ইহাদের ছাড়া কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের আরও কয়েকজন পরিচালক থাকিতেন; তাহাদের উপাধি ছিল অধ্যক্ষ এবং কাজ ছিল রাজকীয় অসামরিক বিভাগের হস্তী, অশ্ব, গর্দভ, খচ্চর, গরু, মহিষ, ভেড়া, ছাগল প্রভৃতি পশুর রক্ষণাবেক্ষণ করা। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্ৰে হন্তী, অশ্ব প্রভৃতির অধ্যাক্ষের উল্লেখ আছে। এই সব অধ্যক্ষদের দায় ও কর্তব্যের বিবৃতি কৌটিল্য। কথিত বিবৃতিরই অনুরূপ ছিল, সন্দেহ নাই! অধ্যক্ষদের মধ্যে নৌকান্ধ্যক্ষ বা নাবাধ্যক্ষ এবং বলাধ্যক্ষ নামীয় দুইজন রাজকর্মচারীও ছিলেন; নৌকাধ্যক্ষ রাজকীয় নৌবাহিনীর এবং বলাধ্যক্ষ রাজকীয় পদাতিক সৈন্যবাহিনীর অধ্যক্ষ।
ধর্ম ও ধর্মানুষ্ঠান সংক্রান্ত ব্যাপারেও রাষ্ট্রযন্ত্রের বাহু ক্রমশ বিস্তৃত হইতেছিল! পাল ও চন্দ্র রাষ্ট্রেও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। বর্ণ ব্যবস্থা ও লোকচারিত বর্ণ-বিন্যাস বৌদ্ধ পাল নরপতিরাও যে অব্যাহত রাখিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন, তাহা অন্যত্ৰ বলিয়াছি। ধর্ম ও ধর্মানুষ্ঠান ব্যাপার সুনিয়ন্ত্রিত করিবার জন্য পাল এবং চন্দ্র রাষ্ট্রযন্ত্রে কয়েকজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী নিযুক্ত হইতেন; সম্ভবত ইহারা কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। নরপতিদের ব্যক্তিগত ও বংশগত ধর্ম যাহাই হউক না কেন, পাল ও চন্দ্র রাজারা তাঁহাদের ব্যক্তিগত ধর্মমত দ্বারা রাষ্ট্রকে প্রভাবান্বিত হইতে দেন নাই। তাহা হইলে বংশানুক্রমিকভাবে দুই দুইটি গোড়া ব্রাহ্মণ পরিবার বহুকাল ধরিয়া পালরাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কাজ করিতে পারিতেন না। তাহারা যে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য উভয় ধর্মেরই পোষকতা করিতেন এ সম্বন্ধে সুপ্রচুর লিপি প্রমাণ এবং তিব্বতী গ্রন্থের সাক্ষ্য বিদ্যমান। এই যুগে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণা ধর্মে সামাজিক পার্থক্য বিশেষ কিছু ছিলও না। দেবপাল বীরদেবকে নালন্দা মহাবিহারের প্রধান আচার্য নিযুক্ত করিয়াছিলেন; এই সাক্ষ্য হইতে এবং বিভিন্ন মহাবিহার সংক্রান্ত বিচিত্র ও বিস্তৃত তিব্বতী সাক্ষ্য হইতে মনে হয়, ধর্ম ও শিক্ষা ব্যাপারেও পাল রাষ্ট্রযন্ত্র সক্রয় ছিল। চন্দ্র রাজাদের লিপিতে শান্তিবারিক ঔপধিক এক শ্রেণীর ব্রাহ্মণ-পুরোহিতের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়; কিন্তু ইহারা বোধহয় তখনও রাজকর্মচারী হইয়া উঠেন নাই। কম্বোজরাজ জয়পালের ইর্দা-পট্টোলীতেই সর্বপ্রথম ঋত্বিক, ধর্মজ্ঞ ও পুরোহিতের সাক্ষাৎ পাইতেছি। রাজকর্মচারীরূপে।
পাল ও চন্দ্ৰ লিপিমালায় রাজপুরুষদের সুদীর্ঘ তালিকা দেওয়া আছে। এই রাজপুরুষেরা কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সন্দেহ নাই। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কতকটা নিঃসংশয় ভাবে এমন যাঁহাদের কথা বলা চলে তঁহাদের কথা ইতিপূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। অন্য আরও অনেকে ছিলেন যাঁহাদের সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া কিছু বলা যায় না; ইহারা অনেকেই কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সন্দেহ নাই; কিন্তু, কেহ। কেহ স্থানীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মচারী ছিলেন, তাহাও সমান নিঃসন্দেহ। ইহাদের সকলের কথা বলিবার আগে পাল ও চন্দ্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্ৰীয় জনপদ-বিভাগের কথা বলিয়া লইতে হয়।
বিভিন্ন রাষ্ট্র-বিভাগ
পূর্বতন রাষ্ট্রযন্ত্রের যেমন, এই পর্বেও রাষ্ট্রের প্রধান বিভাগের নাম ভুক্তি। বাঙলাদেশে পালরাষ্ট্রের তিনটি ভুক্তি-বিভাগের খবর লিপিমালা হইতে জানা যায়। বৃহত্তম ভুক্তি, পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তি এবং তাহার পরই বর্ধমান-ভুক্তি ও দণ্ড-ভুক্তি; বর্তমান বিহারে দুইটি, তীর-ভূক্তি (তিরহুত) এবং শ্ৰীনগর-ভুক্তি; বর্তমান আসামে একটি, প্ৰাগজ্যোতিষ-ভুক্তি। ভুক্তির শাসনকর্তার নাম উপরিক। এই উপরিক কখনো কখনো রাজস্থানীয়-উপরিক অর্থাৎ তিনি শুধু ভুক্তির শাসনকর্তা নহেন, রাজপ্রতিনিধিও বটে। পূর্ব পর্বে কোটালিপাড়ার একটি লিপিতে দেখিয়াছি, অন্তরঙ্গ বা রাজবৈদ্য কখনও কখনও ভুক্তির উপরিক নিযুক্ত হইতেন। ঈশ্বরঘোষের রামগঞ্জ লিপিতে ভুক্তির শাসনকর্তকে বলা হইয়াছে ভুক্তিপতি।
ভূক্তির নিম্নতর বিভাগ মণ্ডল না বিষয় তাহা লইয়া পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা যায়; সাক্ষ্যও পরস্পর বিরোধী। খালিমপুর লিপির মহান্তপ্রকাশ-বিষয় ব্যাস্ত্ৰতটী মণ্ডলভুক্ত; এই লিপিরই আম্রষণ্ডিকা-মণ্ডল (উড়গ্রাম-মণ্ডলের সীমাবতী) পালীঙ্কট-বিষয়ের অন্তর্গত; মুঙ্গের লিপির ক্রিমিল-বিষয় শ্ৰীনগর-ভুক্তির অন্তর্গত; বাণগড় লিপির গোকালকা-মণ্ডল কোটীবৰ্ষ-বিষয়ের অন্তৰ্গত; বাণগড়, মনহলি ও আমগাছি লিপির কোটীবর্ষ-বিষয় পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত (দ্বিতীয় লিপিটিতে মণ্ডলের উল্লেখই নাই); কমৌলি লিপির কামরূপ-মণ্ডল প্ৰাগজ্যোতিষ-ভুক্তির অন্তৰ্গত, মন্দার গ্রাম বড়া-বিষয়ের অন্তর্গত; মনহলি লিপির হলাবর্ত-মণ্ডল কোটীবর্ষ-বিষয়ের অন্তর্গত; ভাগলপুর লিপির কক্ষ-বিষয় তীর-ভূক্তির অন্তর্গত এবং সেই বিষয়েরই অন্তৰ্গত মুকুতিগ্রাম ইত্যাদি। এই সাক্ষ্যে দেখা যাইতেছে, ভুক্তির নিম্নতর বিভাগ কোথাও মণ্ডল, কোথাও, বিষয়। চন্দ্র রাষ্ট্রে কিন্তু বিষয়ই বৃহত্তর বিভাগ এবং মণ্ডল বিষয়ের অন্তর্গত বলিয়া মনে হইতেছে। শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল লিপির নাব্য-মণ্ডল সোজাসুজি পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির অন্তর্গত, কিন্তু ঐ রাজারই ধুল্লা-লিপির বল্লীমুণ্ডী-মণ্ডল খেদিরবল্লী-বিষয়ের এবং যোলামণ্ডল ইক্কড়াসী বিষয়ের অন্তর্গত এবং উভয় বিষয়ই পৌণ্ড-ভুক্তির অন্তর্গত। ইদিলপুর লিপিতেও দেখিতেছি, কুমারতািলক-মণ্ডল সতটপদ্মাবতী-বিষয়ের অন্তর্গত। জয়পালের ইর্দা লিপির দণ্ডভুক্তি-মণ্ডল বর্ধমান-ভুক্তির অন্তর্গত। দণ্ডভুক্তি বোধ হয় ভুক্তি-বিভাগই ছিল। কিন্তু কম্বোজবংশের অধিকারের পর মণ্ডল-বিভাগে রূপান্তরিত হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে শশাঙ্কের মেদিনীপুরের একটি লিপিতে দণ্ডভুক্তি-দেশ নামে জনপদের উল্লেখ স্মর্তব্য। মনে হয়, ব্যতিক্রম যাহাই থাকুক, বিষয়ই ছিল। ভুক্তির অব্যবহিত নিম্নবর্তী রাষ্ট্র-বিভাগ, এবং মণ্ডল-বিষয়ের নিম্নবর্তী বিভাগ। বিষয়ের শাসনকর্তার পদোপাধি ছিল বিষয়পতি। গুপ্ত আমলের কোনও কোনও লিপিতে বিষয়ের শাসনকর্তাকে আয়ুক্তক বলা হইয়াছে; অন্য দুই একটি লিপিতে কিন্তু আয়ুক্তক বলিতে ভুক্তি বা বিষয়ের উচ্চ কর্মচারী বলিয়া মনে হয়। পাল আমলের লিপিগুলিতে তদায়ুক্তক এবং ধিনিয়ুক্তক পদোপাধিবিশিষ্ট দুইটি রাজকর্মচারীর খবর পাওয়া যায়। ইহারা বোধ হয় ভুক্তি ও বিষয় শাসন সম্পূক্ত উচ্চ রাজকর্মচারী। মণ্ডলের শাসনকর্তার নাম খুব সম্ভব ছিল মণ্ডলাধিপতি (বা মাণ্ডলিক); নালন্দা লিপিতে আছে, ব্যাঘ্রতটী-মণ্ডলাধিপতি বলবৰ্মণ দেবপালের দক্ষিণহস্ত স্বরূপ ছিলেন। শ্ৰীচন্দ্রের রামপাল-লিপিতেও মণ্ডল-শাসনকর্তার পদোপাধি মণ্ডলপতি।
