক্ষাকাবেক্ষক অর্থাৎ শাপ্তিরক্ষা বিভাগের কর্মচারীও বলা যায়! ইহাকে অবশ্য যথাৰ্থত মন্ত্রী বলা চলে না। মহাদণ্ডনায়ক প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ বা বিচারক, বিচার-বিভাগের সর্বময় কর্তা। মহাদেীঃসাধসাধানিক ও মহাকর্তাকৃতিকের দায় ও কর্তব্য কী নিশ্চয় করিয়া তাহা বলা যায় না। মহাক্ষপটলিক আয়ব্যয়হিসাব বিভাগের কর্তা। মহাসর্বাধিকৃত কী কাজ করিতেন এবং কোন বিভাগের কর্তা ছিলেন বলা কঠিন; তবে, মধ্যযুগের এবং সাম্প্রতিক কালের সর্বাধিকারী পদবীটি এই রাজপদের স্মৃতি বহন করে। রাজস্থানীয় স্বয়ং রাজাধিরাজ নিযুক্ত উচ্চ রাজকর্মচারী, রাজপ্রতিনিধি। ইহারা সকলেই রাষ্ট্রযন্ত্রে এক একটি প্রধান বিভাগের সর্বময় কর্তা, রাজা এবং রাষ্ট্রের এক এক বিভাগীয় মন্ত্রী বা সাধারণভাবে কোনও কোনও বিশেষ বিশেষ কাজের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী। রাজধানীতে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের প্রধান কেন্দ্ৰে বসিয়া সেখান হইতে ইহারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্ম-বিভাগের এবং জনপদ-বিভাগের কার্য পরিচালনা করিতেন।
