রাজতন্ত্র
পূর্ব পূর্ব যুগের মতো এ যুগে এবং পরবর্তী যুগেও রাষ্ট্র-বিন্যাসের গোড়ার কথা রাজতন্ত্র এবং সে রাজতন্ত্র আরও দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত, আরও মহিমা ও মর্যাদাসমন্বিত, আরও কীর্তি ও ঐশ্বৰ্য্যসমৃদ্ধ। অব্যবহিত পূৰ্বযুগের স্বাধীন রাজারা ছিলেন মহারাজাধিরাজ অথবা অধিমহারাজ অথবা নৃপধিরাজ; লোকনাথের পট্টোলীতে রাজাকে পরমেশ্বরও বলা হইয়াছে। এই সমস্ত উপাধি বাঙলাদেশে গুপ্ত রাজারাই প্রচলন করিয়াছিলেন। পাল ও চন্দ্রবংশের রাজারা শুধু মহারাজাধিরাজ মাত্র নন, তাহারা সঙ্গে সঙ্গে পরমেশ্বর এবং পরমভট্টারকেও। গুপ্ত সম্রাটেরাও তো ছিলেন পরমদৈবত-পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ। সাম্রাজ্য, রাজকীয় মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে রাজাদের ঔপধিক আড়ম্বর বাড়িবে, তাহা কিছু আশ্চর্যও নয়! বংশানুক্রমিক রাজবংশের সর্বময় প্ৰভুত্ব, রাজকীয় মহিমা, ঐশ্বৰ্য-বিলাস, পারিবারিক মর্যাদা ইত্যাদি পোল আমলের লিপিগুলিতে যে অজস্র অত্যুক্তিময় পল্লবিত স্তুতিবাদ লাভ করিয়াছে তাহাতে মনে হয়, ভারতের অন্যত্র যেমন বাঙলাদেশেও তেমনই এই যুগে রাজাকে দেবতা ও পরমেশ্বরের নররূপী অবতার এবং পরমগুরু বলিয়া প্ৰতিষ্ঠা করা হইয়াছিল।
রাজার জ্যেষ্ঠপুত্র যুবরাজ নামে আখ্যাত হইতেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক হইলেই যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হইতেন। তাহার দায় ও অধিকার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। এক যুবরাজ ত্ৰিভুবনপাল ধর্মপালের খালিমপুর লিপির দূতকের কার্য করিয়াছিলেন; আর এক যুবরাজ রাজ্যপাল দেবপালের মুঙ্গের লিপির দূতক ছিলেন। বিগ্ৰহপাল তাহার পুত্র যুবরাজ নারায়ণপালের হস্তে রাজ্যভার অর্পণ করিয়া সিংহাসন ত্যাগ করিয়া বানপ্রস্থে গিয়াছিলেন। রাজার পুত্ৰ কুমার নামে অভিহিত হইতেন এবং তঁহাদের কেহ কেহ উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত হইতেন, যুদ্ধবিগ্রহেও যোগদান করিতেন। রামপাল তাহার পুত্র রাজ্যপালের সঙ্গে রাজকীয় ও সামরিক ব্যাপারে আলোচনা পরামর্শ করিতেন; পরিণত বয়সে পুত্রের হস্তে রাজ্যভার অর্পণ করিয়া তিনিও বানপ্রস্থে গিয়া আত্মবিসর্জন করেন। রাজারা রাষ্ট্রকার্যে ভ্রাতাদেরও সহায়তা এবং পরামর্শ গ্ৰহণ করিতেন। ধর্মপাল ভ্রাতা বাকপাল এবং দেবপাল কর্তৃক সামরিক ব্যাপারে বহুল উপকৃত হইয়াছিলেন। ভ্রাতা ও রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে সিংহাসন ও উত্তরাধিকার লইয়া বিবাদ হইত না, এমন নয়; একবার এই ধরনের এক বিবাদ রাষ্ট্রবিপ্লবের অন্যতম কারণ হইয়াছিল। দ্বিতীয় মহীপালের সময়ে কৈবর্ত বিদ্রোহের অন্যতম কারণ বোধ হয় ভ্ৰাতৃবিরোধ এবং মহীপাল কর্তৃক ভ্রাতা রামপাল ও শূরপালের কারাবরোধ। তৃতীয় গোপালের মৃত্যুর মূলে খুল্লতাত মদনপালের দায়িত্ব একেবারে ছিল না, এ কথা জোর করিয়া বলা যায় না। পাল-লিপিমালার রাজপাদাপোজীবীদের তালিকায়ও রাজপুত্রের উল্লেখ আছে। চন্দ্ৰবংশীয় লিপির এই তালিকায় রাজার এবং কম্বোজ বংশের ইর্দা-পট্টোলীতে মহিষীর উল্লেখও দেখিতে পাওয়া যায়। রাজকীয় মহিমা ও মর্যাদার সীমার ভিতরে মহিষীরও একটা স্থান ছিল, সন্দেহ নাই।
সামন্ততন্ত্র
পাল আমলে সামন্ততন্ত্র আরও দৃঢ়প্রতিষ্ঠ ও দৃঢ়সংবদ্ধ হয়। সুবিস্তৃত সাম্রাজ্যের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সামন্তদের সংখ্যাও ছিল অনেক। অনুমান করা কঠিন নয়, হঁহাদের অনেকেই বিজিত রাজ্য ও রাষ্ট্রের প্রভু ছিলেন; বিজিত হইবার পর মহাসামন্ত-সামন্তরূপে স্বীকৃত হইয়াছিলেন। মহারাজাধিরাজ সম্রাটের সঙ্গে ইহাদের সম্বন্ধের স্বরূপ নিৰ্ণয় করা কঠিন; তবে, খালিমপুর লিপি পাঠে মনে হয়, পাল সম্রাটেরা সময় সময় মহতী রাজকীয় সভা আহ্বান করিতেন বিশেষ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এবং তখন এই সব মহারাজা-মহাসামন্ত হইতে আরম্ভ করিয়া সাধারণ সামন্ত ও মাণ্ডলিক পর্যন্ত সকলেই সেই সভায় উপস্থিত হইয়া মহারাজাধিরাজ সম্রাটকে বিনীত প্ৰণতি জ্ঞাপন করিয়া নিজেদের অধীনতার স্বীকৃতি জানাইতেন। পাল ও চন্দ্র লিপিমালায় রাজপুরুষদের যে ক্ষুদ্র বৃহৎ তালিকার উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাতে রাজন, রাজনক, রাজন্যক, রাণক, সামন্ত, মহাসামন্ত প্রভৃতি ঔপধিক রাজপাদোপজীবীদের সাক্ষাৎ মেলে। ইহারা সকলেই যে নানা স্তরের সামন্ত নরপতি, এ সম্বন্ধে সন্দেহের অবকাশ কম বা ধর্মপালের খালিমপুর-লিপিতে জনৈক মহাসামন্তাধিপতি শ্ৰীনারায়ণবর্মার খবর পাওয়া যাইতেছে; তিনি কোন জনপদের মহাসামন্তাধিপতি তাহা জানা যাইতেছে না। এই লিপিতেই উত্তরাপথের যে সব নরপতিদের কনৌজের রাজদরবারে আসিয়া রাজরাজেশ্বরের সেবার্থ সমবেত হইবার ইঙ্গিত আছে, ভোজ-মৎস্য-মন্দ্র-কুরু- যদু-যবন-অবস্তি-গন্ধাের- কীর-পঞ্চাল প্রভৃতি মিত্র রাজন্যবর্গের যে উল্লেখ আছে তাহারাও এক হিসাবে সামন্তরাজা, সন্দেহ নাই। দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে যাহারা পালরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়াছিলেন তাহারাও ‘অনন্ত সামস্তচক্ৰ’। আবার রামপাল যাহাদের সহায়তায় পিতৃরাজ্য বরেন্দ্রী পুনরুদ্ধার করিয়াছিলেন। তাহাদেরও সন্ধ্যাকর নন্দী রামচরিতে “সামন্ত’ আখ্যায়ই পরিচয় দিয়াছেন, অথচ তাহারা সকলেই স্ব স্ব জনপদে প্রায় স্বাধীন নরপতি। অপর-মন্দারের অধিপতি লক্ষ্মীশূর তো নিজেও ছিলেন সামন্ত এবং “আটবিক সামন্ত-চক্র-চুড়ামণি”। রামপালের মাতুল রাষ্ট্রকূট মহনের দুই পুত্র, মহামাণ্ডলিক কাহ্নরদেব এবং সুবৰ্ণদেবও রামপালের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। তাহার পর, পালরাষ্ট্রের দুদিনে যাঁহারা বিদ্রোহপরায়ণ হইয়া সেই রাষ্ট্রকে ধ্বংসের পথে আগাইয়া দিয়াছিলেন, তাহারাও সামন্ত। এক বর্মণরাজ রামপালের শরণাগত হইয়াছিলেন এবং ইহা অসম্ভব নয় যে, বর্মণ বংশ সামন্ত-বংশ রূপেই বাঙলাদেশে প্রতিষ্ঠালাভ করেন এবং পরে স্বাধীন রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন। কামরূপের বিদ্রোহী নরপতি তিঙ্গ্যদেবও পালরাষ্ট্রের সামন্তই ছিলেন।
