বিষয়পতিদের অধিকরণের খবর ফরিদপুর-পট্টোলীগুলিতে তো আছেই। লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীতেও “বিষয়াপতীন সাধিকরণানীদের উল্লেখ দেখা যায়। শেষোক্ত লিপিটিতে দেখিতেছি, বিষয়পতি ও তাহার অধিকরণ স্থানীয় শাসনকার্য নির্বাহ করিতেন “সপ্রধান-ব্যবহারি-জনপাদান’দের সাহায্যে। ফরিদপুর-কেটালিপাড়ার লিপিগুলিতে যে অধিকরণের উল্লেখ দেখিতেছি, তাহার গঠন ঠিক গুপ্ত—আমলের পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তির বিষয়াধিকরণের মতন নয়। ধর্মাদিত্যের দ্বিতীয় পট্টোলীতে বিষয়পতি এবং বিষয়াধিকরণ ছাড়া আরও ষোলো-সতেরো জন বিষয়-মহত্তর, ব্যাপারী-ব্যবসায়ী এবং অনুল্লিখিত-সংখ্যক প্রকৃতিপুঞ্জের খবর পাওয়া যাইতেছে। স্পষ্টতই দেখা যাইতেছে, কোটীবর্ষের বিষয়াধিকরণে নগরশ্ৰেষ্ঠী, প্রথম কুলিক, প্রথম সার্থিবাহের যে স্থান, এখানে তাঁহাদের সেই স্থান নাই; বিষয়-মহত্তরেরাও বারকমণ্ডল বিষয়াধিকরণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ নহেন বলিয়াই মনে হইতেছে। এতগুলি বিষয়-মহত্তর, ব্যাপারী-ব্যবহারী এবং প্রকৃতিপুঞ্জ লইয়া বিষয়াধিকরণ গঠিত হইত। বলিয়া মনে হয় না; ইহারা সম্ভবত জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসাবে অধিকরণের অধিবেশনে উপস্থিত থাকিয়া শাসনকার্যের আলোচনা ও কর্তব্য নির্ধারণে সহায়তা করিতেন। ইহা ছাড়া বারকমণ্ডল বিষয়ের আরও একটু বৈশিষ্ট্য দেখিতেছি। ঘুগ্রহাটি-লিপি এবং অন্য আরও দুইটি কোটালিপাড়া-লিপিতে বিষয়পতির অধিকরণের প্রধান হিসাবে একজন জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ বা জ্যেষ্ঠাধিকরণিকের সাক্ষাৎ পাইতেছি। এই তিনটি লিপিতে অধিকরণ-ব্যাপারে বিষয়পতির উল্লেখ নাই; কিন্তু তাই বলিয়া এ অনুমান করা চলে না যে, বিষয়পতির সঙ্গে বিষয়াধিকরণের কোনও সম্বন্ধ ছিল না, বা জ্যেষ্ঠাধিকরণিকই অধিকরণের সভাপতি ছিলেন। বরং এ অনুমানই সঙ্গত যে, বিষয়পতিই ছিলেন সর্বময় কর্তা, অধিকরণের সভাপতি; জ্যেষ্ঠ-কায়স্থ বা জ্যেষ্ঠাধিকরণিক ছিলেন অধিকরণের অন্যান্য সভ্যদের মুখ্যতম প্রতিনিধি। এই অন্যান্য সভ্যরা কাহারা, নিশ্চয় করিয়া বলা কঠিন; অনুমান করিয়াও লাভ নাই। এই অধিকরণেই সহযোগী উপদেষ্ট হিসাবে থাকিতেন বিষয়-মহত্তরেরা (ধর্মাদিত্যের একটি পট্টোলী-কথিত “বিষয়িণঃ” দ্রষ্টব্য), মহত্তরেরা, প্রধান ব্যাপারী বা প্রধান ব্যবহারীরা। মহত্তর ও বিষয়-মহত্তর এই দুয়ের পৃথক উল্লেখ হইতে স্বতঃই মনে হওয়া উচিত যে, ইহারা দুই স্তর বা পর্যায়ের লোক এবং বিষয়-মহত্তরের উচ্চতর পর্যায়ের। মহত্তরেরা তো স্থানীয় সম্রান্ত বিত্তবান ও ভূমিবান লোক বলিয়াই মনে হয়। ব্যাপারী ও ব্যবহারীরা নিঃসন্দেহে শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের লোক।
ভূমি ক্রয়-দানবিক্রয় ব্যাপারে বঙ্গরাষ্ট্রের বিষয়াধিকরণগত সংবাদ গুপ্তরাষ্ট্রযন্ত্রেরই অনুরূপ; খুঁটিনাটি ব্যাপারে যাহা কিছু পার্থক্য তাহা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। মল্লসরুল-লিপিতে বীথী-অধিকরণ সম্পর্কে কুলবারকৃত আখ্যাত এক শ্রেণীর রাজকর্মচারীর উল্লেখ আগেই করা হইয়াছে; বঙ্গরাষ্ট্রের কোনও কোনও লিপিতেও কুলবোর নামে রাজপুরুষের সাক্ষাৎ পাইতেছি। সমাচার দেবের ঘুগ্রহাটি-লিপিতে দেখিতেছি, বারকমণ্ডল-বিষয়ের অধিকরণ বিক্রিত ভূমি মাপিয়া পৃথক করিয়া দিবার জন্য করণিক নয়নাগ, কেশব এবং আরও কয়েকজনকে কুলবোর নিযুক্ত করিয়াছিলেন। কোটালিপাড়ার একটি লিপিতেও কুলবারের উল্লেখ আছে এবং সেখানেও ইহাদের দায়িত্বের ইঙ্গিত ভূমি ক্ৰয়-বিক্রয়ের শেষ পর্বে। ইহারা বোধহয় স্থায়ী অধিকরণ-কর্মচারী ছিলেন না, সর্বত্রই সকল সময় ইহাদের প্রয়োজনও হইত না; প্রয়োজনানুযায়ী অধিকরণ কর্তৃক ইহারা নিযুক্ত হইতেন; ভূমি-আইন সংক্রান্ত ব্যাপারে বোধ হয় তাহারা দক্ষ ছিলেন। যাহা হউক, দেখা যাইতেছে, গুপ্তরাষ্ট্রের অধিকরণগুলিতে যেমন, বঙ্গরাষ্ট্রের অধিকরণেও জনসাধারণের মতামত ইত্যাদি জ্ঞাপন ও কার্যকরী করিবার সুযোগ ও উপায় ছিল; বিষয়-মহত্তর, মহাওর, ব্যাপারী-ব্যবহারী ও প্রকৃতিপুঞ্জের সম্মিলনই তাহার প্রমাণ। বঙ্গরাষ্ট্রের কোনও বীথী ও বীথী-অধিকরণ বা গ্রামাধিকরণের সংবাদ পাওয়া যাইতেছে না; তবে পূর্ববতী পর্বের এবং মল্লসরুল-লিপি-কথিত বর্ধমান-ভুক্তির বঙ্কট্টক-বীথির অধিকরণের উল্লেখ ও বিবরণ হইতে মনে হয়, পূর্ববঙ্গের রাষ্ট্রবিভাগ ও রাষ্ট্রযন্ত্রে ইহাদের স্থান ছিল; সাক্ষ্য প্রমাণ আমাদের সম্মুখে উপস্থিত নাই মাত্র। বঙ্কট্টক-বীথী ও তাহার অধিকরণের কথা আগেই বলা হইয়াছে; এবং তোহা যে মহারাজাধিরাজ গোপচন্দ্রেরই অধিকারভুক্ত ছিল সে ইঙ্গিতও করা হইয়াছে। মল্লসরুল লিপির সাক্ষ্য এই প্রসঙ্গে অন্যদিক দিয়াও উল্লেখযোগ্য। গুপ্ত আমলের প্রাদেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের এবং স্বাধীন স্বতন্ত্র বঙ্গরাষ্ট্রের কর্মধারা বা আমলাতন্ত্র একই জাতীয় না। হওয়াই স্বাভাবিক। স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র বিস্তৃততর হইবে এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের রূপ লাইবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়। বঙ্গরাষ্ট্রের আমলে তাহাই হইয়াছিল এবং মল্লসরুল লিপিতে সেই বর্ধিত বিস্তৃত আমলাতন্ত্রের প্রতিফলন দেখা যাইতেছে। এই লিপির কর্মচারী-তালিকা আগেই বিবৃত করা হইয়াছে, এখানে পুনরুল্লেখের প্রয়োজন নাই! এই আমলাতন্ত্র এখন হইতে ক্রমশ বিস্তারলাভ করিয়া সেন আমলে অস্বাভাবিক স্ফীতি লাভ করিবে,-ক্ৰমে আমরা তাহা দেখিব। ইতিমধ্যে (সপ্তম শতক) লোকনাথে ত্রিপুরা-পট্টোলীতে সান্ধিবিগ্রহিক ঔপধিক এক কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র কর্মচারীর উল্লেখ দেখা যাইতেছে। সান্ধি-বিগ্রহিক পররাষ্ট্র ব্যাপারে যুদ্ধ ও সন্ধি-শান্তিসম্পর্কিত উচ্চতম রাজকর্মচারী, বর্তমান ইংরাজি পরিভাষায় minister of peace and war। প্রাদেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রে সান্ধিবিগ্রহিক থাকার কোনো প্রয়োজন হয় নাই; কিন্তু স্বাধীন স্বতন্ত্র কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সে প্রয়োজন হইয়াছিল।
০৬. পাল-পর্ব
অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পালবংশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বাঙলাদেশের নবযুগের সূচনা দেখা গেল। কিঞ্চিয়ুন চারিশত বৎসর ধরিয়া এই রাজবংশ বাঙলাদেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল; এই বংশের প্রভাবশালী রাজারা বাঙলাদেশের বাহিরে কামরূপে এবং উত্তর-ভারতের সুবিস্তৃত দেশাংশ জুড়িয়া সাম্রাজ্য বিস্তার করিয়াছিলেন, অসংখ্য ক্ষুদ্র বৃহৎ সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিলেন, উত্তর ও দক্ষিণ-ভারতে ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ব্যাপারে বাঙলাদেশকে ইহারা আন্তর্ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধজগতে একটা বিশিষ্ট স্থানে উন্নীত ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। এই সব সুবৃহৎ সুবিস্তৃত প্রচেষ্টার পশ্চাতে যে রাষ্ট্রের সচেতন কর্ম-কল্পনা সক্রয় ছিল সেই রাষ্ট্রের সর্বতোমুখী বিস্তার ও জটিলতা সহজেই অনুমেয়। তাহা ছাড়া, যে রাষ্ট্রযন্ত্র গুপ্ত আমলে প্রবর্তিত হইয়া স্বাধীন বঙ্গরাজাদের, শশাঙ্ক ও অন্যান্য রাজাদের আমলে সুদীর্ঘ কাল ধরিয়া অভ্যস্ত ও আচরিত হইয়াছে, তাহা পালবংশের সুদীর্ঘ কালের সুবিস্তৃত রাজ্য ও সুবিপুল দায়িত্বের ক্রমবর্ধমান প্রসারে আরও প্রসারিত, আরও গভীর মূল, আরও দৃঢ়সংবদ্ধ হইবে, স্পষ্টতর রূপ গ্রহণ করিবে তাহাও কিছু বিচিত্র নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের নূতন কোনও বৈশিষ্ট্য পালরাষ্ট্র বা চন্দ্র-কম্বোজরাষ্ট্রে সূচিত হইয়াছিল এমন নয়, বরং বলা যায় উত্তর-ভারতের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার সূত্রে সমসাময়িক উত্তর-ভারতীয় রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র-বিন্যাসগত অনেক অভ্যাস, অনেক বৈশিষ্ট্য এই যুগের আঞ্চলিক রাষ্ট্র আত্মসাৎ করিয়াছিল। সপ্তম শতকে দ্বিতীয় জীবিতগুপ্তের দেওবরণার্ক-লিপি, হর্ষবর্ধনের বাঁশখেরা-লিপি প্রভৃতিতে সমসাময়িক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-বিন্যাসের যে চিত্র পাওয়া যায়, পালরাষ্ট্রের প্রথম পর্বেও রাষ্ট্র-বিন্যাসের চিত্র মোটামুটি সেই একই।
