রাষ্ট্রযন্ত্রের চূড়ায় বসিয়া আছেন মহারাজাধিরাজ স্বয়ং, তবে এই মহারাজাধিরাজ স্বাধীন স্বতন্ত্র হইলেও স্থানীয় নরপতি মাত্র। ফরিদপুরে কোটালিপাড়ায় প্রাপ্ত পট্টোলীগুলিতে যে কয়জন নরপতির উল্লেখ পাইতেছি। তাহারা সকলেই ঐ উপাধিটি ব্যবহার করিতেছেন। যে-ক্ষেত্রে মহারাজাধিরাজের উল্লেখ নাই, সে-ক্ষেত্রে তিনি শুধু ভট্টারক বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। বপ্লঘোষবাট-লিপিতে জয়নাগ এবং শশাঙ্কের একাধিক লিপিতে গৌড়-কর্ণসুবর্ণরাজ শশাঙ্কও মহারাজাধিরাজ উপাধিতেই আখ্যাত হইয়াছেন। খড়গ বংশের প্রতিষ্ঠাতা খড়েগাদ্যম নৃপধিরাজ এবং ত্রিপুরার লোকনাথ-পট্টোলীর সামন্ত শিবনাথের পিতা, লোকনাথের বংশের প্রতিষ্ঠাতা, অধিমহারাজা আখ্যায় পরিচিত হইয়াছেন। ইহারা সকলেই স্বাধীন নরপতি সন্দেহ নাই এবং সেই হিসাবেই মহারাজাধিরাজ, নৃপধিরাজ, অধিমহারাজ প্রভৃতি উপাধি ব্যবহৃত হইয়াছে। বঙ্গ মহারাজাধিরাজদের অধীনে, শশাঙ্কের অধীনে এবং জয়নাগের অধীনে সামন্ত নরপতির অস্তিত্ব ইহার অন্যতম প্ৰধান।
সামন্ততন্ত্র
গুপ্ত-আমলেই দেখিয়াছি, এই রাজতন্ত্র ছিল সামন্ততন্ত্র-নির্ভর। এই আমলেও দেখিতেছি তাহার ব্যতিক্রম নাই বরং সামন্ততন্ত্রের প্রসােরই দেখা যাইতেছে। সমাজের ভূমিনির্ভরতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এইরূপ হওয়া কিছু বিচিত্র নয়। গোপচন্দ্রের মল্লসরুল-লিপি-কথিত দূতক মহারাজ মহাসামন্ত বিজয়সেনের কথা আগেই বলিয়াছি; অনুমান হয়, ইনি আগে মহারাজাধিরাজ বৈন্যগুপ্তের মহাসামন্ত ছিলেন, তারপর বর্ধমান-ভুক্তি গোপচন্দ্রের করায়ত্ত হইলে তিনি গোপচন্দ্রের মহাসামন্ত হন। বপ্লঘোষবাট-লিপিতে দেখিতেছি, সামন্ত নারায়ণভদ্র ঔদুম্বরিক বিষয়ে মহারাজাধিরাজ জয়নাগের সামন্ত ছিলেন। লোকনাথ-পট্টোলী-কথিত ব্ৰাহ্মণ প্রদোষশৰ্মা মহারাজ লোকনাথের মহাসামন্ত ছিলেন। আস্রফপুর-লিপিতে জনৈক সামন্ত বনটিয়োকের সাক্ষাৎ পাইতেছি। শশাঙ্ক তো তাহার রাষ্ট্ৰীয় জীবন আরম্ভই করিয়াছিলেন মহাসামন্তরূপে; তারপর যখন তিনি স্বাধীন পরাক্রান্ত নরপতিরূপে প্রতিষ্ঠিত হন, তখন তাহার নিজেরও মহাসামন্ত ছিল। বিজিত রাজ্যের রাজারাই বিজেতা মহারাজাধিরাজগণ কর্তৃক মহাসামন্ত রূপে স্বীকৃত হইতেন, এইরূপ অনুমান অসঙ্গত নয়। শৈলোদ্ভববংশীয় কঙ্গোদাধিপতি দ্বিতীয় মাধবরাজ এবং দণ্ডভুক্তির শাসনকর্তা সোমদও এই দুইজনই যথাক্রমে শশাঙ্কের মহারাজা-মহাসামন্ত এবং সামন্ত-মহারাজ ছিলেন। সামন্তরা সকলে যে একই পর্যায় ও মর্যাদাভুক্ত ছিলেন না, তাহা তঁহাদের উপাধি হইতেই সুপ্রমাণিত। কেহ ছিলেন মহাসামন্ত-মহারাজ, কেহ মহাসামন্ত, কেহ বা শুধু সামন্ত। ভূম্যধিপত্যের বিস্তৃতি, রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা ও অধিকার, রাজসভায় ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি প্রভৃতির উপর এই স্তরবিভাগ নির্ভর করিত, সন্দেহ নাই।
ভুক্তি
বঙ্গরাষ্ট্রের বৃহত্তম রাষ্ট্রবিভাগের নাম এই পর্বে কী ছিল নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। বর্ধমান-ভুক্তি (মল্লসরুল-লিপি) ও নব্যাবকাশিকা (ফরিদপুর-লিপি), এই দুইটি যে বৃহত্তম বিভাগ সমূহের দুইটি বিভাগ, এ-সম্বন্ধে সন্দেহ নাই। বর্ধমান-ভুক্তির উল্লেখ হইতে মনে হয়, নব্যাবকাশিকাও ভুক্তি-পর্যায়েরই রাষ্ট্রবিভাগ। ফরিদপুর-লিপি-কথিত সর্বোচ্চ শাসনকর্তা উপরিক নাগদেব, উপরিক জীবদত্ত প্রভৃতির উপাধি হইতে প্রায় নিঃসংশয়ে অনুমান করা চলে যে, নব্যাবকাশিকা ভুক্তি বলিয়া উল্লখিত না হইলেও ইহার বিভাগীয় রাষ্ট্রমর্যাদা ভুক্তি-পর্যায়ের। ভুক্তির শাসনকর্তারা এ-ক্ষেত্রেও উপরিক উপাধিতেই আখ্যাত হইতেছেন, যদিও স্থানুদত্তকে উপরিক বলা হয় নাই, শুধু মহারাজ বলা হইয়াছে। নাগদেব শুধু উপরিক নহেন, মহাপ্ৰতীহারও বটে; জীবদত্ত উপরিক এবং অন্তরঙ্গ। অন্তরঙ্গ রাজার নিজস্ব চিকিৎসক, রাজবৈদ্য। চক্রদত্তের এক টীকাকার শিবদাস সেনের পিতা অনন্তসেন বরবক শাহের অন্তরঙ্গ ছিলেন; শ্ৰীচৈতন্যের পার্ষদবর্গের অন্যতম শ্ৰীখণ্ডবাসী মুকুন্দ সরকার ছিলেন হোসেন শাহের অন্তরঙ্গ। মনে হয়, উপরিক জীবদত্ত মহারাজাধিরাজ সমাচার দেবের রাজবৈদ্যও ছিলেন। ইহারা নিযুক্ত হইতেন স্বয়ং মহারাজাধিরাজ কর্তৃক (তদনুমোদনলব্ধাস্পদস্য, তৎপ্রসাদলব্ধাস্পদে, চরণকমলযুগলারাধনোপাত্ত, ইত্যাদি পদ দ্রষ্টব্য)। শশাঙ্কের সময় দণ্ডভুক্তি বা দণ্ডভুক্তিদেশও বোধ হয় ছিল একটি ভুক্তি-বিভাগ এবং তাহার শাসনকর্তার পদোপাধি ছিল উপরিক। সোমদত্ত ছিলেন উপরিক এবং সামন্ত-মহারাজ; শুভকীর্তি ছিলেন উপরিক এবং মহাপ্ৰতীহার।
গুপ্তরাষ্ট্রে যেমন, বঙ্গরাষ্ট্রে এবং শশাঙ্কের গৌড়রাষ্ট্ৰেও তেমনই ভুক্তি-অধিষ্ঠানের একটি অধিকরণ নিশ্চয়ই ছিল। ফরিদপুরের পট্টোলীগুলিতে এই অধিকরণের উল্লেখ পাইতেছি না; কারণ, উল্লেখের প্রয়োজন হয় নাই। কিন্তু শশাঙ্কের মেদিনীপুর-লিপি দুইটিতে যে তাবীর-অধিকরণের উল্লেখ আছে এবং যে অধিকরণ হইতে শাসন দুইটি নির্গত হইয়াছিল। সেই অধিকরণটি তো ভুক্তির অধিকরণ বলিয়াই মনে হইতেছে।
বিষয়
ভুক্তির নিম্নবর্তী রাষ্ট্রবিভাগ বিষয়ের খবর এই পর্বেও পাওয়া যাইতেছে। বঙ্গের নব্যাককাশিকা (-ভুক্তির?) প্রধান একটি বিষয় ছিল বারকমণ্ডল বিষয়। বারকমণ্ডলের মণ্ডল এখানেও কোনও রাষ্ট্রবিভাগ বলিয়া মনে হইতেছে না; বিষয়টিরই নাম বারকমণ্ডল। বিষয়ের বিষয়পতি কখনও মহারাজাধিরাজ স্বয়ং নিযুক্ত করিতেন, যেমন, বিপ্লঘোষবাট-লিপিতে ঔদুম্বরিক বিষয়ের বিষয়পতিকে বলা হইয়াছে “তৎপাদানুধ্যাত সামন্ত নারায়ণভদ্র বিষয়সম্ভোগকালে”, কিন্তু সাধারণত উপরিকেরাই বিষয়পতি নিযুক্ত করিতেন, যেমন, বারকমণ্ডল বিষয়ে। বিষয়পতি জজাবকে নিযুক্ত করিয়াছিলেন (উপরিক)-মহারাজ স্থাণুদত্ত; গোপালস্বামী এবং বৎসপালকে নিযুক্ত করিয়াছিলেন উপরিক জীবদত্ত। ত্রিপুরার লোকনাথ-পট্টোলীতেও এক সুকবুঙ্গ বিষয়ের উল্লেখ পাইতেছি।
